চট্টগ্রামে অমর একুশের অভিন্ন বইমেলা : স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রাপ্তিযোগ

জামাল উদ্দিন

রবিবার , ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
64

বাংলাদেশে ঢাকার পর চট্টগ্রাম দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীই শুধুই নয়; বাণিজ্যিক রাজধানীও। কিন্তু চট্টগ্রামে লেখক-প্রকাশক-পাঠক এবং নাগরিক সমাজের দীর্র্ঘকালের আকাঙ্ক্ষা ছিলো ভাষার মাসে বইমেলা আয়োজনের। এই আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দু’যুগেরও আগে থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে নানাজন, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নানা পরিসরে নানা স্থানে বইমেলা আয়োজিত হতে থাকে। কখনো একই বছরে একাধিক বইমেলা হয়েছে। তবে এই আয়োজনগুলো কখনো পূর্ণাঙ্গ বইমেলা হয়ে উঠেনি। এতে প্রকাশকের অংশগ্রহণও নামমাত্র। সৃজনশীল প্রকাশনার তুলনায় বই দোকানীদেরই আধিক্য ছিলো। তাই এইসব বইমেলা লেখক-প্রকাশক-পাঠক ও নাগরিক সমাজের তৃষ্ণাপূরণের পরিপূরক ছিলো না। কারণ যারা আয়োজক, তাদের কমিটমেন্টের অভাব ছিল। বইমেলার নাম করে বারোয়ারী মেলা করাই হলো তাদের লক্ষ্য। এদের সাথে সৃজনশীল বইয়ের কোন সম্পর্ক নেই।
ঢাকায় ঢেকে আছে চট্টগ্রাম : আমরা দেখি দেশে বেসরকারি গ্রন্থাগারের সংখ্যাবৃদ্ধি তো ঘটছেই না, বরং গ্রন্থাগারের দুর্দশা স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। সরকারি বরাদ্দ বহুগুণ স্ফীত হলেও গ্রন্থের বিকাশে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ তেমন বৃদ্ধি করা হয় নি। বেসরকারি গ্রন্থাগারের বইসংগ্রহের বরাদ্দ এতোই অপ্রতুল যে প্রকাশনার বর্তমান ব্যপ্তির সঙ্গে তা কোনভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বড়ই আশ্চর্যের বিষয় হলো জাতীয় গ্রন্থাগার যা সরকারি বরাদ্দ পেয়ে থাকেন তা ভোগ করেন ঢাকায় অবস্থানরত লেখক-প্রকাশকরা। জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রধান কার্যালয় মূলত ঢাকায় তাঁদের গ্রন্থগুলোই কেনেন । ঢাকার বাইরে যে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত বিশাল বাংলাদেশের পরিধি তা মনে হয় তাঁরা ভুলেই গেছেন। যে-কারণে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর লেখক-প্রকাশকরা বঞ্চিত হয়ে আসছেন সেই বহুকাল ধরে।
প্রায় শত বছরের প্রাচীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাবলিক লাইব্রেরিটি বলতে গেলে নিষ্ক্রিয়ভাবে নিষ্ফলা হয়ে আছে। লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের সাথে এই লাইব্রেরির কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। সরকারিভাবে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের স্থানীয় লেখক-প্রকাশকদের কাছ থেকে ৫ টাকার বই কেনারও অনুমতি কিংবা বরাদ্দ নেই। যার ফলে বাণিজ্যিক রাজধানী নামে খ্যাত বিশাল এই চট্টগ্রাম শহরে লেখক-প্রকাশকের প্রকাশিত গ্রন্থগুলো বিক্রয়ে সরকারি বরাদ্দের অর্থানুকূল্যের কোন সুযোগ নেই। এই চিত্র শুধু চট্টগ্রামের নয়, ঢাকার বাইরের সব জেলার। এ-ই যদি সরকারের বিমাতাসূলভ আচরণ হয় এই শহরে লেখক-প্রকাশকরা কিভাবে টিকে থাকবেন? অর্থাৎ বাংলাদেশের কোথাও সৃজনশীল বইয়ের প্রচার, প্রসার, লেখক-প্রকাশক সৃষ্টি তথা পাঠক বৃদ্ধিতে সরকারের বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা থেকে এক কানাকড়িও ঢাকার বাইরে আসে না। তাই বলতেই হয়, ঢাকা সব জেলাকে ঢেকে রেখেছে!
বই বিপণনের সংকট : বিশাল সম্ভাবনা সত্ত্বেও রাজধানী ঢাকা ব্যতিত বাংলাদেশে অন্যান্য জেলাগুলোতে সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশনা এখনও তার সংকটদশা কাটিয়ে উঠতে পারে নি। তার বড় কারণ সৃজনশীল বইয়ের প্রকৃত বাজার বা বিপণন সম্ভাবনা আজো একান্ত বৃত্তাবদ্ধ। এজন্য সৃজনশীল বইয়ের বাজার প্রসার এবং বইয়ের জোগান দানে প্রকাশকদের দক্ষতা ও ক্ষমতাবৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন। বিপণন এক্ষেত্রে বড় এক সমস্যা। সৃজনশীল বই পাঠকের সামনে মেলে ধরবার জন্য চাই বইয়ের দোকান এবং বাংলাদেশে বইয়ের দোকানের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। নগরীর প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে বইয়ের দোকান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। নতুন নতুন বিশালায়তন শপিং মল গড়ে উঠছে, সেখানে বিচিত্র পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বই পাওয়ার কোনো উপায় থাকছে না। এমনকি স্থানীয় সরকার বা সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে যে-সব বহুতল বিপণী বিতান নির্মিত হয়েছে বা হচ্ছে সেখানে বইয়ের লাইব্রেরির জন্য একটি দোকানও বরাদ্দ রাখা হচ্ছে না। চট্টগ্রাম শহরই তার অন্যতম প্রমাণ।
চট্টগ্রামবাসীর দাবি : মাসব্যাপী একুশের বইমেলা : এর থেকে পরিত্রাণের জন্য চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশকরা একতাবদ্ধ হয়ে ২০০৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম শহরে বইমেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিলেও তা একক বইমেলায় রূপ নিতে পারেনি। তাই চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে চট্টগ্রামে ফেব্রুয়ারি মাসে বৃহৎ পরিসরে একক একটি বই মেলা প্রত্যাশা করে। প্রায় ছয় বছর ধরে সিটি কর্পোরেশনের অর্থায়নে শহীদ মিনার ও পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে বইমেলার আয়োজন অব্যাহত থাকলেও বিরত করা যায় নি বিক্ষিপ্তভাবে আয়োজিত বইমেলা নামের বারোয়ারী মেলার আয়োজকদের। একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতার নাম ব্যবহার ও তাদেরকে সামনে রেখে দাপটের সাথেই তারা বারোয়ারী মেলার আয়োজন অব্যাহত রেখেছে। বইমেলা নামের একাধিক মেলার আয়োজন দেখে পাঠক যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছে, তেমনি লেখক, প্রকাশকরাও হতাশায় ভুগছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের যৌথ আয়োজনে শহীদ মিনার ও পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে অনুষ্ঠিত বইমেলার কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় বইপ্রেমীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন নানাভাবে। সকলের মনে একই প্রশ্ন বইমেলা হবে কি না, হচ্ছে কি না, এই সংশয়ে। এই মেলাটি শুরু থেকে কখনো ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখ থেকে ২১ তারিখ, কখনো ১২ তারিখ থেকে ২৬ তারিখ, কখনো ১৫ তারিখ থেকে ২৮, কখনো ১৮ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি, এভাবেই আয়োজিত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে প্রকাশকরা নির্ভর করে থাকেন সিটি কর্পোরেশনের মর্জির ওপর। তার কারণ পুরো ব্যয়ভার কর্পোরেশনই বহন করে থাকে। এহেন হযবরল অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য চট্টগ্রামের প্রকাশক, লেখক ও পাঠকেরা বারংবার দাবি জানিয়ে আসছিলেন যেন সুনির্দিষ্ট তারিখে বইমেলার আয়োজন করা হয়। তাই সর্বমহল থেকে দাবি উঠেছে ঢাকার বাংলা একাডেমির বইমেলার আদলে চট্টগ্রামে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী একটি বইমেলার আয়োজন হোক।
চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের ঘোষণা: গত বছর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর মুসলিম হল প্রাঙ্গণে সৃজনশীল বই প্রকাশক পরিষদের সহায়তায় অনুষ্ঠিত বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন ঘোষণা দেন, (২০১৯ সাল) থেকে চট্টগ্রামে বৃহৎ পরিসরে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার আদলে মাসব্যাপী বইমেলা হবে। তাঁর এই ঘোষণায় সৃজনশীল লেখক-প্রকাশক ও চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ আশ্বস্ত হলেও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি। কেননা এমন ঘোষণা আগেও শোনা গিয়েছিলো। কারণ এ ধরণের ঘোষণা কার্যকরণকরা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
অতঃপর স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রাপ্তিযোগ: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীনকে অভিবাদন জানাই। কারণ তিনি কথা রেখেছেন। গত বছর তিনি যে ঘোষণা দিয়েছিলেন এ বছর তা বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও অমর একুশে উপলক্ষে মাননীয় মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীনের পৃষ্ঠপোষকতায় ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ ও চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের উদ্যোগে ১০-২৮ ফেব্রুয়ারি এম.এ আজিজ স্টেডিয়াম জিমনেসিয়াম মাঠে অমর একুশে বইমেলা-২০১৯ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আরো আশার আলো ছড়িয়েছে যে, মাননীয় মেয়রের উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় ফেব্রুয়ারি মাসে এটাই হচ্ছে একক ও অভিন্ন বইমেলা। এর ফলে চাঞ্চল্য ফিরে আসবে লেখক- পাঠকদের মাঝে। প্রাণ ফিরে পাবেন চট্টগ্রামের প্রকাশকরা।
একারণে ঢাকার পরেই চট্টগ্রামে গড়ে উঠবে বইয়ের অন্যতম বাজার ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অমর একুশে বইমেলা। সকলের সহযোগে পূর্ণ হোক স্বপ্ন ও প্রত্যাশার এই অমূল্য প্রাপ্তিযোগ।
লেখক : গবেষক, লেখক ও প্রকাশক

x