চট্টগ্রামের কৃষিখাতে সমস্যা দূরীকরণে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি

বুধবার , ২০ মার্চ, ২০১৯ at ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
34

কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষির উন্নতিকে অবলম্বন করে প্রায় সব রকমের উন্নয়ন প্রত্যাশা করা হয়। দেশের প্রায় ৭৩ শতাংশ জনশক্তি পূর্ণ অথবা খন্ডকালীন কৃষিকর্মে জড়িত বলে এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। কৃষির উন্নতি হলে তাদের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, সেই ক্রয় ক্ষমতা তাদের অন্যান্য পণ্য ও সেবা ক্রয়ের সামর্থ্য দান করে। কৃষির ওপর এই নির্ভরতা ততোদিন থাকবে, যতদিন পর্যন্ত না শিল্প-বাণিজ্যের অন্যান্য খাত এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়, যা থেকে রোজগার করে দেশের অধিকাংশ মানুষ খাদ্য ক্রয় করার ক্ষমতা অর্জন করবে, সেই খাদ্য দেশে উৎপাদিত হোক আর না হোক। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনা, প্রযুক্তি, সার ও সেচের সুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে অত্যন্ত দ্রুত, সারা পৃথিবীতে খাদ্য এখন উদ্বৃত্ত, সীমায়িত পৃথিবী ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে রচিত ম্যালথুসের তত্ত্বকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে বিজ্ঞান কৃষি খাত থেকে মানুষের ভীতির আশংকা দূর করেছে।
তবু আমাদের কৃষি খাতে রয়েছে নানা সমস্যা। গত ১৮ই মার্চ দৈনিক আজাদীতে ‘১০ সমস্যায় চট্টগ্রামের কৃষিখাত’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১০ সমস্যায় চট্টগ্রামের কৃষি জমি ও উৎপাদন দুটোই কমছে। চট্টগ্রামের ১৪টি উপজেলা ও মহানগরীতে থাকা কৃষি জমির হিসাব থেকে এ তথ্য মিলেছে। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে, খালের পানিতে লবণাক্ততা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি স্বল্পতা, টপসয়েল কর্ত্তন, আবাদি জমিতে ইটভাটা, সেচ সংকট, কৃষিজ পণ্যের নায্য মূল্য না পাওয়া, চাষযোগ্য জমি পতিত রাখা, শ্রমিক না পাওয়া ও ভঙ্গুর বেড়িবাঁধের কারণে জোয়ারে ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়া।
কৃষি বিভাগ থেকে পাওয়া সর্বশেষ কিছু তথ্যও এ প্রতিবেদনে সন্নিবেশিত হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের হিসাব মতে চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলা ও মহানগরীতে আবাদযোগ্য জমি রয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬১ হেক্টর। বিগত তিন বছরের ব্যবধানে আবাদি জমি কমেছে ৯ হাজার ৮২১ হেক্টর। ফলে তাতে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। চট্টগ্রামে বিগত অর্থ বছরে খাদ্যের চাহিদা ছিল ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৬১৬ মেট্রিক টন। কিন্তু আউশ, আমন, বোরো ধান ও গম-ভুট্টা মিলে প্রকৃত উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯৫ মেট্রিক টন। এতে বিগত বছরেই লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন।
আখ্যান আছে, দেবী অন্নপূর্ণা যখন সন্তুষ্ট হয়ে নৌকার মাঝি ঈশ্বর পাটনিকে বর দিতে চাইলেন, ঈশ্বর পাটনি কিন্তু তাঁর কাছে সোনা-দানা, অর্থ-বিত্ত কিছুই চাইলো না। পাটনি দেবীর কাছে এই বলে বিনীত প্রার্থনা রাখলো: ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চিরাচরিত এবং সাধারণ প্রত্যাশা এই যে, আমার ছেলে মেয়েরা যেন খেয়ে পরে বেঁচে বর্তে থাকে। খাদ্য প্রাপ্তি তার প্রধান কাম্য। তারপরেই আসে অন্য চাহিদা। খাদ্য নিয়েই আমাদের দুশ্চিন্তা অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। ব্রিটিশ যুগের শুরুতেও শেষে দুটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ঘটে গেছে এই অঞ্চলে, পাকিস্তান আমলের শুরুতে ভুখা মিছিল, ’৭৪ সালের আরোপিত দুর্ভিক্ষ আমাদের স্মৃতিপট থেকে মুছে যায়নি। সেই দুরবস্থা থেকে আমাদের দেশের অগ্রগতি অবিশ্বাস্য ও রীতিমত বিস্ময়কর। খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন চাট্টিখানি কথা নয়। তা সম্ভব হয়েছে কৃষিখাতে অগ্রগতির মাধ্যমে।
আমাদের দেশের মানুষ পরিশ্রমী ও প্রতিবেশ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে অভ্যস্ত। এটাই কৃষি খাতে উন্নতি বা অগ্রগতির একক চাবিকাঠি নয়, বরং বীজ, সার, কীটনাশক, যান্ত্রিক চাষাবাদ, কৃষি কাজে বিদ্যুৎ সংযোগ, প্রযুক্তি, সেচ ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা আমাদের এই উন্নয়নে ইতিবাচক সহায়তা দিতে সমর্থ হয়েছে। এই অবস্থা নিরবচ্ছিন্ন থাকলে দেশের আর্থিক উন্নয়নের ভিত্তি অবশ্যই দৃঢ়তর হবে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি শিল্প বিপ্লবের পর সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক বিবর্তনের ঐতিহ্যিক ধারার অংশবিশেষ।
কৃষি খাতে এই ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে, যদি এখানে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব হয়। চট্টগ্রামের কৃষিখাতে উল্লিখিত ১০ সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দূর হতে পারে সকল সংকট।

x