চট্টগ্রামের কৃতী পুরুষ রচনাবলী-১ সমৃদ্ধ ঐতিহ্য কথা

বিপুল বড়ুয়া

শুক্রবার , ১ জুন, ২০১৮ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
62

ইতিহাস ঐতিহ্য দেশ জাতির অগ্রযাত্রার ধারক বাহক। সময় কালের বীক্ষণে চলমান সমৃদ্ধতাকে আরো বেগবান করে তুলতে ইতিহাস ঐতিহ্য চেতনার প্রতি জন মানসকে সতত আস্থাশীল হতেই হবে। গৌরবোজ্জ্বল চেতনাবোধের প্রভাকে আরো আলোকোজ্জ্বলভাবে বিচ্ছুরিত করে নূতন প্রজন্মের কাছে তার দীপশিখা ছড়িয়ে দিতে হবে। তবেই সমাজ সভ্যতার যুগরবি আরো দেদীপ্যমান আলো ছড়াবে। সমাজ দেশের সমৃদ্ধ চেতনার এই মহা সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে অর্থবহ ভূমিকা পালন করেন সময়সমকালের প্রাজ্ঞজন মনীষীবৃন্দ। যাঁদের জীবন কর্ম ধ্যান ধারণায় উজ্জীবিত হয় জনসমাজ জেগে ওঠে জগৎ সংসারপ্রতিভাত হয় অরূপ আলোকে।

প্রাবন্ধিক সমাজ সচেতন লেখক গবেষক নেছার আহমদের সাম্প্রতিক প্রকাশনা প্রাজ্ঞজনদের নিয়ে প্রবন্ধ গ্রন্থ– ‘স্মরণের আবরণে চট্টগ্রামের কৃতী পুরুষ রচনাবলী১’ আলোচনার প্রেক্ষিতে উপযুক্ত মূল্যায়নের যথার্থ সাক্ষ্য মেলে। বিশিষ্ট লেখক নেছার আহমদ মূলত ভিন্ন ধারার লেখক। দেশকালসমাজসংস্কৃতি পরিমণ্ডলের বিষয় আশয় তার লেখালেখির মূল উপজীব্য। এতদ্‌ সম্পর্কিত গুঢ় প্রসঙ্গাদি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে লেখালেখি করে আসছেন লেখক। ইতোমধ্যে ইতিহাসঐতিহ্য ভিত্তিক নানা আঙ্গিকের গুরুত্বপূর্ণ লেখালেখি স্বচ্ছন্দে উপস্থাপন করে সুশীলজ্ঞানগর্ব সমাজে নিজস্ব ঘরানা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন বলা যায় সফল হয়েছেন বহু মাত্রায় প্রশংসিতও হয়েছেন জ্ঞানী গুণীজনদের বৈঠকআলাপচারিতায়ও।

লেখক নেছার আহমদ তাঁর জীবন ও কর্ম আলোচনা গ্রন্থ-‘স্মরণের আবরণে চট্টগ্রামের কৃতী পুরুষ রচনাবলী১’এ তাঁর ধীশক্তির লেখক সত্তার আবারো সুপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সমাজ দেশ জনগোষ্ঠীর প্রতি একজন লেখকের যথার্থ দায়বদ্ধতার স্বরূপ আবারো তুলে ধরেছেন। চট্টগ্রাম আমাদের চট্টগ্রামহাজার বছরের চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের ইতিহাসঐতিহ্যঅতীত গৌরবগাঁথার সুমহান সন্ধানে ব্যাপৃত হলে আমাদের চোখে পড়ে নানা কৌল, কৌমজন সমাজ গোষ্ঠী দেশিবিদেশি নানা রাজন্যবর্গ, সেনাপতিসভাসদআমাত্য সর্বোপরি নানা জ্ঞানীগুণীসমাজ চিন্তক বিদগ্ধ জনের গৌরব গাঁথাকর্ম ইতিহাসসমাজ সংস্কার প্রণোদনাযা কালে কালে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করেছে আমাদের চট্টগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে।

এ বইয়ের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব নানা মেরুর আলোচিত জনদের নাম নির্ঘণ্টের দিকে তাকালে বিস্ময়ে অবাক হতে হয় কী অপরিসীম শ্রম সময় দিয়েছেন লেখক নেছার আহমদএ গ্রন্থ রচনায়। পাঁচশত বিশ পৃষ্ঠার এ জীবনকর্মইতিহাস গ্রন্থে লেখক দূর নিকটের একশত পঁচিশ জনের জীবন ইতিহাস সযত্নে সুশোভনভাবে অত্যন্ত মনোগ্রাহী আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপনা করেছেন। যা রূপ নিয়েছে উত্তর প্রজন্মের কাছে পূর্ব পুরুষদের জীবন কর্ম সম্পর্কিত আকরগ্রন্থ হিসেবে। পঞ্চম খণ্ডে বিভক্ত এ গ্রন্থে লেখক নেছার আহমদ চট্টগ্রামের সেই অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান কালের সমসাময়িক ক্ষণজন্মা প্রাজ্ঞজনদের আলোচনায় এনে নূতন প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁদের সমাজ চিন্তাজ্ঞানগর্ভ শিক্ষা উদ্যোগদেশ সমাজ জাতির কাছে দায়বদ্ধতার ধ্যান ধারণাকে অবলম্বন অনুসরণের প্রয়াস জাগ্রত করার চেতনার সূত্রপাত করেছেন। যা বর্তমান অবক্ষয়ের সময়কালে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়।

পূর্বেই উল্লেখ করা গেছে পাঁচ খণ্ডের পাঁচশত বিশ পৃষ্ঠার একশত পঁচিশ জন প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী বিদগ্ধজনের গুণ জ্ঞানের বর্ণনা প্রবাহের চমৎকার এ গ্রন্থের চুলচেরা আলোচনা এই ছোট পরিসরে কোনভাবেই সম্ভব নয়। তারপরও পাঠকের কৌতূহল মেটাতে গ্রন্থভুক্ত ক’জন মনীষীর নাম উল্লেখ করা যায়অনেক অনেকের মাঝে এ গ্রন্থে আলোচিত হয়েছেকবি গুণাকার নবীন চন্দ্র দাস, সাহিত্যিক আহমদ ছফা, অধ্যাপিকা সালমা চৌধুরী, শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহ, শেখচাটগাঁম কাজেম আলী মাস্টার, আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার, তিব্বত বিশেষজ্ঞ ও রাজদূত শরৎ চন্দ্র দাস, মাহবুব উল আলম চৌধুরী, বিশ্ব মনীষা ড. বেনী মাধব বড়ণ্ডয়া, প্রফেসর ড. আবদুল করিম, মহাকবি আলাউল, লোকগীতিকা সংগ্রাহক আশুতোষ চৌধুরী, কবিয়াল রমেশ শীল, দৌলত কাজি, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী শেফালী ঘোষ, কবিয়াল এয়াকুব আলী, বিপ্লবী কল্পনা দত্ত, মহিয়সী নেলী সেনগুপ্তা, পণ্ডিত গিরিশ চন্দ্র বড়ুয়া বিদ্যাবিনোদ, মুহম্মদ সোলেমান চৌধুরী, কবি ওহীদুল আলম, কবিয়াল ফনী বড়ুয়া, আলহাজ্ব জহুর আহমদ চৌধুরী, শহীদ সাবের, শিক্ষাব্রতী বাদশা মিয়া চৌধুরী, বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার, কৃষক নেতা আবদুস সাত্তার, বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী, আদালত খান, ডা. মো. লোকমান খান শেরওয়ানী, ডা. অন্নদা চরণ খাস্তগীর, শেখ রফিকউদ্দিন আহমদ ছিদ্দিকি প্রমুখ চট্টল গৌরব মনীষী মহৎ জনদের জীবনের কর্ম খ্যাতির স্বদেশ চেতনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা বিবরণ। স্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসা অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ধরে রেখে জীবন্ত করে রাখার এক প্রয়াস ও অসামান্য কষ্টসাধ্য নজির রেখেছেন গবেষক নেছার আহমদ তাঁর এই অতি মূল্যবান গ্রন্থে। অনেক কষ্ট শ্রমে খুঁজে পেতে বিশ্ব দরবারে চট্টগ্রামের স্মরণীয় বরণীয় মহান ব্যক্তিবর্গের জীবন কর্ম তুলে ধরে লেখক নেছার আহমদ এক বিশাল কর্ম সম্পাদন করেছেন বলা যায় নিঃসন্দেহে।

বলা হয়ে থাকে বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। আমরা খুব সহজেই খুব দ্রুত ভুলে যেতে বসিআমাদের ইতিহাসঐতিহ্যকেভুলে যেতে বসি সেই পূর্বসূরিদের যাঁরা তাঁদের মেধামননকর্মের সমাহার দিয়ে উত্তর প্রজন্মের জন্য সুখময় জীবন যাত্রার মনোভূমি সৃজন করে গেছেনগৌরবের ইতিহাস রচনা করে গেছেনরেখে গেছেন, আমাদের জন্য সফলতার দিক নির্দেশনা। প্রাবন্ধিক নেছার আহমদ তাঁর এই গ্রন্থে পূর্বকালের খ্যাতিমান মনীষী সমাজ সংস্কারক, জ্ঞানীগুণীবরণীয়স্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের আমাদের নূতন প্রজন্মের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে চিনিয়ে দিয়েছেন সেসব মহৎ প্রাণ সজ্জনদের কর্ম কৃতি, জীবনবেদ, আমরা ইতিহাস ঐতিহ্যবিমুখ এই দুর্নামকে হেলায় অগ্রাহ্য করে আমাদের সেই গুণী প্রয়াত পুরুষদের জীবন ইতিহাসকে নূতন প্রজন্মের কাছে সমুজ্জ্বলভাবে উপস্থাপন করে ইতিহাসের একটি বড় দায় মিটিয়েছেন। সাথে সাথে নিজেকে সবার কাছে ভিন্ন মাত্রার লেখক হিসেবেও উপস্থাপন করেছেন।

নিষ্ঠা ও শ্রমে সত্যিকারের জীবনে সাফল্য আসে কিংবা একজন যশস্বী লেখক হওয়া যায়লেখক নেছার আহমদের এই গ্রন্থ পর্যালোচনায় আবার যথার্থভাবে প্রতিভাত হলো। লেখক এ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে সেই দীর্ঘ সময় আগেকার খ্যাতিমান বিস্মৃতপ্রায় কালজয়ী মনীষীদের জীবন কর্ম কথা যে শ্রমসাধ্য প্রয়াসে সংগ্রহ করে গ্রন্থভুক্ত করেছেন তা খুবই অবাক করা বিষয়। দেখা যায় সেই সময়ের পাশাপাশি বর্তমান কালের সমসাময়িক মহান ব্যক্তিত্ব বর্গের কথা এই গ্রন্থে চমৎকারভাবে সম্মিলন ঘটিয়েছেন তা এক কথায় লেখকের অসামান্য প্রয়াসই বলা যায়। চট্টগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ চট্টগ্রামের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের কথাকর্মকে আমাদের চেতনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী করে দেওয়ার লেখকের প্রয়াস আজ সুধীমহলে বহুলভাবে প্রশংসিত ও নন্দিত হয়েছে সর্বক্ষেত্রেও।

ইতোমধ্যে প্রাবন্ধিক নেছার আহমদের বেশ ক’টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আমাদের ভুলে যাওয়া ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের নায়কেরা ও প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিপাত, আমাদের জাতীয় অবক্ষয়ের স্বরূপ, দেশ হতে দেশান্তরে (ভ্রমণ), শহীদ বুদ্ধিজীবীদের গল্প, বিশ জন শ্রেষ্ঠ বাঙালি, সমকালীন রাজনীতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি, এক নদী রক্ত পেরিয়ে সমি ও ইমতির গল্প উল্লেখ্য। আড্ডাআয়োজনের উদ্যোমী আয়োজক, বৈঠক আলাপচারিতার প্রাণবন্ত সমজদার, হাসি খুশির প্রাণখোলা মানুষ লেখক নেছার আহমদ। ব্যস্ত সমস্ত ব্যবসায়িক ঘেরাটোপের জীবনযাপনের পরও নেছার আহমদজাতীয়আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রেখে দায়বোধ থেকে নানা বিষয় আশয় সম্পর্কিত লেখালেখি করে নিজকে প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ করে চলেছেন সাথে সাথে সৃষ্টিশীলতায় উদ্যোগী হতে অন্যদেরও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক তুখোড় সংগঠক নেছার আহমদ তাঁর এ সাড়া জাগানো গ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন দৈনিক আজাদীর বরেণ্য সম্পাদক জনাব এম. এ মালেককে। শৈলী প্রকাশনের সুদৃশ্য এ প্রকাশনাচট্টগ্রাম মনীষীদের এ চমৎকার উপস্থাপন গ্রন্থের মূল্য আটশত টাকা। গ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী উত্তম সেন। চট্টগ্রামের স্মরণীয় জনদের নিয়ে লেখক প্রাবন্ধিক নেছার আহমদের শ্রমসাধ্য এ গ্রন্থ আমাদের মনন ভাণ্ডারে অতি মূল্যবান সংযোজন হিসেবে পাঠক গবেষকপ্রাজ্ঞজনের প্রয়োজন মেটাবেসাধুবাদ পাবেএকথা বেশ করে বলা যায়।

x