চট্টগ্রামের অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে বিরূপ প্রভাব ফেলছে

বুধবার , ৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ২:৩০ পূর্বাহ্ণ
120

রাজধানী ঢাকার পরই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরী চট্টগ্রাম। প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং ভোগ্যপণ্যের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামকে পরিণত করেছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে। কিন্তু বন্দরনগরী হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার, তার অনেকটাই অনুপস্থিত চট্টগ্রামে। গত কয়েক বছরে নির্মাণ হওয়া ফ্লাইওভারগুলো ছাড়া চট্টগ্রামের কোন উন্নয়নই দৃশ্যমান নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যানজট, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণের ফলে দিন দিন ম্লান হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীর অতীত উজ্জ্বলতা। এতে একদিকে বাড়ছে জনদুর্ভোগ, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না ব্যবসা-বাণিজ্যে। দেশের ভোগ্যপণ্য বাণিজ্যের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রণ হয় খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ের মাধ্যমে। অথচ কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এ শতবর্ষী বাজারের অবকাঠামো এখনো মান্ধাতা আমলের মতোই রয়ে গেছে। বন্দরনগরী লাইফলাইন খ্যাত চাক্তাই খাল এখন চট্টগ্রামের দুঃখ। খালটি অনেকটা মৃত হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুম তো বটেই, বছরে প্রতিটি পূর্ণিমা অমাবস্যার পূর্ণ তিথিতেও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় খাতুনগঞ্জ। সরু গলি আর অপরিকল্পিত অবকাঠামোর ফলে পুরো এলাকাটি হয়ে পড়েছে যান চলাচলের অনুপযোগী। কিন্তু এত সমস্যার মধ্যে থাকা ঐতিহ্যবাহী এ পাইকারি বাজারের উন্নয়নে নেই কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। পত্রিকান্তরে গত ২৮ নভেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়।
খবরে আরো বলা হয়, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর। এ বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ট্রাফিক সিস্টেম প্রবর্তন করা হয়নি। বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে বহুল ব্যবহৃত সড়কটি (বারিক বিল্ডিং থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত) এখনো দুই লেন রয়ে গেছে। ফলে বন্দরের প্রবেশ ও বাহির হওয়ার যানবাহনগুলোই চট্টগ্রাম শহরের যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লরি প্রবেশ করে চট্টগ্রাম বন্দরে। এছাড়াও চট্টগ্রামসহ সারাদেশের পণ্য পরিবহনে আরো কয়েক হাজার ভারী যানবাহন চলাচল করে চট্টগ্রাম নগরী দিয়ে। কিন্তু এসব যানবাহন রাখার জন্য নামমাত্র দুটি টার্মিনাল রয়েছে। বন্দরের মালিকানাধীন এসব টার্মিনালে মাত্র সাড়ে পাঁচশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান রাখা সম্ভব। বাকি যানবাহনগুলো চট্টগ্রামের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুই পাশেই রেখে দেয়া হয়।
একাধিকবার চট্টগ্রামে বৃহৎ কয়েকটি ট্রাক টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব এলেও একটিও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সড়কের দুই ধারে ট্রাক রাখার কারণে সম্প্রসারণকৃত সড়কও সরু হয়ে পড়ে। এতে যানজট বৃদ্ধি ছাড়াও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে চট্টগ্রাম শহরে।
প্রকাশিত উপরোক্ত খবরে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও বাণিজ্যিক রাজধানীর যে বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা দরকার, কী থাকলে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে, সেদিকে যেন মনোযোগ কমছেই। মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়ায় চট্টগ্রাম শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধীরগতিতে ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়ছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। প্রধান সমুদ্র বন্দর এবং ভোগ্যপণ্যের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজারের কারণে অর্থনৈতিক দিক থেকে চট্টগ্রামকে রাজধানী ঢাকার পরই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত করেছে। স্বভাবত এর উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রামের প্রয়োজনীয় উন্নতি এখনো পর্যন্ত করা যায়নি। বরং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অতীত উজ্জ্বলতাও হারিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করা হলেও প্রত্যাশিত উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে না। ফলে অর্থের যথাযথ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কী ধরনের উন্নয়ন চট্টগ্রামে প্রয়োজন, কী ধরনের উন্নয়ন করা হলে চট্টগ্রামবাসী উপকৃত হবে। এসব না জেনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা কাঙ্ক্ষিত উপকারে আসবে না।
কেবল চট্টগ্রাম মহানগরীর উন্নয়নের কথা ভাবলে চলবে না। উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়নের পরিকল্পনাও নিতে হবে। ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে হলে সুপরিকল্পিত প্রকল্প নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলে তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। ফ্লাইওভার দিয়ে উন্নয়নের বিচার করা যায় না। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বন্দরের বড় সমস্যা ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। ট্রাফিক সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে চট্টগ্রাম শহরে যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। কেবল বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করলে হবে না, পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে। চট্টগ্রাম মহানগরীর বড় অভিশাপ জলাবদ্ধতা। বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করা হলেও এর সমাধান এখনো হয়নি। এ সমস্যা অব্যাহত থাকলে টেকসই উন্নয়ন, অসম্ভব। চট্টগ্রামের অগ্রগতির জন্য বিমান ও রেলওয়ের কানেক্টিভিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি হলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যেসব পণ্য অন্যত্র যাচ্ছে তা খুব কম সময়ে চলে যেতে পারবে। একই সাথে এঙপ্রেস লাইন খুবই দরকার। কর্ণফুলী নদীর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।
চট্টগ্রামের পানি সংকট দূর করতে একাধিক পরিশোধনাগার নির্মাণও খুবই প্রয়োজন। চট্টগ্রামে ঢাকার মতো বিশেষায়িত কোন হাসপাতাল নেই। এখানে হৃদরোগ, ক্যান্সার, পঙ্গু হাসপাতালসহ বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রয়োজন। অবকাঠামোগত সুষম উন্নয়নের অভাবে চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় প্রধানত রাজধানীতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সবকিছু রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়া বিধেয় নয়, কারণ এতে যাতায়াতে আর্থিক ও সময়ের ক্ষতি হয়।
চট্টগ্রামের উন্নয়ন এক অর্থে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তাই সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য যে ব্যয় করছে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশনসহ সংস্থা ও দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নই চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

x