ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি এ হৃদয়

বিফোর সানরাইজ

ইলিয়াছ কামাল রিসাত

মঙ্গলবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
178

কথা বলছি রিচার্ড লিংকলেটার এর বিখ্যাত ‘Before Trilogy’ খ্যাত তিনটি সিনেমার প্রথম সিনেমা ‘Before Sunrise’ নিয়ে। সিনেমার শুরু ইউরোপের এক ট্রেনে এক দম্পতির ঝগড়াঝাটির দৃশ্যায়ন দিয়ে। পাশেই বসে ছিল সিনেমার মূল নারী চরিত্র রূপদানকারী ‘সেলিন’। একটু পরেই ঐ দম্পতির কূটকাচালে বিরক্ত হয়ে উঠে অন্য সিটে চলে যাবে। হাতে একটি বইও আছে। গিয়ে একটু দূরে নিরিবিলি একটা সিটে বসে পড়ল। বাঁ পাশের সিটে বসে আছে ‘জেসি’, মূল পুরুষ চরিত্র রূপদানকারী।

মনে হচ্ছে যেন সিনেমার গল্পটা পুরো লিখতে বসে গেছি। যেটুকু বর্ণনা দিলাম, তাতে পাঠকগণ এতটুকু হয়তো আশ্বস্ত হতে পেরেছেন যে, সিনেমায় প্রেম আছে অবশ্যই। যেহেতু একটা নাটকীয় মুহূর্তের মাধ্যমে সিনেমার শুরু সেহেতু এর পরে কি হতে পারে তা আঁচ করা যাচ্ছে। খুব স্বাভাবিকভাবে এটা ধারণা হতে পারে যে, সেলিন এবং জেসির মধ্যে কেউ একজন মাটিতে কিছু পড়ে গেলে দুইজনই একসাথে তা তুলতে যাবে এবং মাথায় ঠোকাঠুকি লাগবে। এর পরে ব্যাকগ্রাউণ্ডে পুনর্জন্মের মিলনের সাথে যায় এমন কোন সংগীত বেজে উঠবে।

অনেক ঠাট্টাতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে লেখায়। আসল কথায় আসি। ভালবাসা দিবস কিংবা ফাগুনের এই কৃষ্ণচূড়ার লাল আগুনে প্রেম ছাড়া আর কিছুই মুখ্য বিষয় হতে পারে না। প্রিয় ভালবাসার এই সিনেমা নিয়ে ভাবতেই এই সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি সংলাপ, সিনেমার শ্যুটিং স্থল ভিয়েনার চার্চের ঘন্টা, রাজপথে হস্ত বিশারদ মহিলার প্রাজ্ঞ চাহনি, সমাধিস্থলের এপিটাফে সেলিনজেসির জীবনমৃত্যু বিষয়ে সংলাপ, দানিয়ুব নদীর পাড়ে এক খেপাটে পাগলা অভাবী কবির ‘মিল্কশেক’ শব্দ দিয়ে কবিতা গাঁথাএসব ঘুরে ফিরে আসে যাপিত জীবনের কিঞ্চিৎ অবসরে।

এই সিনেমা সম্পূর্ণ দুইজন আগন্তুকের প্রেমে পড়ার গল্প। প্রেমে পড়াটা মুখ্য নয় যদিও। সেই ট্রেনেই তাদের প্রথম দেখা, ঘটনাচক্রে। জীবনের নানা বিষয়াদি নিয়ে গল্প করতে থাকে তারা।

গল্পের শুরু হয় সেই ঝগড়াটে দম্পতি নিয়ে। সেলিন বলে উঠে, বিবাহিত যুগল যত দিন পার করতে থাকে তত তাদের পরস্পরকে শোনার সামর্থ্য কমতে থাকে। এভাবে তারা এক এক পার্থিব বিষয়ে আলাপচারিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেলিনের অনন্য চিন্তাভাবনা, জেসির অন্যমনস্ক কিন্তু গভীর দর্শন সব মিলে একটা ইমপ্রেশন দর্শকের মনে ছাপ ফেলতে থাকে।

ঘটনাচক্রে সেলিন ভিয়েনায় নামার কথা ছিল না, সে যাবার কথা ছিল প্যারিস। জেসি তাকে বলে বসল হঠাৎ, আজকে ভিয়েনায় সারারাত তারা গল্প করে, আড্ডা দিয়ে কাটাবে, সেলিন যেন পরের দিন সকালে প্যারিসে রওনা দেয়। সেলিন এক কথায় রাজি হয়ে যায়। এক জন আরেকজনের প্রতি অন্তরঙ্গ হতে থাকে। চিন্তায়, মননে, সংস্পর্শে।

তাদের আড্ডা জুড়ে উঠে আসে ধর্ম, মিডিয়া, প্রযুক্তি আসক্তি, বিয়ে প্রথা এবং আরো জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়াদি। ভিয়েনার এক নির্জন চার্চে তারা দুজন চুপচাপ গল্প করার সময় সেলিন বলে উঠে– Even though I reject most of the religious things I Can’t help but feeling for all those people that come here lost or in pain. guilt, looking for some kin of answers. It fascinates me how a single place can join so much pain and happiness for so many generations.

বর্তমান কালে আমরা একে অপরের কাছ থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন হচ্ছি সে প্রসংগে বলতে গিয়ে জেসি বলে– Eternal soul ব্যাপারটা অদ্ভুত। ধরে নেই এমন পরমাত্মা আছে আমাদের পৃথিবীতে। সেই দশহাজার বছর আগে হয়তো ২০ লক্ষ মানুষের বসবাস ছিল। আর এখন মানুষের সংখ্যা হল এর চেয়ে তিনচারশ গুণ বেশি। সুতরাং সেই সব আগেকার মানুষ যদি আজকের পৃথিবীতে পুনর্জন্ম নেয় তবে এতসব মানুষের মধ্যে তারা বিভাজিত হয়ে গেছে। তাই আমরা বর্তমানে এতটা বিচ্ছিন্ন, এতটা বিশেষায়িত।

প্রযুক্তি যতই সময় বাঁচানোর কথা বলুক না কেন, সেই সময় দিয়ে কেউ কি কোন আশ্রমে ঘুরে আসে?

সিনেমার এক পর্যায়ে তারা এক রেস্তোরাঁয় বসে দুটি ফোন কলের অভিনয় করে একে অপরের সাথে। ফোন কলের বিষয়টা ছিল এমন: সেলিন প্যারিসে যে বান্ধবীর সাথে দেখা করত তাকে তার অনুপস্থিতির বিষয়ে কি এক্সকিউজ দিবে? আর জেসি তার আমেরিকান বন্ধুকে কি বলবে? এরই মধ্যে একজন আরেকজনকে ভাল লাগার কথা অভিনয়ের মধ্যে বলে দেয়।

এদিকে রাত ফুরোতে থাকে। তারা দুজন কনফিউশনে থাকে। তাদের কি আর দেখা হবে না? হলে কীভাবে? একবার বলে দেখা না করে এমন দুর্লভ রাতের স্মৃতি বর্ণাঢ্য হয়ে থাকুক। আরেকবার বুঝিয়ে দেয় তারা অপার্থিব সময়ে পার্থিব রাধাচূড়ার মত প্রেম আলিঙ্গন করতে পারে। সিনেমার শেষের দিকে তারা যেসব জায়গায় বিচরণ করেছিল সেসব জায়গা আবার দেখায়। এবার আর তারা নেই। দানিয়ুব নদীর পাড়, পার্ক, সমাধিস্থলের এপিটাফ, ভিয়েনার অলিগলি সব জুড়ে দর্শক প্রেম খুঁজে বেড়ায়।

সিনেমার প্রেমের চিত্ত ধারণ অনেকটা জীবনানন্দের এই কবিতার লাইনের মতোঃ

অনেক মুহূর্ত আমি ক্ষয়

করে ফেলে বুঝেছি সময়

যদিও অনন্ত, তবু প্রেম সে অনন্ত নিয়ে নয়।

তবুও তোমাকে ভালবেসে

মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে

বুঝেছি অকূলে জেগে রয়

ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি এ হৃদয়’।

x