ঘোরের ঘূর্ণিপাকে

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৫ জুন, ২০১৮ at ৪:৩০ পূর্বাহ্ণ
13

ভুল পথে রাস্তা পার হচ্ছিলেন তিনি। তাও সিডিএ এভেন্যুর ওয়ানওয়ে লেইনের চিপায়। ষোলশহর ২ নম্বর গেটের কাছেজিইসি মোড়মুখী সড়কে। শেষ বিকেলের দুর্বল সূর্য তখনো আগুন ঝলসাচ্ছে। হয়তো বিদায়ের ক্ষোভে! প্রচন্ড ব্যস্ত সড়ক। ইফতারের আগে ঘরমুখো মানুষ ও গাড়ির অসহনীয় ভীড়। প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে ভদ্রলোক গাড়ির ভীড় উপেক্ষা করে প্রায় নির্বিকারভাবে এগুচ্ছিলেন। জিইসিগামী একটা যাত্রীবাহী রাইডার তীব্র গতিতে এসে তার ঘাড়ে পড়ার মুহুর্তে চোখের পলকে ডানা ধরে লোকটাকে টেনে আনি। অতো গতি ও নিখুত সময় জ্ঞান কোত্থেকে আসল, বুঝে উঠার আগেই রাইডার রংসাইডে মোড় কাটিয়ে নেয়। তাড়া করে লোকজনের সহযোগিতায় আটকাবো কিনা, সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। কারণ, কারো সাড়া পাবো, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ!

সবাই নিজকে নিয়ে ব্যস্ত। একটু চোখ বুলিয়ে মনে হলো, মানুষ, যান সবাইকে যেন অদৃশ্য কোন দানব তাড়া করছে! জটটট কিছুই যেন বাধা নয়! সবার গন্তব্য নিজস্ব ঠিকানা। কে মরছে বা বাঁচছে, দেখার একফোটা সময় নেই। ভদ্রলোক বেশ বয়স্ক, ৭৫/৮০ হতে পারে। শরীরও দুর্বল। তিনি তখনো আটকে রেখেছেন, আমার ডান হাত। শরীর জুড়ে মৃত্যুর থাবা থেকে বেঁচে ফেরার অস্বাভাবিক কম্পন! বিশ্বাস করতে পারছেন না, তিনি বেঁচে আছেন! নিজের কাছেও ঘটনাটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। কীভাবে তাকে যমদূতের কব্জা থেকে ছিনিয়ে আনলাম, ঠিক মনেও করতে পারছিনা। নিজের জীবনে অনেক মিরাকল আছে। নতুন একটা যোগ হলো ভেবে একটু স্বস্তি পাই।

ধাতস্থ হয়ে জানতে চাই, আপনি এতবড় ঝুঁকি নিলেন কেন?

ভদ্রলোক নির্বিকার, উল্টো দার্শনিক প্রশ্নের ধারালো তীর ছোঁড়েন, আমাদের দেশে এখন কত মানুষ বাস করে বলতে পারেন?

আশ্চর্য, কোথায় জানের মায়া ছেড়ে তাকে উদ্ধার করায় শুকরিয়া জনাবেন, তা না উল্টো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে করছেন কিনা আজগুবি প্রশ্ন!

বিরক্ত হলেও সামলে নিই বলি, হালনাগাদ হিসাব নেই। এমনিতে সাড়ে ১৬ কোটির এদিকওদিক হবে।

ছোট একটা দেশে এতো মানুষ থাকা কী উচিৎ?

ভদ্রলোকের উদ্ভট প্রশ্নে মেজাজ সামলে রাখা দায় হয়ে পড়ে। বলি, তো এখন কী করা উচিত?

কেন, শিয়ালকুকুরের মতো মরে যাওয়া উচিৎ।

ধন্ধে পড়ে যাই, আকস্মিক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়ে ভদ্রলোক মানসিক ট্রমায় পড়লেন, নাতো?

আশ্চর্য, তিনি আমার চিন্তার গতি ঠিকই পড়ে নিয়ে বলেন, নিশ্চয়ই ভাবছেন পাগলামি করছি। না পাগলামি নয়, অন্তত অর্ধেক মানুষ বিয়োগ হয়ে যাওয়া উচিত। তাহলে একটা জাতীয় শৃঙ্খলা চেইন তৈরি হবে। মানুষ শৃঙ্খলা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ শিখে ধ্বংস থেকে। হোক সেটা মানব সৃষ্ট অথবা প্রাকৃতিক বা ঐশ্বরিক। বাংলাদেশের আয়তন এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের সামান্য বেশি। এতো ছোট ভূখণ্ড কেন এত ঘন বিশৃঙ্খল মানব জঙ্গল হবে, বলুন?

লোকটাকে সাধারণ পথচারিই ভেবেছিলাম। তার যুক্তি,বক্তব্যের দৃঢ়তায় পাল্টে যায় সবকিছু। বিনয়ের সাথে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি পাশ কাটিয়ে বলেন, মানুষ নিজের কর্মফলে কষ্ট পায়। দোষ চাপিয়ে দেয় তৃতীয় পক্ষের উপর। সরকার অথবা সৃষ্টিকর্তাই তাদের মূল টার্গেট। অথচ কেউ তাদের হাতের কাছে নেই। কেন, আমরা নিজের দোষ দেখিনা? উত্তর খুব সহজ, আমরা অন্ধ। চোখ আছে, চোখজোড়া নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই চিনে না, দেখে না। এ’ভাবে ব্যক্তি স্বার্থের ভারবাহী এত বিপুল মনুষ্য জঙ্গল নিয়ে ছোট দেশটি এগুতে পারবে না। এক পর্যায়ে হোঁচট খেয়ে পড়বেই। আমি গাড়ি চাপা পড়লে আপনার কী ক্ষতি,বলুন কী ক্ষতি? কেন বাঁচাতে গেলেন, কে বলেছে, আপনাকে? লোকটা আবার কথার মোড় পাল্টে হঠাৎ আমার উপর প্রচণ্ড ক্ষোভ ঝাড়েন।

দ্রুত বাসায় ফেরা দরকার। ইফতারের বেশি দেরি নেই। কিন্তু পারছি না, কেমন যেন সম্মোহনে জড়িয়ে গেছি।

আমার তাড়া ছিলনা,ডিভাইডারে অপেক্ষা করতে পারতাম। আপনাকে দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টাই। রিস্কটা ইচ্ছাকৃত। আপনার প্রতিক্রিয়া দেখার ইচ্ছায়। তিনি বলেন।

বিস্ময়ের পর বিস্ময়ের ধাক্কা! ‘আপনি আমাকে চিনেন, কীভাবে? আমিতো ঠিক মনে করতে পারছি না’। একদম সাদামাটা মানুষটাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে প্রশ্ন করি। তিনি স্মিত হেসে বলেন, আপনি চিনেন না, আমি চিনি। আপনার রাজনৈতিক জীবন, সাংবাদিকতা, প্রায় প্রতিটা লেখার সাথে আমি পরিচিত। ওই সূত্রে চিনে নিয়েছি। বুকটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। এমন কেউ আছেন জানা ছিল না। লিখি পেশার টানে। রাজনীতি করেছি আদর্শিক টানে। এ’রকম কোন ভক্ত আছেন, বিশ্বাস করতে পারছিনা! প্রায় ঘোরের জগতে ঢুকে যাই। তিনি ঘোর ভেঙে দেন, আপনার রাজনৈতিক লেখায় দেশ ও মানুষের প্রতি মমত্বে কোন খাদ নেই। কিন্তু মানব জঙ্গলের আগাছার ঝাড় সাফ না হলে দেশ কোনদিনই তার কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেনা। যদি পারেন, জাতীয় নেতৃত্বকে এই বার্তাটা বারবার পৌছে দিন। সরকারেপ্রশাসনে আবর্জনার বোঝার ভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কীভাবে এগুবেন? ভুলে যাবেন না, শিক্ষিত বিশেষ করে সুশৃংখল ও সচেতন জনগোষ্ঠীই হচ্ছে, শ্রেষ্ট মানব সম্পদ। দেশে এই সম্পদের এখন তীব্র খরা চলছে। বলতে বলতে তিনি হাত ছেড়ে দিয়ে আমাকে ঘোরের মাঝে চুবিয়ে মিশে গেলেন জনসাগরের আড়ালে।

মাত্র কদিন আগের ঘটনা। সত্যনাকি ঘোর এখনো বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। ভদ্রলোক কে, তাও বুঝতে পারছি না।

x