ঘুঘুর বিয়ে

সাইমুন পাশা মামুন

বুধবার , ২৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
17

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় শ্রেণির ছাত্র মিল্টন। বয়সের তুলনায় দুষ্টু আর ডানপিটে। সারাদিন নতুন খেলা আবিষ্কার, আর এ গাছ থেকে ও গাছে উঠে বেড়ানো তার কাজ। যেমন গাছ হোক না কেন, তর-তর করে উঠে যাবে গাছের মাথায়। উঁচু গাছের মগডালে পা জড়িয়ে নিচের দিকে মাথা দিয়ে ঝুলতে পারে অনায়াসে। যা দেখে পিলে চমকে যেত অনেকের। দুষ্টু মিল্টনের জন্য এটা কোন ব্যাপারই না। গ্রামের ছেলে বুড়োরা তাকে বাঁদর ছেলে বলে জানতো।
একদিন মিল্টন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। বাড়ির সামনে খালের ওপর বাঁশের সাঁকো। পার হয়ে এপার আসতেই, দেখলো দুটি ঘুঘু একটি কাকের সাথে ঝগড়া করছে। তবে কাকের সাথে পেরে উঠছে না। মিল্টন বই, খাতা রেখে, তরতর করে গাছে উঠল। কাকটি মিল্টনকে দেখে উড়ে গেল। দেখলো ঘুঘুর বাসায় একটি বাচ্চা। গায়ে রক্তমাখা। ভয়ে কাঁপছে। মিল্টন গাছের ডালে বসে একটু ভাবে। বাচ্চাটি ঘরে নিয়ে গেলে মা রাগ করবে। আবার এখানে রেখে গেলে কাক খেয়ে ফেলবে। কিছুক্ষণ ভেবে মিল্টন ঘুঘুর ছানাটি ঘরে নিয়ে এলো।
তখন সন্ধ্যা। ঘর অন্ধকার। মিল্টন কি যেন লুকাচ্ছিল খাটের নিচে। দেখলো মিল্টনের মা। কিরে মিল্টন, এখানে কি করছিস? এই সন্ধ্যার সময়। মিল্টন বলে, না, মা কিছু করছি না। এমন সময় মিল্টনের মা কেয়া বেগম ঘরের বাতি এনে দেখল, ছোট একটি হাঁড়ির মধ্যে কিছু খড়কুটা, তার ওপরে একটি ঘুঘুর ছা। মিল্টনের মা মিল্টনকে ধমক দিয়ে বলে, বল এটা কোথায় পেয়েছিস্‌্‌? এখনই বাসায় রেখে আসবি। নইলে তোকে ঘরে জায়গা দেব না। আজ খেতে দেব না। মিল্টন মাকে বুঝিয়ে বলল। মা বাচ্চাটির গায়ে রক্ত দেখে মিল্টনের কথা বিশ্বাস করল। মিল্টন বলে, মা, আমি বাচ্চাটি রেখে আসলে কাক খেয়ে ফেলবে। এবার মিল্টনের দিকে তাকিয়ে মিল্টনের মা বলে, তারপরও বাচ্চাটি তোর ধরে আনা ঠিক হয় নি।
তখন থেকে মিল্টন ও মা দু’জন মিলে লালন পালন করে বাচ্চাটিকে বড় করতে লাগলেন। মিল্টন মুখে চাল নিয়ে ঘুঘুটির মুখের দিকে মুখ আগালে, বাচ্চাটি পাখা ঝাপটিয়ে মিল্টনের মুখ থেকে খাদ্য খেত। যেন তার মায়ের কাছ থেকে খাচ্ছে। বাচ্চাটি একটু বড় হল। মিল্টন সকালে সকালে বাচ্চাটিকে একটি গাছের ডালে বসিয়ে দূর থেকে হাত বাড়ালে বাচ্চাটি উড়ে এসে মিল্টনের হাতে বসতো। আর ঠোঁট মিল্টনের মুখে ঢুকিয়ে খাদ্য খেতে চাইতো। মিল্টন ঘরে না থাকলে মাও বাচ্চাটিকে খাদ্য ও পানি দিত। এভাবে দু’জনে মিলে বাচ্চাটিকে বড় করে তুলল। কয়দিন হয় বাচ্চাটি একটু একটু করে ডাকতেও শুরু করেছে। যা শুনে মিল্টনের যেন খুশি আর ধরে না।
একদিন মিল্টনের মা কেয়া বেগম খাবার দেওয়ার সময় ফাঁক পেয়ে বের হয়ে গেলো ঘুঘুটি। উড়ে গিয়ে বসলো সামনের আম গাছে। মিল্টন আম গাছে উঠতে ঘুঘুটি উড়ে গেল অন্য একটি গাছে। এভাবে অনেক দূরে চলে গেল ঘুঘুটি। মিল্টন সারাদিন ঘুঘুর পিছনে পিছনে ঘুরে কাঁদতে কাঁদতে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলো। কারো সাথে কথা বলল না এবং কিছু খেলো না। রাতে মিল্টন খালি গায়ে একটু একটু শীতের মধ্যে শুয়ে আছে। মা মিল্টনের গায়ে কাঁথা দিতে গেলে মিল্টন বলল না, তুমি আমার গায়ে কিছুই দিবে না। কিচ্ছু না। আমি শীতে মরে গেলেও কিছু গায়ে দেব না। তুমি আমার ঘুঘুটি ছেড়ে দিয়েছ, একটু একটু কান্নার স্বরে বলল মিল্টন। ও আজ শীতে মরে গেলে কি হবে, ওকে কে কাঁথা দেবে। এই বলে মুখটা মায়ের দিক থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। আর চোখ দিয়ে পানি বের হল। মিল্টনের মা মিল্টনের মাথায় হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, বাবা, আমি কি ইচ্ছা করে ছেড়েছি? ও নিজেই তো উড়ে গেলো! আমার কি কম খারাপ লাগছে? আহা! রাতে যদি শিয়ালে ধরে খেয়ে ফেলে! বাচ্চাটি ভাল করে উড়তেও পারে না। এই কথা শুনে মিল্টনের আরো কান্না পেল।
পরদিন খুব ভোর বেলা। মিল্টন আম গাছের নিচে খুব আগ্রহ নিয়ে ঘুঘুটির জন্য অপেক্ষা করছে। আসলে আসতে পারে ঘুঘুটি। খাবার খুঁজে খেতে জানে না। যদি না আসে তবে না খেয়ে থাকবে। এমন সময় ঘুঘুটি কোথা থেকে উড়ে এসে মিল্টনের সামনে বসল।আর উঁকি ঝুঁকি দিয়ে মিল্টনের দিকে তাকাচ্ছে। মিল্টন একটু ঘুঘুটির দিকে এগুতেই আবার উড়ে আম গাছের ডালে বসল। এবার মিল্টন একটি বাটিতে কিছু ডাল নিয়ে গাছের ডালে রেখে আসলো। ঘুঘুটি বাটি থেকে ডাল খেয়ে পাশের নারকেল গাছের পাতায় বসল। আর এসব দূর থেকে দেখল মিল্টন। আনন্দে তার মনটা ভরে গেলো। এভাবে কাটলো কয়েকদিন।
সেদিন স্কুল বন্ধ দুপুর বেলা। মিল্টন হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠল। ও মাগো ও দাদা ভাই, ও মানিক্কা ভাই. . . ইত্যাদি। মিল্টনের হঠাৎ এমন চিৎকার শুনে সবাই ঘর থেকে বের হয়ে আসলো। মিল্টন আঙুল দিয়ে দেখালো নারকেল গাছের ওপরে বসা মিল্টনের পালিত ঘুঘুটি। সাথে আরো একটি ঘুঘু। ঘুঘু দুটি একে অপরের গা খুটে দিচ্ছে ঠোঁট দিয়ে। মিল্টনের ঘুঘুটি অন্য ঘুঘুটির মুখে ঠোঁট দিয়ে খাবার খাওয়াচ্ছে। মিল্টন বলল, দেখো আমার ঘুঘুটি বড় হয়েছে। ও বিয়ে করেছে। ওটা ওর বউ! মিল্টন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আর ভয় নেই মা। এমন সময় মিল্টনের দাদা ভাই বলে জানো বউ মা, সেদিন ঘুঘুর বাচ্চাটি মিল্টন না আনলে কাক খেয়ে ফেলতো। মিল্টনের জন্য ঘুঘুটি বেঁচে রইল। আজ আবার মহাআনন্দে ডানা মেলে উড়তে পারলো আকাশে। এ সময় মা মিল্টনের গালে একটু আদর করে বলে ভালোই হয়েছে। ঘুঘু দুটি এক সাথে এতলোক দেখে উড়ে গেল, দূরের আকাশে।

x