গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তালপিঠার কদর কমে যাচ্ছে

মনজুর আলম : বোয়ালখালী

সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
17

ভাদ্র মাসে গাছের তলায়/ ঝইরা পড়ে তাল/পাকা তালের মৌমৌ গন্ধে করে যে মাতাল। তালের পিঠা বেজায় মিঠা/খেতে ভারি মজা/ ভাদ্র মাসের তালের পিঠা, খায় যে রাজাপ্রজা।

তাল নিয়ে এ ধরনের কত কবিতা, কত ছড়া ও গান রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই । যে গুলো এখনও তাল পিঠার গুরুত্ব সম্পর্কে জানান দিয়ে যাচ্ছে আমাদের।

ভাদ্র মাস শেষ। আশ্বিন শুরু হয়েছে। এসময় আমাদের মনে পড়ে পাকা তাল ও তাল পিঠার কথা। কথায় বলে ভাদ্রের তাল পাকা গরমে। সম্ভবত এ মাসটিতেই তাল পাকে তাই এ সব কথার প্রচলন। বছরের এ সময়টাতে পাকা তালের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠে চারিদিক। খাদ্য রসিক বাঙালি রসনা বিলাসের জন্য এ মাসেই তাল রসে তৈরি পিঠাসহ মুখরোচক নানা খাদ্য আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন। খুব ধৈর্য নিয়ে গ্রামীণ নারীরা তালের আঁশ থেকে নির্যাস বের করে তৈরি করেন তালের চিতল পিঠা, কাঁঠাল পাতায় ভরে কলকি পিঠা, তাল পিঠা, তাল বড়া, তাল তেল, তালরুটি, তালের পায়েস, কলাপাতায় তাল পিঠা, তালের রসভরিসহ হরেক রকমের পিঠাপুলি ইত্যাদি।

প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এককালে এ সময়ে গ্রামের প্রতিটা ঘরে ঘরে তাল পিঠা বানানোর ধূম পড়ে যেত। সারারাত ধরে পিঠা তৈরি করে সকালে তা আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশিসহ অন্যের বাড়িবাড়ি বিলানো হত সেই পিঠা। সবাই আনন্দচিত্তে তৃপ্ত হত সে পিঠা খেয়ে। গ্রাম বাঙলার কোনখানে এসব মন ভুলানো দৃশ্য এখন কারো চোখে পড়ে কিনা আমার জানা নেই। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায় কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত সুস্বাদু এসব তাল পিঠা ও সেই সাথে এর ঐতিহ্যও। গাছতলায় গিয়ে দল বেঁধে তাল কুড়ানো, সেই তালের রস নিয়ে পিঠা বানানো, তৈরি পিঠা নিয়ে বাড়িবাড়ি বিলানোর চিত্র এখন যেন স্মৃতির পাতায় বন্দি হতে চলেছে।

কারণ হিসেবে মানুষের ব্যস্ততা, তালসহ এর অন্যান্য উপরণের মূল্যবৃদ্ধি ও বর্তমান প্রজন্মের কাছে এ পিঠায় অনীহাকে দায়ী করছেন অনেকেই।

এ ব্যাপারে গোমদন্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষিকা দীপ্তি বিশ্বাংগ্রী বলেনবৈশাখজ্যৈষ্ঠের শুরুতেই এখন শাস যুক্ত প্রায় সব তাল বিক্রি করে দেন গাছ মালিকরা। অবশিষ্ট দুএকটি তাল গাছে থাকলেও পাকতে না পাকতেই এর মূল্য হয়ে যায় অনেক চড়া । ৮০ থেকে একশ’ টাকার নিচে ভালো পাকা তাল পাওয়াই দায়। এর উপর আছে আরো অন্যান্য উপকরণ।

এতে করে দিনকেদিন গ্রাম বাঙলার এক বিরাট জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এসব তাল পিঠার স্বাদ।

তাছাড়া তালের তৈরি খাবার যেমন সুস্বাদু তেমনি এর প্রস্তুত প্রণালি একটু কষ্টসাধ্যও বটে। এ সব কষ্ট সহ্য করে এ প্রজন্ম বানাতে চান না এ ধরনের পিঠাপুলি। তাই সেই আগের মতো সুস্বাদু পিঠা পায়েস খাবার সুযোগ থাকে না অনেকেরই। এভাবেই আস্তেআস্তে আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই।

এ নিয়ে নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক আলীউর রহমান খুবই আক্ষেপের সুরে বলেনকাঁঠাল পাতায় মোড়ানো নারিকেলে ভরপুর গরম তাল পিঠা খেতে কতই না মজা, যেন অমৃতের স্বাদ। বার মাসে তের পার্বণের সব পিঠাপুলি বানানো হয় ঘরে। চট্টগ্রামের মধু ভাত, তাল পিঠা, মেজবানি রান্না,শুঁটকি মাছ, বেলা বিস্কিট, বাকর খানি, লক্ষীশাক, গরুর গোস্ত, কালো ভুনা, ফেলন ডাল, আফলাতুন হালুয়া, নোনা ইলিশ থেকে আরম্ভ করে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সব খাবারগুলো বানানো হয়। কিন্তু এসব খাবার আমি যেভাবে আনন্দের সাথে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে থাকি। আমার সন্তানরা তার উল্টো। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এসব খাবারের চেয়ে তাদের কাছে এখন খুবই প্রিয় পিৎজা, চিকেন গ্রিল,বিরিয়ানি, ফাস্ট ফুডের অন্যান্য খাবারগুলো। তাদের এসবে বারণ করতে চাইলে তারা বলে আমরা নাকি ব্যাকডেটেড। তাঁর প্রশ্নতাহলে কি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি? অভিজ্ঞমহল মনে করেন আমাদের কৃষ্টি ও লোকজ সংস্কৃতির একটি বড় অংশ দখল করে আছে তাল ও তালের পিঠা। এর ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাইলে আমাদের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে এর স্বাদগুণে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হবে।

x