গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো গাফেলতি কাম্য হতে পারে না

বুধবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
72

গ্যাস সংকট মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। গত তিন দিন ধরে নগরবাসী ব্যাপক যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছেন। এই সংকটের কারণে শুধু বিদ্যুৎ নয় আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। আবাসিকে চুলা জ্বালানোই দায় হয়ে পড়েছে, শিল্পে গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আগেই বলেছিলেন, গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কম। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ কম বলে সংকট তৈরি হয়েছে। দিন দিন গ্যাস কমে যাচ্ছে, এটাই বাস্তবতা। তবে আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের ৭০ ভাগ চুলা এলপি গ্যাসে চলবে। সে পরিকল্পনা করা হয়েছে। তখন আর সমস্যা থাকবে না।
জনজীবনে মৌলিক উপাদানের সমস্যা মোকাবেলায় নারীদের হিমশিম খেতে হয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সঙ্কটে তাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। গ্যাসের চাপ না থাকলে বাড়ির ছাদে কাঁচা চুলা বসিয়ে রান্না করতে হয়। গত তিন দিন ধরে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গৃহিণীদের। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়ায় গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ত্রুটি সারতে কাজ করছে এলএনজি সরবরাহে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। কোম্পানিটির কর্তারা কেজিডিসিএলকে জানিয়েছে, আগামী ১৫ নভেম্বরের আগে পুনরায় সরবরাহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে বিকল্প হিসেবে জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়েছেন কর্ণফুলীর গ্যাসের কর্মকর্তারা।
কারিগরি ত্রুটির কারণে আবাসিকসহ শিল্পকারকানায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় দুর্গতি পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের। আজাদীতে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে নগরীর চান্দগাঁও, বাকলিয়া, বাদুরতলা, চকবাজার, দামপাড়া, কাজীর দেউরি, মেহেদিবাগ, পাঁচলাইশ, খুলশী, লালখান বাজার, আগ্রাবাদ, পাহাড়তলী, শুলকবহরসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় গ্যাস একেবারেই ছিলো না। আবার কিছু কিছু এলাকায় অল্পস্বল্প পাওয়া গেলেও তা রান্না করার মতো যথেষ্ট ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে গৃহিণীরা কেরোসিন স্টোভ, ইলেকট্রিক চুলা ও ইট দিয়ে অস্থায়ী চুলা তৈরি করে রান্নার কাজ সেরেছেন। অন্যদিকে গৃহকর্তাদের হোটেল রেস্টুরেন্টেও ভিড় করতে দেখা গেছে।
নানা আশাবাদ ইতোমধ্যে আমরা পেয়েছিলাম। এই সব আশ্বাস শুনে শুনে মনে হয়েছে, গ্যাসের সংকট আর থাকবে না। দৈনিক আজাদীতে প্রধান সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘গ্যাসের জন্য দীর্ঘশ্বাস আর নয়’ শীর্ষক একটি আনন্দ বার্তাও। এতে বলা হয়েছে, ‘গ্যাসের জন্য দীর্ঘশ্বাস আর নয়। সরবরাহের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লাইনে পাচ্ছে চট্টগ্রাম।’ গ্যাসের সংকট লাঘবে গত আড়াই মাস আগে বহুল প্রতীক্ষিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সঞ্চালন পাইপলাইনে দেয় সরকার। তখন চট্টগ্রামবাসীর মনে আশার সঞ্চার হয়। শিল্পোদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সবাই ভাবতে শুরু করেন যে, অনেক পুরনো দুর্ভোগ কেটে গেলো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো সেই আগের চিত্র।
এ কথা আজ বলা অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, চট্টগ্রাম শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। অথচ চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও পাচ্ছিল না সেই চট্টগ্রাম। গ্যাস সংকটের কারণে শুধুমাত্র শিল্প কলকারখানা নয়, বাসাবাড়ির লোকজনের জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। গ্যাস সংকট অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় সমস্যাটি শুধুমাত্র গৃহিণীদের নয়, বস্তুত সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিই পড়েছে সংকটের মুখে। জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম যে কোনো বিবেচনায় গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। তাই বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহকৃত গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাসের চাপ বাড়ানো, উৎপাদন, সংযোগ, সুষম বণ্টন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্যাসের সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছে দেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতৃবৃন্দ।
কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজির সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এলএনজির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা ত্রুটি সারাতে কাজ করে গেলেও আগামী ১৫ নভেম্বরের আগে এলএনজির সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার কারণ কী- তা উদঘাটিত হওয়া দরকার। এই সমস্যার পেছনে যদি কোনো কর্মকর্তা দায়ী থাকেন, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্যাস সরবরাহের মতো অত্যাবশ্যকীয় কাজে গাফিলতিতে ছাড় দেওয়া যায় না।

x