গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব : ভোক্তা-স্বার্থ রক্ষা জরুরি

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
63

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির তোড়জোড় চলছে। এই দাম বাড়ানোর দায়ভার যাতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ওপর না বর্তায় সেজন্য গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। দৈনিক আজাদীতে গত ১২ মার্চ প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, আগামী এপ্রিল থেকে নতুন এলএনজি আসার পর বছরে সাড়ে ২৪ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে তা মেটানোর প্রস্তাব করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন পেট্রোবাংলা। গণশুনানির প্রথম দিন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রুহুল আমিন এই প্রস্তাব দেন। তাঁদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তখন দৈনিক এলএনজি আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এখন যা ৪৭০ থেকে ৪৮০ মিলিয়ন ঘনফুট রয়েছে। এলএনজি আমদানির পরিমাণ দ্বিগুণ হলে মাসে ২ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঘাটতি হবে। বছরে সেই ঘাটতির পরিমাণ হবে ২৪ হাজার ৫৪০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতি ঘনফুট এলএনজি আমদানির জন্য ৩৯ দশমিক ০৮৬ টাকা ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে গড়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ৭ দশমিক ১৭ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে এলএনজি চার্জ ৯ দশমিক ৫৫ টাকা হারে নির্ধারণ করার প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলা।
শুনানির শুরুতে সোমবার বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, ২০১৮ এর অক্টোবরে গ্যাসের দাম সমন্বয়ের সময় সামিট এলএনজির ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। আগামী এপ্রিল থেকে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। ফলে গ্যাসের মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘দেশের নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের জন্য এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হবে। সঙ্গত কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।’
এদিকে, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছে। ক্যাবের উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, ‘দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে কী হবে, তা বিবেচনায় নিয়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এপ্রিলে উচ্চমূল্যের আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসবে তার ভিত্তিতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসির আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। ভোক্তার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার আগে কোনোভাবেই দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।’
প্রস্তাবিত গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আবেদনের গণশুনানিতে শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাবে দেশের শিল্পখাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায় মুনাফার হার কমছে। এর মধ্যে বার বার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাতের বিকাশ রুদ্ধ হবে। দেউলিয়া হয়ে যাবেন উদ্যোক্তারা। ড়্গুদ্র ও মাঝারি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই গ্যাসের মূল্য যৌক্তিক হওয়া উচিত। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা কমানোর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত।
টেকসই উন্নয়নের লক্ষযমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে চাইলে শিল্পে কর্ম সংস্থান ছাড়া বিকল্প নেই। এজন্য ৭০ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন। তাঁরা বলেন, গত কয়েক বছরে মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উদ্যোক্তাদের ২৯ ভাগ ব্যয় বেড়েছে। এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়ালে উদ্যোক্তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে, শিল্প উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। এতে কর্মসংস্থান বাধাগ্রসত্ম হবে। তাই গ্যাসের দাম বাড়ানো উচিত নয়। অভিযোগ আছে, বিইআরসি’র দায়িত্ব ভোক্তা স্বার্থ রক্ষা করা কিন্তু তাদের অতীত ইতিহাস তারা গণশুনানির নামে সরকারের ইচ্ছা ও সিদ্ধানেত্মর শুনানি করে। ফলে দাম বাড়ানোর গণশুনানি বন্ধ করে দাম কমানোর জন্য গণশুনানির আয়োজন করতে বিইআরসি’র প্রতি সাধারণ মানুষ আহ্‌বান জানিয়েছেন।
এ কথা অনস্বীকার্য যে গ্যাস অত্যনত্ম প্রয়োজনীয় উপাদান। যার দাম বাড়লে জনসাধারণের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সকল জিনিসের দাম বেড়ে যায় এবং জনগণের ভোগানিত্ম বাড়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়, দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে দেখিয়েছেন যে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। গত ৫ মাস আগে ১৬ অক্টোবর ২০১৮ দাম বাড়িয়েছে, আইনে আছে বছরে একবারের বেশি দাম বাড়ানো যাবে না। ফলে এখন যে গণশুনানি হচ্ছে তা বেআইনীও। তাই সরকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধানত্ম নেওয়ার আগে আরেকবার ভাববার জন্য অনুরোধ জানাই।

x