গ্যাসের অভাবে কেপিএম উৎপাদনহীন শিল্প উৎপাদনে গ্যাস সংকট ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে

সোমবার , ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
40

সংকট পিছু ছাড়ছেই না কর্ণফুলী পেপার মিলসের (কেপিএম)। কখনো দুর্নীতি আবার কখনো কাঁচামালের অভাবে উৎপাদনে ব্যাঘাত। নানামুখী এসব সংকটের মধ্যেই উৎপাদন বাড়িয়ে এক বছর ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে ছিল লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত এ কাগজ কল। কিন্তু ৩ আগস্ট হঠাৎ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় ফের উৎপাদনহীন হয়ে পড়েছে এটি। ২০ দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় একদিকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শ্রমিকরা, অন্যদিকে বিক্রয় আদেশ অনুযায়ী কাগজ সরবরাহেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কেপিএমে গ্যাস সরবরাহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ সংস্থা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। কাগজ কলটির কাছে সংস্থাটির বড় অঙ্কের পাওনা পড়ে আছে। কেপিএম কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে কেজিডিসিএলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বকেয়ার একটি অংশ পরিশোধ করলেও গ্যাস সংযোগ পুনঃস্থাপনের বিষয়ে কোন সুরাহা হয় নি। জানা গেছে, সর্বশেষ ২ আগস্ট কেপিএমের দৈনিক উৎপাদন ছিল ২৮ টন কাগজ। এ অবস্থায় ২০ দিনে প্রায় ৬ কোটি টাকার কাগজ উৎপাদন থেকে বঞ্চিত রয়েছে কেপিএম। অনিশ্চয়তার মুখে শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কেপিএমের পক্ষ থেকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ দেয়া হলেও গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা কেজিডিসিএল এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ট্রান্সমিশন মিটার স্টেশনটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পথে চলেছে। সরকারি বেসরকারি নানা দিক থেকে চলছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। উন্নয়নের প্রধান শর্ত হচ্ছে শিল্পায়ন। আর শিল্প কারখানা চালুর মূল রসদ হচ্ছে গ্যাস, তা সে শিল্প কারখানা বড়ই বা মাঝারিই হোক। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস সংযোগের অভাবে সবকিছু সম্পন্ন করেও কারখানা চালু করতে পারছেন না অনেক শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদনও মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। কর্ণফুলী পেপার মিলসে সেটাই হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় মিলটি ২১ দিন ধরে উৎপাদনহীন হয়ে রয়েছে। ফলে আদেশ অনুযায়ী কাগজ সরবরাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অথচ সরকার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির অনুমতিও দিয়েছে। এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে ওই গ্যাস। তারপরও কেন গ্যাস সংকট তা কারো বোধগম্য নয়। সরকার শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং গ্যাসেরও ব্যবস্থা করবে- এ বিশ্বাস সকলেরই রয়েছে। কিন্তু কখন তা করা হবে, সে অনিশ্চয়তা দূর করা দরকার। কারণ শিল্প কারখানা স্থাপনের পর কেবল গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে না পারা বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ। শিল্প খাতগুলোর সিংহভাগই বেসরকারি খাতের। বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু করা যাচ্ছে না, অথচ ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে, শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকটের খবর এর আগেও এসেছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আমরা চাই, উন্নয়নের প্রাধিকার শর্তের ভিত্তিতে শিল্প কারখানার গ্যাস সংকট দ্রুত নিরসন করা হোক। দেওয়া হোক নতুন কারখানায় গ্যাস সংযোগ। গ্যাস সরবরাহ এবং গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোথাও কোন বড় ধরনের গলদ আছে কিনা, সেটা খুঁজে দেখা দরকার। গ্যাসের চাহিদা ও মজুদের সম্ভাব্য পরিমাণ এবং কোন কোন ব্লকে কেমন মজুদ থাকতে পারে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশি-বিদেশি শিল্পগোষ্ঠীগুলো বড় ধরনের শিল্প স্থাপনের আগে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হতে চাইবে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। গ্যাস নিয়ে সরকারের স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন কারণ এক্ষেত্রে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান। যেখানে অগ্রাধিকার খাত শিল্প কারখানা গ্যাস পাচ্ছে না, সেখানে বাসা বাড়িতে কাঁথা কাপড় শুকানোর কাজও অনেকে গ্যাস দিয়ে করছেন। একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর জন্য অবলীলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখছেন গ্যাসের চুলা। আরো মারাত্মক বিষয় হচ্ছে, বৈধভাবে আবেদন করে যেখানে বছরের পর বছর গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে অসাধু লাইনম্যানদের ঘুষ দিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব অপকর্ম কোন অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। এগুলো বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্যাসের অভাবের কারণে অনেক কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অথচ সরকারের যেন কোন মাথা ব্যথা নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট অফিস এ ব্যাপার একেবারেই নির্বিকার। শিল্প কারখানা বাঁচাতে তাদের যেন কোন দায়িত্ব নেই। দেশে বিনিয়োগ করতে সরকার সকলকে আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু দেশে যে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই সেদিকে তার খেয়ালই নেই। কারখানা চালু রাখার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন গ্যাস। সে গ্যাস চাহিদার সামান্যও মিলছে না। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে বিনিয়োগ হবে কী করে? যেসব শিল্প কারখানা রয়েছে সেগুলোই তো চলছে না। এমনতর পরিস্থিতি দেশের জন্য ভয়ানক এবং আতঙ্কের। গ্যাসের অভাবে সফিপুর ও কোনাবাড়ি এলাকার শিল্প কারখানাগুলোতে কোন উৎপাদন হচ্ছে না। একে তো বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উদ্যোক্তাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তার ওপর গ্যাসের মারাত্মক এ সংকটে তাদের সব কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বহু উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার গ্যাস সংকট নিরসনে নানা উদ্যোগ নিলেও তাতে পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হয় নি। কাজেই এক্ষেত্রে টেকসই সমাধানের পথে এগুতে হবে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকার কেন যে ধীরে এগুচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। এতে সংকট আরো বাড়ছে। সংকট সমাধানে ব্যয়বহুল আমদানির পথে না গিয়ে জল ও স্থলভাগের সম্ভাবনাময় স্থানে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করাই উচিত। এতে ব্যয়াশ্রয়ী গ্যাসের সরবরাহও নিশ্চিত করা যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। গ্যাসের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে। উচ্চমূল্য দিয়েও যদি শিল্প কারখানাগুলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পায়, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

x