‘গৌরবের অতীত, কলুষের বর্তমান’

ছাত্র রাজনীতি

শুকলাল দাশ

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
98

দেশের সকল রাজনৈতিক-আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অতীতে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির অনেক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। তখনকার সময়ে এক ছাত্র সংগঠনের নেতাদের প্রতি অন্য ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ-সহমর্মিতাসহ সুসম্পর্ক ছিল বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাবেক ছাত্র নেতারা। সাবেক ছাত্রনেতাদের মতে-ছাত্র রাজনীতিতে তখনও প্রতিযোগিতা ছিল-প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। নিজ দলের সাথে অন্য ছাত্র সংগঠনের কিংবা ছাত্র রাজনীতির বাইরে যে কোনো ছাত্রছাত্রীদের ভিন্নমত থাকলেও সেটা নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে মোকাবেলা করতেন তখনকার ছাত্রনেতারা। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেটা একেবারেই অনুপস্থিত বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক ছাত্রনেতারা।
চট্টগ্রামের সাবেক বেশ কয়েকজন নেতার সাথে এ ব্যাপারে কথা হলে তারা জানান, সেটা সম্ভব হয়েছে তখনকার ছাত্রনেতারা আর্থিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ছিল। তার চেয়েও বড় কথা তখন ছাত্রনেতা হতেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররাই। সে কারণে তাদের মধ্যে সুন্দর একটি সৃজনশীল মন ছিল এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো সৃজনশীল মেধা এবং নিজের মেধার কৌশলে। সৃজনশীল মেধার কৌশলে অন্য ছাত্রদের নিজ দলে আকৃষ্ট করতেন। তখন কিছু পাওয়ার জন্য কেউ ছাত্র রাজনীতি করতেন না। এখন ছাত্র রাজনীতে করে রাতারাতি সব কিছু পাওয়ার জন্য। রাতারাতি কোটি টাকা-গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়ার জন্য।
মারামারি-হিংসা-বিদ্বেষের পরিবর্তে নিজেদের মেধা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে যেকোন প্রতিদ্বন্দ্বি (ভিন্ন দলের) ছাত্র সংগঠনের নেতাদের রাজনৈতিক দর্শন মোকাবেলা করা যায়। কিন্তু বর্তমান ছাত্র রাজনীতিতে সেটা একেবারেই অনুপস্থিত এবং কলুষে ভরপুর বলে মন্তব্য করেছে এক সময়ের রাজপথ কাঁপানো সাবেক ছাত্রনেতারা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) নাজিম উদ্দিন জানান, ছাত্র রাজনতি বন্ধ হোক সেটা আমি চাই না। কারণ ছাত্র রাজনীতির মধ্যদিয়েই তো আগামী দিনের জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি হবে। তবে আমি ছাত্র রাজনীতির নামে অরাজকতার বিরুদ্ধে। নিজের প্রসঙ্গ টেনে ভিপি নাজিম বলেন, আমি চাকসু ভিপি নির্বাচিত হয়েছি ১২টি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে। তখন আমি বাকশাল ছাত্রলীগ (জাতীয় ছাত্রলীগ) থেকে ভিপি হয়েছিলাম। তখন আমাদের মধ্যে (সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে) একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল-সহমর্মিতা ছিল। সেটা ছিল বলেই আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলাম।
প্রতিযোগিতা থাকবে-কিন্তু খুনা-খুনি সেটা ছাত্র রাজনীতে কাম্য নয়। এখানে আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই যে জাতীয় রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন করতে হবে। এখানে সরকারি দল ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক দল সমূহ মাঠ-ময়দানে সভা-সমাবেশ করতে পারবে না এমনটা হলে তার প্রভাব ছাত্র রাজনীতিতেও পরবে। বর্তমান ছাত্র রাজনীতির একক দখলদারিত্বের কারণে এই ধরনের খুনা-খুনির ঘটনা ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ হবে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনায় ভরপুর-এখানে নিরাপত্তাহীনতা থাকবে না। তিনি শিক্ষক রাজনীতি অনতিবিলম্বে বন্ধের মত দেন। তার মতে শিক্ষকরা পড়াবেন-গবেষণা করবেন। তারা কেন রাজনীতিতে জড়াবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাবেক সভাপতি রিপায়ন বড়ুয়া আজাদীকে জানান, সমাজ ও দেশ মাতৃকার প্রতি দায়িত্ববোধের প্রেরণায় ছাত্র রাজনীতি সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই কাজ করেছে একটি প্রগতিশীল দর্শন হিসেবে, জীবনবোধ ও সৃজনশীলতা তৈরির অনুঘটক হিসেবে। শিক্ষার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের পাশাপাশি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতি পরাজিত করতে পেরেছিল পশ্চিমা শিক্ষিতদের কূটকৌশল, সশস্ত্র পাকিস্তানিদের শোষণ আর স্বৈরাচার সামরিক শাসকের বেয়নেটের হুংকারকে।
গত তিনদশকে ছাত্র রাজনীতির চারিত্রিক ও গুণগত মান ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এই সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্র রাজনীতির সংগ্রামী ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতামুখী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। আর এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে। বিশেষ করে দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া আর টিকে থাকার জন্য সকল প্রকার নীতি আদর্শের বিসর্জন, গণতন্ত্রহীনতা, মুল্যবোধের চরম অবক্ষয়, সীমাহীন দুর্নীতি, পেশী শক্তি হিসেবে ছাত্রদের ব্যবহার সারাদেশে এক দম বন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করেছে। আর তারই প্রভাব এসে পড়েছে ছাত্র রাজনীতির উপর। তাই ছাত্র রাজনীতিকে একা দুষলে হবে না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের। আমরা কি যে কোন শাসক গোষ্ঠী ও তাদের টিকে থাকার জন্য তৈরী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রীড়াণকে পরিণত হবো নাকি সকল অন্যায়, অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো? সমতার দিন ফিরাবো নাকি বৈষম্যের পাহাড়ে নিজেদের দাস বানিয়ে রাখব?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি (১৯৮৪-৮৫ সাল) অভিজিৎ ধর বাপ্পী আজাদীকে জানান, এখন বাংলাদেশে যেভাবে ছাত্র রাজনীতি চর্চা হয় তাতে তৃণমূলে যারা রাজনীতি করে তারা ভালো কোন পদ-পদবীতে আসতে পারবেনা। কারণ তাদের টাকা নেই। এখন ছাত্র রাজনীতির পদ পদবীর জন্য টাকা লাগে।
আমরা যখন ৮০ দশকে ছাত্র রাজনীতি করি তখন আমরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য (ছাত্রলীগের সম্মেলন কিংবা কর্মী সভায়) গাড়ি ভাড়া ছিল না। আমরা তখন মোশাররফ ভাইয়ের (আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি) একটি সাদা পিকআপ ছিল সেটা নিয়ে যেতাম। সেটা কোনো সময় পাওয়া না গেলে মহিউদ্দিন ভাইয়ের (নগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী) ভাঙা একটি টয়েটা কার ছিল সেটি নিয়ে যেতাম। সেটি কিছু দূর গেলে বন্ধ হয়ে যেত আমরা ঠেলে আবার চালু করতাম। এখন ছাত্রনেতারা কোথাও যেতে হলে হেলিকপ্টারে করে যায়। আমি ছাত্র রাজনীতির এই পরিস্থিতির জন্য শুধু তাদেরকে দায়ী করি না। কারণ এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-হল প্রভোস্টরা ছাত্রনেতাদের কাছে তদবির করে। আমাদের সময়ের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন প্রফেসর ড. আবদুল করিমের সাথে আমরা দেখা করতে কয়েকদিন লাগতো। আমরা যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন এফ রহমান হল থেকে যদি ফ্যাকাল্টিতে যেতে হতো (বাস ছিলনা) ৩/৪ জনে মিলে ৫০ পয়সা করে দিয়ে রিঙা করে যেতাম। আমি কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিলে দেখলাম সব ছাত্রনেতাদের কাছে দুই-আড়াই লাখ টাকা দামের মোটর সাইকেল। অনেকের নাকি প্রাইভেট কারও আছে। এখন কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতারা আসলে তাদেরকে নাকি ফাইভস্টার হোটেলে রাখতে হয়-খাওয়াতে হয়। বিমানে আসে আর যায়। আমাদের সময়ে ১৯৮০ থেকে ৮৫ পর্যন্ত কাদের ভাইয়েরা (আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি) যখন আসতেন তখন আমরা ইউনিভার্সিটির লেডিস হলে নিয়ে চা-বিস্কুট খাওয়াতাম। ক্যান্টিনে খাওয়ার খাওয়াতাম অথবা বড়জোড় গ্র্যান্ড হোটেলে নিয়ে ভাত খাওয়াতাম।

x