গুরুদক্ষিণা : স্মৃতি-সাধনার মুগ্ধপাঠ

মনিরুল মনির

শুক্রবার , ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৭:০৩ পূর্বাহ্ণ
59

নগরী বা দেশে বাহ্যিকভাবে অভীক ওসমান কর্পোরেট কালচারের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। মুখ্যত ৭৫ পরবর্তী পটভূমির দুঃস্বপ্নের মন্তাজ কম্পাইলেশন ‘রাত ফেরার’, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে দেশ কাঁপানো ‘অবশেষে জেনারেল’ তাঁকে নাট্যজন হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো কবিতাকে তিনি বলেন পদ্য। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আই স্ট্যান্ড ফর মাই প্রোস।’ (২৮ জুন ২০১৯, দৈনিক আজাদী ২০১৯)। এক্ষেত্রে গদ্য ও গবেষণায় তার সর্বশেষ ফসল হচ্ছে ‘গুরুদক্ষিণা’।
এর আগে বইয়রে ফ্ল্যাপে বলেছিলাম, এই জনপদ তথা সারস্বত সমাজের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শীর্ষ ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পেয়েছেন অভীক ওসমান। শেখ হাসিনা ও লেখকের শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ, ড. মনিরুজ্জামান, ড.অনুপম সেন, রীতা দত্ত ও রাজীব হুমায়ুনকে শ্রেণি কক্ষে বা শ্রেণি কক্ষের বাইরে বিভিন্ন সঙ্গ-অনুষঙ্গে পেয়েছেন। এতে করে তাঁর একাডেমিক জীবন ঋদ্ধ হয়েছে। তাছাড়া ব্যক্তি ও সৃজনশীল কর্মে অনুপ্রেরণা ও অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
প্রিয় পাঠক, ‘গুরুদক্ষিণা’ পাঠ যেন স্মৃতিযানে ঘুরে বেড়ানো এই শহরের কথাই জানতে পারি। নাট্যাচার্য মমতাজউদ্‌দীন আহমদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে অভীক ওসমান, তার শিক্ষক, গার্ডিয়ান সর্বোপরি নিখিল জীবনের একজন সংগ্রামী ব্যক্তিকে উপস্থাপন করেছেন। তার স্মৃতিচারণে, চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক, নাট্যকার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তার সংগ্রাম, বাংলা সংসদের লগো ডিজাইনকারী এবং বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে তার ভূমিকাকে নিয়ে এসেছেন।
তিনি তথ্য দিচ্ছে, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতেই রাজশাহী সরকারি কলেজের মুসলিম হোস্টেলের গেটে ইট ও কাদা দিয়ে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল। অনেকেই এটিকে দেশের প্রথম শহীদ মিনার বলে দাবি করে থাকেন।
একাত্তর পরবর্তী এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার সম্পর্কে মমতাজউদদীন আহমদের বক্তব্যের উদ্ধৃত করেছেন, “আধুনিক নাটকে দুঃসাহসী না হয়ে উপায় নেই। কিন্ত্ত সুঃসাহস কীসের জন্যে? বিন্যাসে না বর্ণনায়? সংলাপে না উপস্থাপনে? কৌশলে না বক্তব্যে? ইউরিপিদিস তার কালে দুঃসাহসী বক্তব্যকে ভূমিসংলগ্ন করার জন্যে শেঙপিয়র সেকালের অভিনব। ঐক্যকে অস্থির করার জন্যে, ঘটনাকে চরিত্রের কাছে পদনির্ভর করার জন্যে ব্রেখট আর এক বিস্ময়। এপিক পোয়েম ফর্মকে এপিক থিয়েটারে সমুপস্থিত করার জন্যে। আয়োনেস্কো, বেকেট আরেকটি মোড়-সব ফর্মকে বিনাশ করে চেতন-অবচেতনকে একাকার করে সব নিরর্থক হাস্যকর করার জন্যে। আমাদের আধুনিক নাট্যকাররা কী অর্থে দুঃসাহসী হতে চান? অবশেষে রাজার মত্ত হস্তী এসে নলবন দলন করে যা কিছু ইউরিপিদিসীয়, শেঙপিরীয়, স্টানিস্লাভঙীয়, রাবীন্দ্রিক-সব তচনচ করে কোনো নতুন বীজ বপন করতে চাইছেন? একথা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য যে, শর্তবর্ষব্যাপী বাংলা নাটকের সামাজিক বিষয়বস্তুর মধ্যে প্রয়োজনানুরূপ চরিত্র-আদর্শ ও সংলাপের কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে।”
সবশেষে আন্তন চেখভের সোয়ান সঙ অবলম্বনে যামিনীর শেষ সংলাপে নাটকের উদ্ধৃতি দিয়ে অর্গানিক নাট্যকর্মিদের জীবনের ট্র্যাজেডিকে উপস্থাপন করেছেন।
‘আনিসুজ্জামান : আমার শিক্ষক, জাতির শিক্ষক’ গদ্যে স্মৃতিচারণে বলছেন, ’৭১ পরবর্তী প্রতিটি স্বৈরশাসন বিরোধী ও গণতন্ত্রকামী আন্দোলনে স্রষ্টা, দ্রষ্টা ও স্বাপ্নিক। তাকে আলোর সাথে তুলনা করে বাঙালির বাতিঘর, বৃক্ষের সাথে তুল্য করে বটের মহিমা, কালের খেয়ার যাত্রী অভিধা অঙ্গুরীয়গুলো পরিয়ে দেয়া হয়। জীবিতকালে তিনি হয়ে ওঠেছেন মহাকাব্যিক উপান্যাসের নায়ক।
এখানে অভীক ওসমান বাংলা সম্মিলনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুটো সম্মেলনে স্মৃতিচারণ করেছেন, বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বিভাগের শিক্ষকদের ভালোবাসার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বললেন, ‘কোথাও দেখা মাত্রই শিক্ষার্থীরা যখন হাসিমুখে কাছে ছুটে আসে, তখন মনে হয় আমার দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবন বৃথা যায়নি। আজ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে দেখি মানুষের ভালোবাসাই আমার সঙ্গী। এটা ছাড়া আমি নিঃস্ব।’ (সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১ মার্চ ২০০৮)
আনিস স্যার আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন হিসেবে ভূমিকা পালনের কথা বলেছেন। উপসংহারে বলেছেন, তাঁর সম্পর্কে শেষ কথাটি বলা এই অকৃতি অধমের পক্ষে সম্ভব নয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আনিসুজ্জামান সম্মাননা গ্রন্থে স্যারকে পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ‘এই দীর্ঘ জীবনে তিনি তাঁর জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, সৃজনশীলতা, উদার মানবিকতা এবং সত্য ও সুন্দরের নিরন্তর সাধনায় নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে এখন তিনিই তাঁর তুলনা। এ জন্য তাঁর নামের আগে-পরে কোনো বিশেষণের প্রয়োজন পড়ে না। কোনো আসরে অথবা সভা-সম্মিলনে প্রথা মেনে তাঁকে পরিচিত করানোর জন্য তাঁর নামটি উচ্চারণ করাই যথেষ্ট। আমাদের দেশে তাঁর মতো বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে সম্মান করা হয়। কিন্তু অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে শুধু এই কারণে কেউ যদি সম্মান জানায়, তাহলে তাঁর স্বভাবজাত তারুণ্যের জন্য তাঁকে অভিবাদনও জানাতে হবে। এই তারুণ্য তাঁর জীবনকে অনুভব এবং উপভোগ করার, এক আশাবাদী এবং সম্মুখ-নিবদ্ধ দৃষ্টিতে উজ্জীবিত হবার এবং বাঙালির সংস্কৃতি ও লোকায়ত দর্শন থেকে শক্তি সংগ্রহের। তাঁর সঙ্গে যাঁরাই পরিচিত হয়েছেন, তাঁরাই প্রশংসা করবেন তাঁর প্রাণশক্তির প্রাচুর্যের, তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধের, তাঁর সৌজন্যের।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান একজন সক্রিয় চিন্তার মানুষ, মার্কিন চিন্তাবিদ-লেখক-প্রকৃতিপ্রেমী র‌্যালফ ওয়াল্ডো এমার্সনের ভাষায় গধহ ঃযরহশরহম।
‘বহুমাত্রিক মনিরুজ্জামান : আমার ত্রাতা শিক্ষক’ নিবন্ধে একটা কবিতা দিয়ে শুরু করেছেন। এখানে ছাত্রদের ফাদারলি নার্সিং করার জন্য বলেছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর মনিরুজ্জামান উপস্থাপন করেন। অভীক ওসমান লেখা সূত্রে মনিরুজ্জামানের ভাষ্য জানতে পারি, ‘ ‘বাংলা সাহিত্যকে পূর্ণাঙ্গ করেছে চট্টগ্রাম তার আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। এখানকার পুথি, অনুবাদ ও রোমান্টিক সাহিত্যের অভিনব সাধনার স্বীকৃতির পরেই সাহিত্যের ইতিহাস লেখনে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দেখা দেয়। সেই সাথে ‘বাঙলা’ যে বাঙালি মুসলমানেরই ভাষা এবং বাংলাসাহিত্যে তাদের অবদান সে গভীর, তাও প্রতিভাত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়।’ এ ক্ষেত্রে গবেষণায় স্যার একটি উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তার মতে, ‘রাজধানীর বৃত্তের বাইরে সাহিত্যে সৃষ্টির উপদান রাশি হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার আগেই সংগৃহীত হওয়া আবশ্যক। উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের মূল্যায়ন। তাই স্থানিক সীমাঙ্কে সেই উপাদানের আংশিক রূপ হলেও যথাসম্ভব সংগ্রহের প্রয়োজনই আমাদের এই প্রয়াস।’ (২০১৬)
সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনের কবিতার দিকটি তিনি উন্মোচন করেছেন। কবি অনুপম সেনের দুটো দিক আলোচনা করেছেন। প্রেমিক ও মার্ঙিস্ট। লেখক জানান, ‘ নিউ মার্ঙিস্ট এই কবিতার আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। ভারতীয় মিথ ব্যবহার করে নির্মাণ করেছেন কার্ল মার্ঙের নিখিল আদর্শ ও সংগ্রামকে। এই পর্যায়ে অন্যান্য কবিতাগুলো হচ্ছে-স্বাধীনতা, জনহীন রাত্রির জনপদ, আমি এক ক্রীতদাস (দীর্ঘ কবিতা), মানুষ, বন্যা, মানুষ-কবিতা, বাংলার চিরন্তনী মা ইত্যাদি। স্বাধীনতা কবিতা থেকে দু’টো পঙ্‌ক্তি তুলে ধরছি-‘স্বৈরশাসক, বলে যেতে চাই তোমাকে/ প্রাণ দেব, তবু দেব নাকো স্বাধীনতা।’ স্মরণ করা যেতে পারে স্বৈরশাসক এরশাদের আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি। এই পর্যায়ে কবিতায় সাম্যের কথা যেমন বলা হয়েছে তেমনি বারবার মানুষের জয়গান গীত হয়েছে। এটি মধ্যযুগের চণ্ডীদাসের ‘শুনহ মানুষ ভাই/ সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। অথবা নজরুল এর ‘গাহি সাম্যের গান/মানুুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান’। শুরুতে জীবনানন্দ দাশ কাঙ্ক্ষিত শুভ্র মানসিকতার কথা আমরা যা বলেছিলাম সেটি অনুপম সেনের পরম আরাধ্য। ‘মানুষ’ ও ‘মানুষ-কবিতা’ নামে দুটো কবিতা রয়েছে। পরন্তু ‘আমি এক ক্রীতাদাস’ নামে দীর্ঘ কবিতায় পুঁজিবাদের দেশে দেশে দাসপ্রথার বর্ণনা দিয়েছেন। এটি যেন গ্লেডিয়েটর স্পার্টাসকাসদের জীবন কাহিনী।
আমি আমি পাইনি মানুূষ-নাম
আজো আমি হইনি মানুষ
আজো আমি কেবলি
পুঁজির পণ্যমূল্যে-কেনা
সামান্য শ্রমিক। (পৃষ্ঠা-৩৭)
তার কলেজ জীবনের তরুণ শিক্ষক রীতা দত্তকে নিয়ে লিখেন, ‘তার সম্পর্কে কিছু লিখতে চাইলে তিনি চরমভাবে নিরুৎসাহিত করেন। বলেন, গর্ভনমেন্ট কলেজে কতজন চাকরি করে গেছেন। লিখলে হাসির খোরাক হয়ে যাবে। অথচ তিনি নিজেও জানেন না এই নগরে এই দেশে এই মমতাময়ী মানবী লাখো শিক্ষার্থীর ‘মেন্টর’ হয়ে রয়েছেন হৃদয়ে। যার ফলে ৪৫ বছর পরেও তাকে স্মরণ-অনুসরণ দুটোই করা হয়।
অতিকথনে বলি, সামজিকতায়-মানবিকতায় সেবায় সাংস্কৃতিক বিকাশে তিনি একমেবাদ্বিতয়ম। সেকেন্ড গড খ্যাত চিকিৎসক ডা. দেবী শেঠীকে জিজ্ঞেস করা হলে- তার অনুপ্রেরণা কি। উত্তরে বলেছেন, মাদার তেরেসা।
মাদার তেরেসা, সিস্টার নিবেদিতা, বেগম রোকেয়া, তারা কি রীতা দত্তের আদর্শ। কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়েদেদ্দার-তার অন্তরে সংগ্রামের বীজ-বুনে দিয়েছেন। তিনি সংসারী না সন্ন্যাসী, তিনি কি শুভ্রবসনা নান্‌। এই উত্তরগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনিও দেবেন না। এক আকস্মিক মধ্যাহ্নে আমি তাকে দেখেছি শতবর্ষের সন্ত-বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর বাসায়। তাকে নার্সিং করছেন। নিকট অতীতে আরেক মধ্যাহ্নে তাকে দেখলাম শহীদ মিনারে একাত্তরে জননী রমা চৌধুরীর শবদেহের শ্রদ্ধাঞ্জলির ব্যবস্থাপনায়।’
রূপবান রাজীব হুমায়ুন ছিলেন তার ভার্সিটি জীবনের বন্ধু ও শিক্ষক। তাকে নিয়ে অভীক ওসমান লিখেন, মাস্টার্সের পড়ার সময় আমি থাকতাম হাটহাজারী হেলথ কমপ্লেঙের লাল কোয়ার্টারে। তার একদিকে চলে গেছে নাজিরহাট খাগড়াছড়িমুখী সড়কপথ, আর অন্যদিকে নাজিরহাটের রেলপথ। মাঝখানে কমপ্লেক্স। যৌবনে সে এক চমৎকার জীবন ছিল। রাতে দালানের ছাদ থেকে অবারিত জোৎস্না। কুমিল্লা থেকে আগত পলিটিক্যাল সায়েন্সে বন্ধুকবি বাবুল ইসলাম গীতিকার গাইছে, “মরমীয়া তুমি চলে গেলে/ দরদী আমি কোথা পাব।” বাসার কাছে হাটহাজারী রেল স্টেশন থেকে শাটল ট্রেন শহরমুখী ব্যাক করতো। সেটিতেই আমি ভার্সিটিতে যেতাম। এই প্রেক্ষাপটে রফিক সিদ্দিকী সম্পাদিত চাকসু বার্ষিকীতে ‘জোৎস্নার জীবনকাল’ নামে একটা ছোট গল্প লিখেছিলাম। একদিন ক্যাফেটেরিয়ার বারান্দায় চা খেতে খেতে রাজীব হুমায়ুন বলেছিলেন, ‘ওসমান, তুমি যতো সুন্দর করে কথা বলো, অতো সুন্দর করে লিখতে পারে না।’ এখনও বুঝি, স্যার ভালো ক্রিটিক ছিলেন।
আজিকে সকাল হাসিছে বন্ধুর মতো : প্রতিদিন সকালে যখন ক্যাম্পাসে পৌঁছতাম। তখন অন্যান্য আকর্ষণের সাথে রাজীব হুমায়ুনের জন্যই মনো হতো ‘আজিকে সকাল হাসিছে বন্ধুর মতো।’ ক্লাস থেকে আমরা করিডর ধরে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ক্যাফেটেরিয়ায় চলে যেতাম, তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছেন, কাঁধে থলে, কখন তার স্নেহের হাত বন্ধুর মতো আমার কাঁধে উঠে এসেছে। একবিংশের শুরুর দিকে এসে তিনি ‘রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র’ স্থাপন করেন। এই কেন্দ্র থেকে বুলেটিন বের হতো। এর কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি আমাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি যেন অনেক কিছু আমাদেরকে বলতে চাইতেন। যেমন অতি সম্প্রতি অরুন্ধতি রায়ের আলোচিত উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস এর মতো, ‘হাউ টু টেল এ সেটারড স্টোরি? বাই স্লোলি বিকামিং এভরিবডি, নো। বাই স্লোলি বিকামিং এভরিথিং।’
সবশেষে তার পিতা সম্পর্কে বলেন, ‘জীবনের শেষদিকে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমাকে বললেন, আমার মৃত্যুর আগে কোরান খতম তো করতে পারবি না, অন্তত ইয়াসিন সুরাটা পড়ে ফেল। আমার কবরে পড়তে পারবি। সেই থেকে ইয়াসিন সুরা প্রায়ই মুখস্ত। আমি ইয়াসিন সুরা এখনও পড়ি। কবরে, মাজারে, বিপদে আপদে, দেশে-বিদেশে। ইয়াসিন-ওয়াল কুরআনুল হাকিম। আমার চোখ দিয়ে দরদর করে দরিয়ার পানি নামে। জীবন নামক নদীর করুণডাঙ্গায় এতিম আমি এখনও দাঁড়িয়ে থাকি একা, একজন নিঃসঙ্গ।’
তিনি বইয়ের ভূমিকায় বলেছেন, ‘আমার পিতা আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ গুরু। যদিওবা আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন তিনি ইন্তেকাল করেন। তার নীতি নৈতিকতা, দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব, রক্তীয়-আত্মীয়দের জন্য মমত্ববোধ অবৈষয়িক চরিত্র আমার নিখিল জীবনকে প্রভাবিত করেছে। পরবর্তীতে একাডেমিক, প্রফেশনাল, পলিটিক্যাল, সাংস্কৃতিক, সামাজিক পরিসরে অনেকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। এমনভাবে কেউ আমাকে প্রভাবিত করতে পারেনি।’
মূলত অর্ধশতকের স্মৃতিকে তার মস্তিষ্কে ধারণ করতে পেরেছেন। এটা তার মেধার পরিচয়। অনেকটা আত্মজৈবনিক গ্রন্থটি সহজে পাঠ যোগ্য। দুই শতাব্দীর শিক্ষা রাজনীতি সমাজ চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এই গ্রন্থের অন্যতম উপকরণ। এটা একটা হেন্ডি, কিউট প্রোডাকশন, কিছুটা মুদ্রণ প্রমাদ সহপাঠ যোগ্য। খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন চিত্রকর খালিদ আহসান।

x