গুণী শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু

এস. এম. ওমর ফারুক

বুধবার , ৩১ অক্টোবর, ২০১৮ at ৪:৫০ পূর্বাহ্ণ
184

১৮ অক্টোবর ২০১৮খ্রি. বৃহস্পতিবার সারা পৃথিবীর বাঙালিদের জন্য শোকাহত হওয়া একটা দিন। এ দিন সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যেই বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাভাষী মানুষ জেনে যায় বহুমাত্রিক চিরতরুণ শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। প্রায় সকল বয়সি মানুষই এ সংবাদে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। ব্যক্তিগতভাবে আমারও দিনের সব কর্মসূচি কেমন এলোমেলো হয়ে পড়ল। পরিচিত-অপরিচিত সবার মুখে মুখে আইয়ুব বাচ্চুর জন্য শোক আর ভালবাসার প্রকাশ, পরস্পর পরস্পরকে সান্ত্বনা দেওয়ার প্রয়াস। মাননীয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার. মন্ত্রীরাসহ সকল মহল থেকে শোক প্রকাশ করা হল।

১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের জুবলীরোড় এনায়েত বাজারের হাজী নুরুজ্জামান সওদাগরের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করা এই প্রতিভাবান শিল্পী এত দ্রুত ভক্তদের এবং দেশবাসীকে বিদায় জানাবেন তা কেউ ভাবেনি। যদিওবা তিনি বহুবার গানে গানে বিদায় নেওয়ার হুমকি দিয়ে সবাইকে কাঁদিয়েছেন। দর্শক প্রিয়তা পাওয়া এ রকম একটি গানে তিনি গেয়েছেন, ‘‘সবাইকে একা করে চলে যাব অন্ধ ঘরে/এই শহর গাড়ি বাড়ি কিছুই যাবে না/আর কত এভাবে আমাকে কাঁদাবে/আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে/এই বুকে যন্ত্রণা বেশি সইতে পারি না/ আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে”। অভিমানী, চিরদুঃখী এই শিল্পী এই বার ঠিক ঠিক উড়াল দিয়েছেন; বাসিন্দা হয়েছেন অন্ধকার ঘরে। ৫৬ বছরের এ সংক্ষিপ্ত জীবনে এই ক্ষণজন্মা শিল্পী রেখে গেছেন অনন্য অবদান। তিনি ছিলেন একাধারে জনপ্রিয় গায়ক, গিটার এর জাদুকর, অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী।
প্রতিটি মানুষের জীবনে তার সমসাময়িক ঘটনা ক্রম বা পরিবেশ-প্রতিবেশ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী তথা সৃজনশীল মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি অর্থাৎ জীবন শুরুর লগ্নে পটভূমির প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামের বাসিন্দা হিসেবে এই গুণী শিল্পী সম্পর্কে বহুদিন বহুকিছু জেনে আসছি। যতদূর জেনেছি আইয়ুব বাচ্চুর দাদার বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনায়। তাঁর ধনাঢ্য ও দানবীর খ্যাত দাদা আলহাজ্ব নুরুজ্জামান সওদাগরের ইচ্ছাতেই আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে তাঁর দেওয়া জায়গায় খরনা রেলস্টেশন নির্মাণ করে, সংলগ্ন বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা ইত্যাদি তাঁর বদান্যতায় গড়ে উঠে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার রহস্য কে জানে? ছোট বেলায় শুধুমাত্র আনন্দের জন্য জন্মদিনে বাবার দেয়া উপহার ‘গিটার’ এই যে বাচ্চুর দুঃখ প্রকাশের হাতিয়ার হয়ে উঠবে? জাতীয় কবি নজরুল লিখেছিলেন, ‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান. . .তদ্রুপ কোন অজ্ঞাত দুঃখবোধ হয়ত বাচ্চুকে মহান করেছে। আইয়ুব বাচ্চু বাংলা গানে নতুন ধারার জন্ম দিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ ও প্রথম রকস্টারের জায়গা যেমন করে নিয়েছেন তেমনি তাঁর কালজয়ী গানগুলো বহু প্রজন্মের মানুষের কাছে তাঁকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবে নিঃসন্দেহে। ফলে ভবিষ্যতে যারা বাচ্চুকে অনুসরণ করে এগুতে চাইবে, তাদের কেউ কেউ বাচ্চুর দুঃখ বোধের কারণ অনুসন্ধানে প্রয়াসী হবে। ইতিহাস এমনটিই বলে।
অজ্ঞাত দুঃখবোধকে ধারণ করে প্রতিভা আর কঠোর পরিশ্রমে তিনি হয়ে উঠলেন উপমহাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী তারকা। ১৯৯১ খ্রি. ঢাকায় বসে তিনি গঠন করেন এলআরবি। এলআরবি দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ করে। সুখ, তবুও, ঘুমন্ত শহরে, ফেরারি মন, বিস্ময়, মন চাইলে মন পাবে, অচেনা জীবন, মন আছে নাকি নাই, স্পর্শ, যুদ্ধ ইত্যাদি এলআরবি’র জনপ্রিয় অ্যালবাম। একক গানেও আইয়ুব বাচ্চু অসাধারণ সাফল্য পেয়েছেন। ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পাওয়া তাঁর একক অ্যালবাম এর মধ্যে আছে ময়না, কষ্ট, সময়, একা, প্রেম তুমি কি, দুটি মন,কাফেলা, রিমঝিম বৃষ্টি, বলিনি কখনো, জীবনের গল্প ইত্যাদি।
দেশের খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী লিখেছেন,“বাচ্চুকে ব্যান্ড সংগীতের একজন পথিকৃৎ বা গিটারের জাদুকর, যে বিশেষণেই অভিহিত করা হোক না কেন, সবকিছু ছাপিয়ে সে একজন অসাধারণ সুরকারও ছিল। তার সুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও প্রশংসনীয় দিকটি হচ্ছে বাংলা মূল ধারার গানের সঙ্গে পাশ্চাত্যেও সমসাময়িক ধারাটির সৃজনশীল সমন্বয়”। তিনি আরো লিখেন,‘আমি তার সুরের অনুরাগী ছিলাম. . .আইয়ুব বাচ্চু এক জাত শিল্পী, এক পরিপূর্ণ শিল্পী। শয়নে-স্বপনে যার ধ্যান জ্ঞান ছিল শুধুই সংগীত। তার এ অকস্মাৎ, অকাল প্রয়াণে আমাদের সংগীত অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা পূরণ হওয়ার নয়”।
সারাদেশে ছাড়িয়ে বিদেশে যেখানে বাঙালি আছে সেখানেই কনসার্ট এর ডাক পেয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। প্রতিবেশী ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গেও তিনি সমান জনপ্রিয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনতে রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। বাচ্চু তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ধন্য হয়েছিলেন। সংগীত শিল্পী তপন চৌধুরী লিখেছেন,‘চার বছর আগে আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম, সেখানকার তরুণ শিল্পীরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে কিনা? . . . এই জন্য আমি গর্বিত’ ।
আইয়ুব বাচ্চুর যে সমস্ত গান শহর-গ্রাম, ধনী গরীব, বয়স-পেশা নির্বিশেষে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম ক’টি হল- আমি কষ্ট পেতে ভালবাসি/তাই তোমার কাছে ছুটে আসি’; ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’; বোঝে না কেউ তো চিনল না/বোঝে না আমার কী ব্যথা/ চেনার মত কেউ চিনল না এই আমাকে; সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে; কত রাত আমি কেঁদেছি, বুকের গভীরে কষ্ট নিয়ে; তুমি কেন বোঝো না, তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়; এক জীবনে আর কতবার আমি কেঁদে যাব/ এক জীবনে আর কতবার আমি ব্যথা পাব/ তখনো বুঝি কেঁদে কেঁদে যাব/ ইত্যাদি। সত্যিই তিনি দুঃখ, ব্যথা আর বেদনার কথা শুনাতে শুনাতে সবাইকে কাঁদাতে কাঁদাতে বিদায় নিলেন।
মায়ের জন্য অন্ত:প্রাণ এই শিল্পী তৈরি করে গেছেন আরো অনেক প্রতিভাবান শিল্পী। অনুগামীদের কেউ কেউ স্যার কিংবা বস হিসেবে সম্বোধন করতেন। সতীর্থদের কাছ থেকে জানা যায় বাচ্চু ব্যাপক মানবীয় গুণে গুণান্বিত ছিলেন। প্রাণ খুলে দান করতেন। গীতিকবি কবির বকুল স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘‘শিল্পী লাকী আখান্দ এর চিকিৎসার জন্য আইয়ুব বাচ্চু দিলেন মোটা অংকের টাকা। বললেন এই সহায়তার কথা যেন কাউকে না বলি। এমনই ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু”।
মাদক বিরোধী কনসার্ট, দুস্থের সাহায্যের জন্য কনসার্টসহ বহু সামাজিক উদ্যোগের সাথে যুক্ত এ গুণী শিল্পী সংগীতের বহু শাখায় যে ভূমিকা রেখে জনগণের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন তা বিবেচনা করে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাব আইয়ুব বাচ্চুকে যেন কোন একটি বিষয়ে মরণোত্তর জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়। জনতার হৃদয়ে আসন পাওয়া এ শিল্পীর স্মৃতি রক্ষার্থে কোন সাংস্কৃতিক স্থাপনার নামকরণ যেন তাঁর নামে করা হয়। শিল্পীর শেষ যাত্রার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চসিক এর মেয়র আ.জ.ম. নাছির উদ্দীন নিজ হাতে পরিচালনা করায় চট্টলবাসী এবং আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। প্রিয় শিল্পী, প্রিয় বাচ্চু ভাই সৃষ্টিকর্তা আপনার দুঃখ দূর করুন, আপনাকে ভাল রাখুন।
লেখক: অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক।

x