গুণী লোকসংগীত শিল্পী ওস্তাদ আবদুর রহিম

সৈয়দা আঁখি হক

বৃহস্পতিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
37

শিশুকাল থেকে তাঁর কণ্ঠে আবদুল আলিমের গান শুনে শুনে বড়ো হয়েছি। একই কণ্ঠে শুনেছি লালন, রাধারমণ, আরকুম শাহ, হাছন রাজা, রকীব শাহ, দুর্বিন শাহ, শাহ্‌ আবদুল করিমসহ অসংখ্য মহাজনী গান। সর্বোপরি বাংলার লোকগানের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন ওতপ্রোতভাবে। তিনি আমাদের সকলের প্রিয় আবদুর রহিম স্যার। বেতারে চাকরি করেছেন চল্লিশটি বছর। চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে পনেরো বছর যাবত নজরুলগীতি ও লোকগানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। নিজের হাতে তৈরি করেছেন অসংখ্য শিল্পী। যারা জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন গান গেয়ে।
প্রচণ্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাঁর কাছে গানের তালিম নিতে পারিনি। ছোটোবেলায় তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘তোমাকে দিয়ে লোকগান হবে। কখন শিখতে চাও চলে এসো।’ নানা কারণে শেখা হয়নি তাঁর কাছে। কিন্তু তিনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন শুনে বসে থাকতে পারিনি। বিবেকের তাড়না থেকেই বার বার ছুটে গিয়েছি দেখতে। ১২ নং ওয়ার্ডে, ১০০ বেড এ ভর্তি আছেন তিনি। জেনেছি তাঁর জীবনের পাওয়া-না পাওয়া, সুখ-দুঃখের কথাগুলো।
চাঁদপুর জেলার হাইমচর থানার উত্তর আলগী গ্রামে ৫ জানুয়ারি ১৯৫৩ সালে আবদুর রহিম জন্মগ্রহণ করেন। পিতা : মৃত আবদুল মান্নান আখন্দ। মাতা: জাহেদা বেগম। পিতা গান গাইতেন, তাই পরিবার থেকেই সংগীতে প্রেরণা পেয়েছেন। সারাবাংলার লোকগান যেমন কণ্ঠে ধারণ করেছেন, তেমনি ভালোবেসে আঁকড়ে ধরেছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে। রমেশ শীল, আবদুল গফুর হালী, এম এন আখতার, সৈয়দ মহিউদ্দিন, সনজিত আচার্য, মো, নাসির প্রমুখের গান গেয়েছেন বেতার, টেলিভিশনসহ অসংখ্য অ্যালবামে। তবে আবদুল আলিমের গানের মাঝেই প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। লালন, নজরুলগীতির পাশাপাশি গেয়েছেন মাইজভান্ডারী গান।
চট্টগ্রামের আসকর আলী পণ্ডিত, রমেশ শীল, আবদুল গফুর হালী, শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব, শেফালি ঘোষ প্রমুখের শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়। তবে অনুধাবন করতে পারলাম যে, চট্টগ্রামে লোকসংগীতচর্চা যেন আঁধারে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। নিভু নিভু অবস্থায় যেটুকু আছে তাও ধরে রেখেছেন আবদুর রহিম। বর্তমানে চট্টগ্রামে লোকগানের একমাত্র ধারক/বাহক, সুরকার বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না।
আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে লোকগানকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। লোকগানকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি উদ্যোগে প্রথিতযশা শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। নিজের বিবেকের কাছে বার বার প্রশ্ন করি। তাঁদের গান শুনে কয়েকটা হাততালি ছাড়া আমরা কী আদৌ কিছু দিতে পারছি? কখনো জানতে চেয়েছি ব্যক্তিজীবনে তাঁরা কেমন আছেন? নিজের দুঃখ-কষ্ট ভুলে মঞ্চে উঠে যাঁরা হাসিমুখে গান গেয়ে আমাদের মনে আনন্দ দেন, কখনো কি ভেবেছি! আমাদের মতো তাঁদেরও রোগের ঔষধ, বাঁচার জন্য খাদ্য প্রয়োজন? গান গেয়ে কতটুকুই-বা উপার্জন করছেন, কী রেখে যাচ্ছেন সন্তানদের জন্য? নিজেইবা কী পেলেন? আমরা তো কেবল ক্ষমতা আর বিত্তের পেছনে ছুটছি। সেই সময় কই আমাদের?
আজীবন তাঁরা দিয়েছেন আমাদেরকে। কিন্তু পাওয়ার খাতাটি একেবারেই শূন্য। অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটাতে হয় অবহেলায়-অনাদরে। অর্থ জোগান দিতে না পেরে একসময় বিনা চিকিৎসায় মারা যান। যেন অভিভাবকশূন্য হয়েছে সংগীত জগৎ। সারা বাংলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সংগীত শিক্ষক এবং শিল্পীরা সঠিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত। যদি এভাবে চলতে থাকে তবে সংগীতজগতটি হারিয়ে যাবে আমাদের সংস্কৃতি থেকে।
সরকারি উদ্যোগে টেলিভিশন ও বেতারে তালিকাভুক্ত এ গ্রেডের শিল্পীদের যদি মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয় তবে হয়তো জীবনের শেষক’টি দিন তাঁরা একটু ভালো থাকবেন। কেবল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার উপর নির্ভর করলেও হবে না। সমাজের বিত্তবানদের কাছেও অনুরোধ করছি, প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ এলাকার এমন গুণীজনদের পাশে দাঁড়ান তবেই সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ হবে। প্রতিটি উপজেলা, জেলা এবং বিভাগ পর্যায়ে গুণীজনদের মূল্যায়ন হলে তবেই নতুন নতুন প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
আমরা নিজেদের দায়ও এড়াতে পারি না। এমন গুণীজনেরা অসুস্থ হলে প্রত্যেকে যদি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে এক টাকা করেও সঞ্চয় করি, তবে উন্নত চিকিৎসায় হয়তো তাঁরা আরো কিছুদিন আমাদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারবেন। যাঁরা আমাদের আঁধার জগতকে আলোয় ভরিয়ে দেন, তাঁদেরই জীবনদ্বীপ নিভে যায় অভাব-অনটনে। তাই বর্তমান প্রজন্ম সংগীতচর্চা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আসুন, সবাই মিলে আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখি। অবশেষে তাঁর সকল ছাত্র/ছাত্রী ও দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করছি।

x