গুজব ও একটি রক্তাক্ত মুখ

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
29

বাড্ডার ঘটনাটা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়া বিস্মিত চোখ, মুখ। রক্তে ভেজা এলেমেলো চুল! মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগেও সে বুঝে উঠতে পারছিল না এরা কি মানুষ? কেন তাকে সাপ মারার মত করে মারছে কি অপরাধ তার! এদেশে এখন অপরাধ করার প্রয়োজন হয় না। মানুষ মারার জন্য প্রয়োজন হয় কিছু গুজবের। কিছু দুর্বৃত্ত খুব সচেতনভাবে তা করে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে গুজব দিয়ে প্ররোচিত করা খুবই সহজ। মানুষ সত্যমিথ্যা যাচাই করে না। প্রামাণ্য দলিলের তোয়াক্কা করে না। মানুষ খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষকে আমরা শৈশব কৈশোর এমন কি তারুণ্যেও যেমন দেখেছি তেমনটা নেই, জীবনযাত্রা, রুচিবোধ আনুষাঙ্গিক সবকিছুতেই মোটা দাগে পরিবর্তন এসেছে। শুধু আমাদের দেশ বলে কথা নয়। সারাবিশ্ব জুড়েই এই পরিবর্তন এসেছে। অর্থনীতি রাজনীতি এমন কি সমাজ ও পরিবারেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা এবং আবেগের বিষয়টা একেবারে কমে এসেছে। মানুষ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কারো জন্য কেউ নেই। সভ্যতার শৃঙ্খল, সামাজিক শৃঙ্খল এমন কি পারিবারিক শৃঙ্খল কোনটাই আর আটকাতে পারছে না মানুষকে। মানুষের এই আচরণ, মানুষের এই পরিবর্তন খুব বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।
মানুষ অপরাধ মেনে নিচ্ছে অপরাধীরাও বেপরোয়া হচ্ছে। মানুষ অন্যায়ের প্রতিরোধে এগিয়ে আসে না বরং নিরাপদে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে আগ্রহী। এটা এখন বাস্তবতা। ফেসবুক নামক একটি সামাজিক মাধ্যম আছে সেটা তো মানুষ আত্মপ্রচার ছাড়াও অনেক অপকর্মে ব্যবহার করছে। এই মাধ্যমটি গুজব ছড়ানোর উৎকৃষ্ট জায়গা এই ফেসবুকে ভাল বা পজেটিভ কোন পোস্ট ভাইরাল হয় না!
ভাইরাল হয় নেগেটিভ বিষয়গুলো। গুজব শুনতে ও গুজব মানতে তৎপর এদেশের মানুষ। পদ্মা সেতুতে শিশুর মাথা লাগবে এমন ভয়ঙ্কর গুজবে প্রাণ দিতে হলো একজন উচ্চ শিক্ষিত দুই সন্তানের জননী রেনুকে। রেনুর জীবন খুব সুখের ছিল না। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ। বড় ছেলেকে কাছে না পাওয়া। আর্থিক সমস্যায় সে জর্জরিত ছিল। তার চাকরি এবং মেয়ে তুবার পড়াশোনা সব মিলিয়ে সে মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিল। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে শিকারে পরিণত করে! আবহমান কাল ধরে চলে আসা জনশ্রুতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত গল্পের ওপর বিশ্বাস করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে প্রবল। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে চলে আসার কারণে মানুষের মনের মধ্যে নানা ধরনের গুজবের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। খুব সহজে তার প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে।
গভীর বিশ্বাসবোধ, ব্রেইন ওয়াশ হলে মানুষ যাচাই বাছাই না করে গুজবগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করে এই অযাচাইকৃত গুজবগুলো ইতিহাস জুড়ে সহিংসতা। মৃত্যু ও ধ্বংসের জন্য দায়ী। কত রকম গুজবে এদেশের কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে নৃশংস মানুষের হাতে। রাজনীতিতে গুজব ছড়ানো একটি কৌশল হিসেবে চালু আছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য গুজব এবং মিথ্যাচারের ব্যবহার আমরা এই স্বাধীন বাংলাদেশে কম দেখিনি। যুদ্ধাপরাধী সায়েদির বিচার নিয়ে যে কুরুক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছিল তাও ছিল একটি রাজনৈতিক অপকৌশল ও গুজব। অনেকেই তখন মৌলানা সাহেবকে চাঁদে দেখেছিলেন। এ নিয়ে মা ছেলের একটি গল্প শোনা যায়। ‘প্রবাসী ছেলেকে মা ফোন করে বলেন, বাবা হুজুরকে চাঁদে দেখতে পাচ্ছিস? ছেলে বলে, কি বল মা? এটা কি সম্ভব?’
মা জিজ্ঞেস করে-তুই কোথায় এখন?
ছেলে: মা আমি সাগর পাড়ে। নীল আকাশ কি চমৎকার জ্যোৎস্না। কি সুন্দর পূর্ণিমার চাঁদ!
মা কেঁদে বলে- হায় খোদা। বিদেশে গিয়ে তোর ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে। ইহুদি নাছারার দেশে গিয়ে তুই আর ঈমানে নাই। হুজুরকে সবাই দেখতাছে তুই দেখতেছিস না! আমি তোর মুখ দেখতে চাই না!
ছেলে দিশেহারা হয়ে বলে, হ্যাঁ মা। এখন দেখছি আগে দেখিনি!
গুজব হচ্ছে এমনই! সরকারের প্রথম থেকেই গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত ছিল। অবাধ তথ্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে, সরকার জনবিচ্ছিন্নতায় ভুগলে গুজবের ডালপালা মেলতে বেশি সময় লাগে না। সমাজ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে সরকারের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে। চার বছরের তুবা এখনও মায়ের অপেক্ষায় তুবা জানে না তার মা আর কখনও ফিরে আসবে না।
অবুঝ শিশুটির জন্য খুব কষ্ট হয়। বড় হওয়ার সুযোগ পেলে সে জানবে মানুষ কতটা ভয়ঙ্কর। কতটা নৃশংস!
রেনুর সন্তানগুলোর পাশে দাঁড়াক সরকার। সবরকম গুজব রুখে দিক শক্ত হাতে প্রশাসন। মানুষের সচেতনতা বাড়ুক। মানুষের মানবিকবোধ জাগ্রত হোক। মানুষ আবার মানুষ হয়ে উঠুক।

x