গুচ্ছ কবিতা

আকতার হোসাইন

শুক্রবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ
34

শারদীয়

ভুল হচ্ছে জেনেও ভুল করে চিলমচিতে হাত না ধুয়ে তামার ডেকচিতে হাত দিয়েছি পায়েসান্নের লোভে। এতো তাপ, পাঁচ আঙুলে ফোস্কা নিয়েও হাত বাড়িয়ে রেখেছি। সতর্ক রাঁধুনি ডেকচিতে ঢাকনা বসিয়ে দিলে আমি ভাদ্রের তালপিঠা আর আশ্বিনের মধুভাতের লোভে তাকিয়ে রইলাম শূন্য রেকাবির দিকে। চোখধাঁধানো বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেতের আলপথ ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে কিষাণীর উঠোনে পৌঁছে দেখি, তলইয়ের ওপর জালাধান সবেমাত্র শুকোতে দিয়েছে। শৈশব -কৈশোর খুঁজতে গিয়ে ক্ষুদেপানাভরা পুকুরে ডুব দিই, পাটিপাতার ঝোপে বুকে ছানা আগলে ভয়পাওয়া ডাহুক আর একঝাঁক আদুরে পোনা নিয়ে শোলমাছটি সরে যায়। অদূরে দেখি মা আমার, কাপ্তাইবাঁধের গেট খুলে দেয়া কর্ণফুলীর বুকচেতানো জলের তোড় দেখে ছোটবোনটাকে বুকের সাথে লাগিয়ে মাটির বাড়ির ডেইলার ওপর দাঁড়িয়ে জোরে জোরে দোয়া ইউনুস পড়ছেন।

২,

ভুল পাওয়ারের চশমা পরে একটি মসৃণ শহর খুঁজতে বেরিয়েছি। শহরের স্থায়ী নাগরিক কতিপয় দরদী বায়স মাজারের সামনে সারি বেঁধে বসে থাকা মাজুর চর্মরোগীদের সম্মানে মরমীসঙ্গীত গেয়ে উঠলে শরতের হিজাবী সন্ধ্যায় আমার চোখে শুধু একটি অতিলৌকিক মুখের ছবিই ভেসে ওঠে, জীবনের ক্রান্তিকালে যে আমাকে আশিদণ্ড শাস্তি দিয়েছিল। এখনও নিজের বুকে হাত রাখলে আমি তার দিগন্তকাঁপানো তৃপ্তশ্বাসধ্বনি শুনি।

৩.
তার দুঃখবই আমি পড়েছি। কিছুটা প্রক্রিয়াজাত। অজস্র বিলাস আর বিভ্রমে ছেঁড়াফোড়া। অক্ষরের জটে, যেখানে তার দাবি অবিরাম অশ্রুর, আমি কিন্তু পেয়েছি হাসির ফোয়ারা থেকে ছিটানো বাষ্পিত উচ্ছ্বাস। তার কান্না ও হাসির প্রভেদ বুঝতে আমি জাতিস্মর হওয়ার অপেক্ষায় আছি।

৪,
মন খারাপ হলে পুরনো প্রেসক্রিপশনগুলো দেখি। ভুলে যাওয়া ওষুধের নামগুলো স্মৃতিখেকো প্রেমিকার মতো বিরহব্যাকুল। এতো অসুখময় জীবন নিয়েও অচলমুদ্রাবয়সে নিজেকে আজও বিনিময়্যোগ্য মনে হয়। পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হেঁটে এখনো প্রেমময় যাতনাবোধ করি। এ’জীবন সংসার-সংসার খেলার, আত্মপীড়নের।

৫,
নদী দেখে আগে ভাবনা জাগতো, এখন কামনা জাগে। এতো প্রাচুর্য তার রমণীয় দেহবল্লরীতে, বাসনা হয়, ডুবসাঁতার দিতে দিতে পৌঁছে যাই চূড়ান্ত মোহনার জোড়াসন্ধিতে, যেখানে বাসররাতে নববধূ প্রথমবারের মত চোখের পর্দা সরিয়েছিল।

৬,
গমের দানা, তোমাকে ভুষি বানিয়ে খলদি মেখে গোয়ালের গামলায় রেখে আদরের গর“কে খাওয়াবার খুব সাধ জাগে। কিন্তু সে উদাস উদাস। ওপারের তেপান্তরের মাঠের বুনোঘাস ছাড়া কিছুই মুখে দিতে চায় না। দেমাগ।

শুনেছি, সমপ্রতি সে ‘ মাতা’র স্বীকৃতি পেয়েছে।

x