গুচ্ছকবিতা

নাজিমুদ্দীন শ্যামল

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ
51

নিত্যদিন নতুন কপাট
চূর্নচুলের নীচে আছে
ঠোঁটের তিল; তারপর
নেমে গেলে চোখের হরিণ,
নরোম পাহাড় যুগল,
কামনার মাখন চরাচর।
তারপর কস্তুরী নাভী মূল,
তার নীচে পড়ে আছে
কৃষ্ণবন কিংবা অদ্ভুত নদী।

এসব দেখেছি কন্যা জোছনার ঝরা রাতে
অথৈ সাগর সাঁতরে গেছি তোমার সাথে।
অতপর হয়নি কন্যা স্বপ্ন শরীর পাঠ
অনিঃশেষ রহস্য তুমি নিত্যদিন নতুন কপাট।

বৃষ্টির পর
এরপর এক পশলা বৃষ্টি ছাড়া
আর কিছুই নেই!
যেমনটি চেয়েছিলে এতকাল
হাওয়া এসে উলট-পালট করে দেবে মন,
ঘর দুয়ার আর আলনার গোছানো কাপড়;
তেমনি হলো। হাওয়া এলো
শিহরন জাগলো চুলের নদীতে,
কানের লতিতে আর সর্বাঙ্গে!
এখন আর কি,
শেষ অবধি বৃষ্টিও হয়ে গেলো!
তবে এবার চলো,
খোলা বোতাম আর ছাতাখানা
বন্ধ করে ফিরে চলো!

চল্লিশ কদম যাত্রা
মৃত্যুর ভয়ে ছুটতে ছুটতে মৃত্যু ভয় চলে যায়,
নাকি ভয়ের কথা ভুলে সবাই পাখি হয়ে যায়
তার কিছুই বুঝতে পারলাম না।
কতিপয় মৃত মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে
যা বুঝতে শুরু করলাম সেকথা বলতে
সকলে পাগল বলে উঠলো।
বস্তুত আমি দেহহীন মানুষের সাথে
কথা বলে ছিলাম। দেহ গত হলে মানুষতো
মানুষই থাকে। তবুও আমরা তাকে
মৃত বলে চল্লিশ কদম পিছনে যাই।
ফলত আমি অদ্যাবধি বুঝতে পারি নাই
আমরা কি মৃত মানুষ নাকি মৃত্যুকে ভয় পাই।

পাতা মানুষ
পাতাগুলো ঝরে যায়
এই শীতের বেলায়। শীত তো আসে
বছর ঘুরে প্রতিবার। ঝরা পাতা
হারিয়ে যায় বছর ধরে।
যদিওবা নতুন পাতা ফোটে,
আর ফেরে না ঝরা পাতা কোন কালে।
যেনবা স্মৃতির মানুষ ঝরা পাতা,
পাতা ঝরা দেখি প্রবল শীতকালে।

আমার পিতা
আমার বাবা পাহাড় ছিলেন,
তার শালপাংশু শরীরে আমরা
জন্মে ছিলাম কতিপয় বৃক্ষরাজি।
তিনি কখনো উহ শব্দও করেনি।
আমরা সকলে তার গায়ে
পুঁতে দিয়েছি শিকড়। শরীর বেয়ে
ক্রমশ গভীরে গেছে আমাদের মূল।
আমরা বড় হতে হতে আকাশের
কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। পাহাড়টি
কখনো বলেননি শরীর ব্যথায় আর্ত
হয়েছে। অতঃপর পাহাড়টি হাসি মুখে
মাটিতে শুয়ে গেছেন। মাটিতে ঘুমন্ত
মৃন্ময় পাহাড়টি আমার বাবা ছিলেন।

কিছুটা দেরি হওয়ার কথা
আমার যেতে দেরি হবে বলে
সকলকে বিদায় দিলাম। কিংবা সকলের
কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরলাম
নদীর কিনারে। নদীর পাড়ে জলজ হাওয়া
আর হাওয়ার শব্দ আসছে। কিছু ফুলও
বৃক্ষের পাতার সাথে নড়াচড়া করছে।
তবুও বুঝতেই পারলাম না
যাবার সময় হয়ে এলো, নৌকাও
ঘাটে অপেক্ষমাণ। মাঝি ডাকছে…

কিছুই গোছানো হলো না! অনেক কাজ বাকী
আছে বলে অগ্রযাত্রীদের থেকে বিদায়
নিয়েছিলাম। পড়ার টেবিলে কবিতার
খাতাটাও বন্ধ করা হয়নি; অসমাপ্ত
কবিতা আর আধপোড়া সিগেরেটও
পড়ে আছে! তবুও মাঝি ডাকছে,
নদীর ঘাটে নৌকা অপেক্ষা করছে…

আগুন লেখা
কতো বড় আর হবে এই বদ্বীপ…
হাতের তালুতে খানিকটা সবুজ,
জলজ নদী; তার উপর আকাশের নীল প্রলেপ
দিলে যতটুকু চিত্র ফুটে ওঠে
তার মতোই। এর বেশি কিছু নয়।

তবুও এই ছোট্ট সবুজে কিংবা
নকশী কাঁথার মতো চিত্রল ভূমিতে
কতো মুখ ভালবেসে বেঁচে থাকে
তার কোন ইয়ত্তা নেই।

তারাতো বেঁচে থাকে কাল বৈশাখির ঝড়ে
কিংবা তুমুল দুর্বিপাকে, তারা বেঁচে থাকে
অন্ধকার রাতে ধলপ্রহরের প্রতীক্ষাতে।
কতিপয়রা যখন চর দখলের যুদ্ধ করে,
কেউবা হয় দখলদার আর কেউ চায়
আবারো দখল করতে। এই বদ্বীপের
সবুজ প্রাণীরা ভয়ে জবুথবু হয়ে যায়।
কেবলই বলে যায় কেউ যেন এসে
তাদের সকলকে নিয়ে যায় অন্যকোথাও!
তাদের বাঁচায়; দখলদার বা দখললিপ্সুদের
হাতের তালু থেকে মুক্তি চায়।

আমিতো সবুজ বদ্বীপের মানুষের বেদনায়
তাদেরই মুক্তির কথা লিখি আগুন লেখায়।

x