গীতিময় শতবছর অনুষ্ঠানে দুই বাংলার শিল্পীরা

সনেট দেব

বৃহস্পতিবার , ২৩ মে, ২০১৯ at ৪:০৫ পূর্বাহ্ণ
34

বাংলার প্রাচীন সংগীতকলা সংস্কৃত স্তোত্রসঙ্গীত প্রভাবিত। এই সময়কার বৈষ্ণব ভাবাশ্রিত ধর্মসংগীতিগুলি আজও পূর্ব ভারতীয় মন্দিরগুলিতে গীত হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দম এই জাতীয় সঙ্গীতের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। মধ্যযুগে নবাব ও বারো ভূঁইয়া নামে খ্যাত শক্তিশালী ভূস্বামীবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিপালিত সংগীতধারায় আবার হিন্দু ও মুসলমান সাংগীতিক রীতির এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় গানগুলির অধিকাংশই ছিল ধর্মীয় সংগীত। মধ্যযুগের প্রথম পাদে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দ দাস, জ্ঞানদাস ও বলরামদাস প্রমুখ বৈষ্ণব পদকর্তাগণ রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক গানে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমচেতনার একটি পার্থক্য দর্শিয়েছেন। আবার মধ্যযুগের শেষ পাদে রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ শাক্তপদাবলিকারগণ তাঁদের গানে ঈশ্বরকে শুদ্ধ মাতৃরূপে বন্দনার কথা বলেছেন। বৈষ্ণব ও শাক্তপদাবলি (শ্যামাসংগীত ও উমাসংগীত) উভয়েরই মূল উপজীব্য হিন্দু ভক্তিবাদ, ভক্তিবাদী দর্শন। বৈষ্ণব সংগীতে যখন জীবাত্মা-পরমাত্মাকেন্দ্রিক প্রেমভক্তির তত্ত্ব প্রচারিত হয়, তখনই শাক্তগানে তন্ত্র ও শুদ্ধা মাতৃবন্দনার এক সম্মিলন গড়ে ওঠে।
কিন্তু কালের বিবর্তনে অনেকে আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে। আবহমানকালের বাংলা গানের ধারার বিগত একশত বছরের সমৃদ্ধ স্বর্ণযুগের ঐতিহ্য তুলে ধরার প্রয়াসে গত ১৬ এপ্রিল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় নগরীর থিয়েটার ইন্সস্টিটিউট চট্টগ্রাম এ (টিআইসি) ‘গীতিময় শতবছর’ শীর্ষক এক অন্যরকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন চট্টগ্রামের শিল্পী ও গুণীজনরা। আয়োজনে ছিলো কথামালা, আবৃত্তি ও সঙ্গীত। অংশগ্রহণ করে দুই বাংলার বেশ কিছু জনপ্রিয় শিল্পী।
আয়োজনে উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী। সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওপার বাংলা থেকে আগত কবি ও লোক সঙ্গীত গবেষক অঞ্জন সেন ও অধ্যাপক ড. সত্রাজিৎ গোস্বামী। আবৃত্তি শিল্পী কঙ্কন দাশের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন গীতিময় শতবছর কমিটির সদস্য সচিব কবরী দাশ ও ত্রিপুরার শিল্পী মনীষা পাল চৌধুরী।
কথামালায় অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতে সংগীত ও আবৃত্তি খুব জনপ্রিয়। সংগীত ও আবৃত্তি হচ্ছে একটি শিল্প। আবৃত্তি বা সংগীত শিল্পী হতে গেলে মেধার পাশাপাশি সাধনার প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতের মৈত্রী বন্ধন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে যা এখনো বিদ্যমান। ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এটি ইতিহাসে একটি অনন্য উদাহরণ।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শহীদের রক্ত ও আত্মত্যাগের উপর স্থাপিত। কোনো অপশক্তি সেই মৈত্রী বন্ধনকে ছিন্ন করতে পারবে না। এই দুই দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অভিন্ন। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভারত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি শিক্ষা ও সংস্কৃতি আমাদের যুব সমাজকে মাদকাসক্তি ও জঙ্গিবাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে।’
অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশ ও ভারতের আবৃত্তি ও সংগীত শিল্পীরা। গান ও আবৃত্তিতে শিল্পীরা চর্যাপদ থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক যুগ পর্যন্ত একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরী করে। এত নিজেদের পরিবেশনা উপস্থাপন করেন পণ্ডিত স্বর্ণময় চক্রবর্তী (বাংলাদেশ), সঞ্জয় রায় (বাংলাদেশ), জবা দত্ত (ভারত), মানসী সাধু (বাংলাদেশ), কমলিকা চক্রবর্তী (ভারত), লাকী দাশ (বাংলাদেশ), কবরী দাশ (বাংলাদেশ), সঞ্চারী গোস্বামী (ভারত)।
পণ্ডিত স্বর্ণময় চক্রবর্তী ‘তুহি সুরিয়া, তুহি চন্দ্র’ বন্দিনে প্রথমে রাগ ভূপালীর দ্রুপদ দিয়ে শুরু করেন। তারপর ‘যাবচে তুম সুনা লাগে’ বন্দিসে ভূপালী রাগের খেয়াল পরিবেশন করে শোনান দর্শকদের। এরপর মালকোষ রাগের তারানা ও সবশেষে পরিবেশন করেন একটি টপ্পা। রাগগুলো শিল্পী ত্রিতাল ও তারানা তালে পরিবেশন করেন।
সংগীতের ফাঁকে ফাঁকে আবৃত্তি পরিবেশন করেন শুভ্রা বিশ্বাস (বাংলাদেশ), মনীষা পাল চৌধুরী (আগরতলা, ত্রিপুরা), কঙ্কন দাশ (বাংলাদেশ) ও জাভেদ হোসেন (বাংলাদেশ)। শিল্পী কঙ্কন দাশ প্রাচীন বাংলার চর্যাপদ থেকে শুরু করেন। জাভেদ হোসেন পঞ্চকবির যুগের রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের দুইট কবিতা আবৃত্তি করেন। মধ্যযুগীয় কবিতা নিয়ে শিল্পী মনীষা পাল চৌধুরী ও আধুনিক যুগের কবিতা পরিবেশন করেন শিল্পী শুভ্রা বিশ্বাস। শিল্পী লাকি দাশ করে দুইটি আধুনীক গান। ‘একটা গান লিখো আমার জন্য’ ও ‘এই সুন্দর স্বর্নালী সন্ধ্যায়’ শিরোনামে দুইটি আধুনিক গান করেন শিল্পী লাকি দাশ।

x