গারাংগিয়ার মরহুম ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী

ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে আলোকিত পথিকৃৎ

মোঃ জামাল উদ্দিন ।। লোহাগাড়া

সোমবার , ২১ মে, ২০১৮ at ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ
392

সমাজে অনেক মহৎ প্রাণ ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা পরিবার সমাজ সভ্যতা বিকাশে অত্যন্ত আলোকময়। তার মধ্যে অবিভক্ত সাতকানিয়ার গারাংগিয়ার মরহুম ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী অন্যতম। তিনি মৃত্যুকালে ৪ সন্তান রেখে যান। তার একমাত্র পুত্র আলহাজ্ব মুকতারুল হক চৌধুরী একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, কন্যা সামশুন্নাহার, কামরুন্নাহার ও নাজমুন নাহার গৃহিনী হন। লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হক চৌধুরী ব্যাংকার মরহুম এম.. হাসেম, দলিলুর রহমান এডভোকেট তাঁর কন্যা জামাতা। পুত্রবধূ আলহাজ্ব জিন্নাতুননেছা বেগম ২০১৭ সালে রত্মগর্ভা মা পুরস্কারে ভূষিত হন। ড. প্রকৌশলী মইনুল হক, . প্রকৌশলী অধ্যাপক আসিফুল হক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ মিনহাজুল হক এফসিপিএস এবং আনোয়ার মোহাম্মদ আসাদুল হক এডভোকেট, জোহরা নাজনীন এমবিএ ও প্রকৌশলী পরিকল্পনাবিদ শাহিমা নাজনীন এমএস (যুক্তরাষ্ট্র) পৌত্রপৌত্রী হন এবং তারা সকলে দেশে ও বিদেশে সরকারিবেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত। ড. প্রকৌশলী অধ্যাপক আবু খালেদ মইনুদ্দিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ সাইফুদ্দিন কাজল দৌহিত্র হন এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনও উচ্চ পদে প্রতিষ্ঠিত আছেন।

চট্টগ্রাম জেলার অবিভক্ত সাতকানিয়া উপজেলার গারাংগিয়া এলাকায় মরহুম আবদুল মজিদ মাষ্টারের ঔরসে এবং মরহুমা তাজন্নেছার গর্ভে জন্ম হয়। যিনি ১৯০৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন ও ১৯৯৬ সালে মারা যান। আলহাজ্ব ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাতকানিয়া হাইস্কুল থেকে ১৯২৮ সনে ২য় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। পিতার মৃত্যুতে উচ্চ শিক্ষার আশা পরিত্যাগ করে পৈত্রিক এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব নেন। কিশোর অবস্থায় দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা সাতকানিয়ার প্রখ্যাত জমিদার মরহুম মোঃ লাতু বহদ্দারের কনিষ্ঠা কন্যা মরহুমা মনিরুন্নেছার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৯৩২ সালে তিনি সোনাকানিয়া ইউনিয়ন বোর্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সনে উক্ত ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং গারাংগিয়ার প্রখ্যাত ডেপুটি বাড়ির মরহুম আবদুর রউফ খান হতে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

তিনি বেশ সুনাম ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় ২২ বৎসর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসাবে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপার হতে পদক প্রাপ্ত হন। তিনি চোর, ডাকাত ও দুঃস্কৃতিকারীকে কঠোর হস্তে দমন করতেন। প্রবাদ আছে যে, তার আমলে লোকজন দরজা খোলা রেখে ঘুমাতেন। তদানিন্তন সরকার তাকে বেঞ্চ কোর্টসহ ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতা দেন। তিনি জুরী বোর্ডের সদস্য ও ঋণ সালিশী বোর্ডের সদস্য ছিলেন। সততা, ন্যায় বিচারের জন্য এলাকায় তার খ্যাতি ও সুনাম ছিল। তিনি একজন সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী, ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি অনেক মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ১৯৩৭ সালে এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে দক্ষিণ গারাংগিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিক স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নিজে এককভাবে দান করেন। তিনি দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলাম বারী উচ্চ বিদ্যালয় ও গারাংগিয়া সিনিয়র মাদ্‌রাসার কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি গারাংগিয়া মাদ্‌রাসায় ৪০ শতক জমিও দান করেন বলে জানা গেছে।

এছাড়াও তিনি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পালাকাটা এলাকায় মাষ্টার ঘোনায় একটি জামে মসজিদ ও মক্তব প্রতিষ্ঠা এবং মসজিদের জন্য এক একর জমি দান করেন। তিনি নিজ গ্রাম গারাংগিয়া এলাকায় পারিবারিক মসজিদ সংস্কার ও মক্তব প্রতিষ্ঠা এবং তা সুচারুরূপে পরিচালনা করেন। তিনি ১৯৮৭ সালে গারাংগিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং এক একর জমি দান করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে সোনাকানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং এলাকায় বিপুল উন্নয়ন সাধন করেন।

তিনি আলুরঘাট রোড নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। পশ্চিম আমিরাবাদ ডলুখাল থেকে লোহাগাড়া বটতলী ষ্টেশন পর্যন্ত রাস্তাটি সরু, সংকীর্ণ ও পায়ে চলার পথ ছিল। বর্তমান আইয়ুব ফাউন্ডেশন পরিচালিত টেকনিক্যাল স্কুলের পূর্ব দিকে উক্ত রাস্তাটি দর্জিপাড়ার উত্তর দিক দিয়ে লোহাগাড়া ষ্টেশনে মিলিত ছিল। আলহাজ্ব ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরীর আপ্রাণ চেষ্টায় উক্ত রাস্তা দর্জিপাড়ার দক্ষিণ দিকে স্থানান্তর করে রাস্তা সোজা করেন। অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি আলুরঘাট রোডের ভিত্তি স্থাপন এবং প্রশস্ত করেন। সোনাকানিয়া ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এয়াকুব আলী মাষ্টার পরবর্তীতে নিজ অর্থায়নে উক্ত রাস্তা আরো প্রশস্ত ও গাড়ি চলাচলের উপযোগী করেন। এই মহান ব্যক্তি নিজ অর্থায়নে নিজ জমির উপর বর্তমান গারাংগিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে স্থিত রাস্তার ভিত্তি দেন ও উন্নয়ন করেন। তিনি ডলু খালের উপর সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান মরহুম আমজাদ হোসেন, সাবেক সচিব মরহুম হাফিজুল ইসলাম, মেজর জেনারেল মিয়া মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বীরবিক্রম, আওয়ামীলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম আমিন ও আলহাজ্ব আইয়ুব’র প্রচেষ্টায় ডলু খালের উপর নান্দনিক সেতু নির্মিত ও তার লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। উক্ত সেতু নির্মাণের ফলে গারাংগিয়া উন্নত জনপদে পরিণত হয়েছে।

তিনি এলাকায় বহু কালভার্ট নির্মাণ ও নলকূপ স্থাপন করেন। প্রথম জীবনে সমাজ কল্যাণের ফাঁকে ব্যবসাবাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি প্রথম জীবনে বর্তমান মায়ানমারের আকিয়াব ও রেঙ্গুনে ব্যবসা করেন। মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এ মহৎ প্রাণ মানুষটি আজ নেই। তার কর্ম এলাকায় এখনও আলোকিত হয়। এলাকাবাসীরা বলছেন, মানুষ মানুষের জন্য এর অন্যতম উদাহরণ মরহুম ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তথ্যসূত্রমোঃ নেজাম উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক, গারাংগিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।

x