গান্ধীজীর আত্মকথা

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ৫ জুন, ২০১৮ at ৪:৩০ পূর্বাহ্ণ
30

২য় পর্ব

নানা রকমের সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত থাকা উনিশটি মামলার আসামী লক্ষণ তুকারাম গোলে ছিলেন নাসিক সেন্ট্রাল জেলের বিচারাধীন বন্দী। আকস্মিকভাবে সেখানে গান্ধীজীর আত্মকথা তার হাতে পড়ে। বইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার চোখে থেমে গেল এক জায়গার লেখা ‘আমরা বিবেক বিসর্জন দিলে আর ধার্মিক থাকি না। কোন ধর্মই নীতিবোধের ঊর্ধ্বে নয়। মিথ্যাবাদী, হিংস্র, অসংযমী মানুষ কখনো তার পাশে ঈশ্বর আছেন এমন দাবি করতে পারে না’। আগ্রহান্বিত হয়ে পড়ে ফেললেন বইটাই। উপলব্ধি করলেন ‘সত্যই ঈশ্বর’। বুঝলেন মানুষ মিথ্যার আশ্রয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। তারপর লিখলেন আমার নামে সব মামলা বন্ধ হোক, আমার জন্য সরকারের অমূল্য সময় নষ্টের প্রয়োজন নেই।

আমি সব অপরাধ কবুল করব, শাস্তি মাথা পেতে নেব। চিঠিটি তার মামলাগুলোর বিচারককে পাঠিয়ে মনে গভীর শান্তি পেলেন। এ জাতীয় অনভ্যস্ত চিঠি পেয়ে বিচারক চমকে উঠলেন। গোলেকে ডেকে তাঁর হৃদয় পরিবর্তন ও অনুতাপের কাহিনী শুনলেন। স্বেচ্ছায় সত্যের সম্মুখীন হওয়ায় তার কারাবাসের মেয়াদ কমে গেল। মুম্বাই সর্বোদয় মণ্ডল আত্মকথা ও অন্যান্য গান্ধী সাহিত্য দিয়ে তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করল। কারামুক্তির পরও গোলে সর্বোদয় মণ্ডলের প্রতিনিধিরূপে মহারাষ্ট্রের কারাগারে গান্ধীজীর আত্মকথা ও অন্যান্য সাহিত্য পড়াচ্ছেন। গোলে এক পরিবর্তিত অন্য মানুষ।

এই পর্বে গান্ধীজীর বাল্যবিবাহ নিয়েই লিখব। গান্ধীজী ভারতে এবং বিশ্বজুড়ে মহাত্মা এবং বাপু নামে পরিচিত। স্বাধীন ভারতের তিনি জাতির পিতা। ১৮৬৯ সালে পোর বন্দরের হিন্দু মোধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোর বন্দরের দেওয়ান, মা পুতলিবাঈ ছিলেন করমচাঁদের চতুর্থ স্ত্রী। ধার্মিক মায়ের সাথে এবং গুজরাটের জৈন প্রভাবিত পরিবেশে থেকে জীবের প্রতি অহিংসা, নিরামিষ ভোজন, আত্মশুদ্ধির জন্য উপবাস থাকা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি পারস্পরিক সহিষ্ণুতায় অভ্যস্থ হন। ১৮৮৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে গান্ধীজী তাঁর বাবা মায়ের পছন্দে কস্তরবা মাখাঞ্জিকে বিয়ে করেন। মহাত্মার বিয়ে বলে কথা। এ নিয়ে পাঠকদের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। এ বিয়ের আগেও গান্ধীজী তিন তিন বার বাগদত্ত হয়েছিলেন সাত বছর বয়সে। কিন্তু নির্বাচিত মেয়েগুলো মারা যায়। মোহনচাঁদেরা ছিলেন তিন ভাই। বড় জনের বিয়ে হয়েছিল আগেই। মেজ ভাই ছিলেন তার চেয়ে বছর তিনেকের বড়। আর একজন খুড়তুতো ভাই ছিল তার চেয়ে বছরখানেকের বড়। অভিভাবকরা স্থির করলেন তিনজনকে এক সাথে বিয়ে দিবেন। ‘হিন্দুদের বিয়ে তো চারটি খানি কথা নয়। অনেক সময় বিয়ে দিতে গিয়ে বাবা মা সর্বস্বান্ত হয়েছে এমনও দেখা যায়। টাকাকড়ি বিষয় সম্পত্তি তো বটেই সময়েরই যথেষ্ট অপচয় হয়। মাসের পর মাস কাপড়চোপড় কেনাকাটায়, গয়নাগাটি গড়াতে এবং বিয়ের ভোজের ফিরিস্তি তৈরি করতে। কে কত রাধবে, কত রকম কি পাতে দেবে এসব নিয়ে পরস্পরের রেষারেষিরও অন্ত নেই। মেয়েদের গানের গলা থাকুক না থাকুক গলা ফাটিয়ে গান গাইতে গিয়ে কেবল গলা ভাঙে না শরীর স্বাস্থ্যও ভাঙে। প্রতিবেশীদেরও শান্তি ভঙ্গ হয়। এতসব হৈ চৈ, হট্টগোল ভুক্ত বিশিষ্ট জঞ্জালের দুর্গন্ধ সবকিছু প্রতিবেশীদের মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। কারণ তারা জানে সে সময় সুযোগ এলে তারাও অনুরূপ আচরণ করবে। কর্তারা ভাবলেন, ছেলে চোকরাদের বিয়ের হাঙ্গামা এক সঙ্গে চুকিয়ে দিলে বেশ হয়। খরচা হয় কম কিন্তু আড়ম্বর বেশি। বাবা ও কাকা দু’জনেই বুড়ো হয়েছেন। আমরাও ছিলাম তাদের শেষ বয়সের সন্তান। হয়তো তারা ভেবেছিলেন তাদের জীবনের এই শেষ আনন্দ উৎসব তারা বেশ ঘটা করে করবেন। আর আমার কাছে বিয়ে মানে ভালো কাপড়চোপড়, ঢাকঢোল হট্টগোল জমকালো মিছিল আর ভালো ভালো খাবার দাবার উপরন্তু অজানা অচেনা একটা মেয়েকে খেলার সাথীরূপে পাওয়া। গান্ধীজী আরো লিখেন, ‘তখন আমি স্বপ্নেও ভাবিনি বালক বয়সে আমার বিবাহ দেবার জন্য বাবাকে আমি দোষ দেব। সেদিন যা যা ঘটেছিল সবই মনে হয়েছিল যেমনটি হওয়া উচিত তাই ঘটেছে। মনে মনে খুশিও হয়েছিলাম। উপরন্তু বিবাহ ব্যাপারে আমার আগ্রহও ছিল বেশ। বাবা সবকিছু এমন সুন্দর ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করলেন যে উৎসবের প্রতিটি ঘটনা এখনো আমার চোখে ভাসছে। বিবাহ বেদীতে আমরা কিভাবে বসেছিলাম কিভাবে সপ্তপদী গমন করলাম দম্পতি হয়ে কেমন করে আমরা পরস্পরের মুখে মিষ্টান্ন তুলে দিয়েছিলাম, কিভাবে আমাদের মিলিত জীবন শুরু হলো প্রথম রাতের বাসর শয্যায় সে সমস্ত কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। দুটি নিষ্পাপ শিশু যেন অপার সংসার সাগরে ঝাঁপ দিলাম। লজ্জায় আমরা দু’জনেই কাঠ। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে ভাব হলো। আমরা সহজে পরস্পরের সঙ্গে আলাপ পরিচয় শুরু করলাম। যদিও আমরা একই বয়সের। দু’দিনে আমি স্বামীত্বের পদাধিকারে প্রভুত্ব করতে লাগলাম। যদিও আদর্শ স্বামী আজীবন স্ত্রীর একনিষ্ঠ থাকবেন এই কথা আমার মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া সত্যনিষ্ঠা আমার স্বভাবগত ছিল যে স্ত্রীকে আমি প্রবঞ্চনা করব এমন কথা ভাবতেও পারতাম না। আর ঐ বালক বয়সে তার কোন সুযোগই ছিল না। কিন্তু আমার একনিষ্ঠতার একটা দিকও ছিল। আমি ভাবতাম, একনিষ্ঠ তো এক তরফা হতে পারে না। আমি যদি একব্রত হই আমার স্ত্রীকে একব্রতা হতে হবে।

এসব চিন্তার ফলে আমি স্বামী হিসেবে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠলাম। স্ত্রীর পক্ষে যেটা কর্তব্য সেটা যেন আমার অধিকারে দাঁড়াল। পতিভক্তি আমি দাবি করতে লাগলাম। আমার অধিকার যাতে কিছু মাত্র ক্ষুণ্ন না হয় সেজন্য তাকে পাহারায় রাখলাম। বিধি নিষেধের কারাগারে যেন তাকে বন্দী করা হলো। এত শত বাধন মেনে চলবে কস্তুরবাঈ তেমন পাত্রী ছিল না। সে একপ্রকার ইচ্ছে করেই যখন খুশি যেখানে খুশি বেড়াতে লাগলো। যতই শক্ত করে আমি তাকে বাঁধতে চেষ্টা করতে লাগলাম ততই সে যেন বাঁধনছাড়া খেয়ালীপনা করতে লাগলো। এক সময় আমরা কথা বলা বন্ধ করে দিলাম।’ গান্ধীজী আবার উপলব্ধি করতে লাগলেন এসব বিধি নিষেধ অমান্য করায় কস্তুর বাঈয়ের কোন দোষ ছিল না। নিষ্পাপ সরলা মেয়ে, সে কেমন করে ভাববে যে পূজার মন্দিরে কিংবা বন্ধু বান্ধবের বাড়িতে যাওয়া তার পক্ষে অন্যায় হবে। গান্ধীজীর কঠোর আচরণের ভিত্তিই ভালোবাসা। তাই তিনি নিজে বর্ণনা করেছেন এভাবে ‘আমি কস্তুরবাঈকে খুবই যে ভালোবাসতাম সে কথা বলতে আমার দ্বিধা নেই। স্কুলে ক্লাসে বসে তার কথা মনে পড়তো, রাতের অন্ধকারে সে পা টিপে টিপে শোবার ঘরে আসছেএই চিন্তা সর্বক্ষণ আমার। বিয়ের হ্যাঙ্গামে আমাদের একটা বছর মাটি হলো। মেজদার অবস্থা হলো আরো সঙ্গীন। তিনি পড়াশোনা একেবারেই ছেড়ে দিলেন। বাল্যবিবাহের ফলে তার মতো আরো কত ছেলের অকালে স্কুল ছেড়ে সংসার যাত্রায় যোগ দিতে হয়, সেই কথা ভগবানই জানেন। এক কেবল আমাদের এই হিন্দু সমাজেই একই সঙ্গে বিবাহ ও অধ্যয়নের ব্যবস্থা।’

১৮৮৩ সালে ১৩ বছর বয়সের গান্ধীকে ১৪ বছর বয়সি কস্তুরবাঈকে বিয়ের বন্ধনে বেঁধে দেওয়া হয়। সেই বন্ধন গান্ধীজী সারা জীবন অটুট রেখেছিলেন। সেই বালিকা বধূই গান্ধীজীর সকল কর্ম ও আন্দোলনের অনুপ্রেরণাদাত্রী ছিলেন। যদিও ৩৭ বছর বয়সে গান্ধীজী নারী সংসর্গ পরিত্যাগ করেন। বাবার মৃত্যুর সময় তিনি স্ত্রীর সাথে আনন্দময় সময় কাটাচ্ছিলেন। এই গ্লানিবোধ ও অনুশোচনা গান্ধীজীর আত্মকথায় অনেকবার এসেছে। নারী সংসর্গ ছেড়ে দেওয়ার পেছনে এই গ্লানিবোধই কাজ করেছে। আসলে গান্ধীজীর জীবনটাই ছিল অসংখ্য পরীক্ষানিরীক্ষার সমাহার যে পরীক্ষানিরীক্ষা তিনি করেছিলেন সেগুলোর বর্ণনাই তার পুরো আত্মজীবনী জুড়ে। তৎকালীন সমাজ চিত্রের একটা পরিপূর্ণ চিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। (চলবে)

x