গান্ধীজীর আত্মকথা

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ১২ জুন, ২০১৮ at ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
41

শেষ পর্ব

রোজার সময় ঝামেলা কম কিংবা হাতে একটু বেশি সময় থাকে যার জন্য একটু ভারী এবং গম্ভীর বইগুলো এই সময়েই হাতে নিই। আসলে এই ৫০০ পৃষ্ঠার বইয়েই কি গান্ধীজীর জীবন সীমাবদ্ধ? আমার মনে হয় সারা জীবন ধরে পড়লেও গান্ধীজীর দর্শন, গান্ধীজীর জীবনাদর্শ, গান্ধীজীর অহিংস সংগ্রাম, গান্ধীজীর জীবনাচরণ শেষ হবার নয়। এই উপমহাদেশ তো বটেই সারা বিশ্বে গান্ধীজীর সমকক্ষ আর কোনো নেতা আছেন বলে আমার মনে হয় না। রাজনৈতিক নেতাদের এমন শুদ্ধ জীবন চর্চা কথায় কাজে বিশ্বাসে এতটা সমন্বয় আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। গান্ধীজীর চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাসের কারণেই সমস্ত প্রতিকূলতা পার করতে পেরেছেন। তিনি ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। এর মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ স্বৈরশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। এই আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অহিংস মতবাদ বা দর্শনের ওপর এবং এটিই ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকা শক্তি। সারা বিশ্বের মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার পাওয়ার আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। ২রা অক্টোবর তাঁর জন্মদিন ভারতে গান্ধী জয়ন্তী হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। ২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একজন শিক্ষিত বৃটিশ আইনজীবী হিসেবে গান্ধীজী প্রথম তাঁর অহিংস শান্তিপূর্ণ নাগরিক আন্দোলনের মতাদর্শ প্রয়োগ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের নাগরিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে, ভারতে ফিরে আসার পরে কয়েকজন দুস্থ কৃষক এবং দিন মজুরকে সাথে নিয়ে বৈষম্যমূলক কর আদায় ব্যবস্থা এবং বহু বিস্তৃত বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর গান্ধীজী সমগ্র ভারত ব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী স্বাধীনতা বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, বর্ণ বৈষম্য দূরীকরণ, জাতির অর্থনৈতিক সচ্ছলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রচার শুরু করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় ও স্বদেশে বিভিন্ন সময় কারাবরণ করেন। মহাত্মা গান্ধী সমস্ত পরিস্থিতিতেই অহিংস মতবাদ এবং সত্যের ব্যাপারে অটল থেকেছেন। তিনি খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন এবং একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটি ছিল স্বয়ংসম্পন্ন। তাঁর কাপড় ছিল ভারতীয় ধূতি এবং শাল যা তিনি নিজেই চরকায় বুনতেন। তিনি সাধারণ নিরামিষ খেতেন আত্মশুদ্ধি এবং প্রতিবাদের কারণে দীর্ঘসময় উপবাস থাকতেন। ১৮৮৭ সালে গান্ধীজী ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। মাভজী দাবে বলে এক পন্ডিত ব্রাহ্মণ ছিলেন গান্ধী পরিবারে হিতৈষী বন্ধু। গান্ধী পরিবারের খোঁজ খবর রাখতেন। গান্ধীজী কলেজে ভর্তি হয়েছে শুনে বললেন ‘দেখো দিনকাল বদলে গেছে ভালোভাবে শিক্ষা দীক্ষা না করলে ছেলেদের মধ্যে কেউ বাবা গান্ধীর গদিতে বসার উপযুক্ত হয়ে উঠবে না। এখন দেখা যাক যে ছেলেটি লেখাপড়ায় লেগে আছে সে বাপের গদি দখল করতে পারে কিনা। তবে বি.এ পাস করতেই তো ওর চার পাঁচ বছর লেগে যাবে। পাস করেও বড় জোর পঞ্চাশ ষাট টাকার চাকরি একটা জুটবে দেওয়ানগিরি তো জুটবে না। তারপর বি.এ পাস করে যদি আমার ছেলের মতো ওকালতি পড়তে যায় তাহলে আরও কয়েক বছর লাগবে। ততদিনে দেওয়ানের গদির উমেদার হয়ে বহু পাস করা উকিল ভিড় করবে। আমি বলিকি ওকে বিলেত পাঠিয়ে দাও। আমার ছেলে কেবল রাম বলে বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে আসা খুব সোজা। তিন বছরের বেশি সময় লাগে না। যোশীজী আমার দিকে এমন করে তাকালেন যেন সবই ঠিক হয়ে গেছে এবং বললেন, কেমন মোহন বিলেত যেতে ইচ্ছে হয় না এখানে পড়বে? আমার কাছে এর চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারে না। কলেজের শক্ত শক্ত পড়া নিয়ে আমার মনের মধ্যে খুবই ভয় ছিল। আমি তো পরম উৎসাহে বললাম ‘বিলেত যদি পাঠানো স্থির হয় তাহলে যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভালো কলেজের পরীক্ষা চট করে পাস করতে পারা তো সহজ ব্যাপার নয় কিন্তু বিলেত গিয়ে তো আমি ডাক্তারি শিখে আসতে পারি। দাদা বাধা দিয়ে বললেন, ‘বাবার পছন্দ ছিল না, তোমার কথা মনে করেই তিনি বলতেন, আমাদের বৈষ্ণবদের মড়া কাটাকুড়ির ব্যাপারটা করতে নেই, বাবার ইচ্ছে ছিল তুমি উকিল হও, যোশীজী দাদার কথায় সায় দিয়ে বললেন আমার ইচ্ছা, হয় তুমি দেওয়ান হও কিংবা তার চেয়ে বড় কিছু কাজ কর। তা যদি হয় তাহলে তুমি তোমাদের বৃহৎ পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণ পোষণ করতে পারবে। আর দেশে তো দিনকাল দ্রুত বদলাচ্ছে জীবন যাত্রার সমস্যাও কঠিন হচ্ছে। আমার ধারণা ব্যারিস্টার হওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের মতো কাজ হবে। যোশীজী চলে গেলেন আমি মনে মনে আকাশ কুসুম রচনা করতে লাগলাম। দাদা মহা ভাবনায় পড়লেন। বিলেত পাঠানোর মত টাকা পয়সা কোথা থেকে যোগাড় করবেন? কাঁচা বয়সে যুবক ছেলেকে বিশ্বাস করে কি একা একা এত দূরের দেশে পাঠানো কী ঠিক হবে? স্ত্রীর গয়না বেচে টাকা যোগাড় করা যায় কিনা আমি ভাবতে লাগলাম। আমার পরম নির্ভর স্থল দাদার কথাও মনে হলো। আমার প্রতি তার উদার স্নেহ ছিল আতিশয্যদুষ্ট তিনি আমার নিজের ছেলের মতো করে দেখতেন। যোশীজীর পরামর্শ চাইলাম। তিনি তো বলে দিলেন ধার কর্জ করতে হলেও যেন বিলেত যাওয়ার সংকল্প ত্যাগ না করি। আমি স্ত্রীর গয়না বেচে দেওয়ার প্রস্তাব করলাম তা থেকে দু’তিন হাজার টাকা যোগাড় হতে পারে। দাদা কথা দিলেন যে বাকি টাকা যেমন করেই হোক না কেন তিনি নিশ্চয় যোগাড় করবেন। এদিকে মায়ের কিন্তু আদৌ ইচ্ছে নয় যে আমি বিলেত যাই, তিনি খুটিয়ে বিলেতের বিষয়ে নানা খোঁজ খবর নিতে লাগলেন। কে যেন তাকে বলেছিলেন যে বিলেত গেলে ছেলেরা উচ্ছন্নে যায়। সেখানে গিয়ে সবাই মাংস খায়, মদ না খেলে নাকি চলেই না। মাকে বুঝিয়ে বললাম, ‘আমায় কি তুমি বিশ্বাস করতে পারো না? আমি কি মিথ্যা কথা বলে তোমায় ঠকাবো? শপথ করে তোমায় বলছি ওসব জিনিস আমি ছোঁবও না।

মা বললেন, দেখি, বেচারজী স্বামীকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখা যাক মোশীজীব মতন ইনিও আমাদের পরিবারের একজন পরামর্শদাতা। বেচারজী আমার সহায় হয়ে মাকে এসে বললেন “আমি মোহন দাসকে দিয়ে ওই তিন ব্যাপারে ভগবানের দিব্য দিয়ে শপথ করিয়ে নেব। তারপর তুমি ওকে ছেড়ে দিতে পার। তিনি আমায় শপথ করিয়ে নিলেন যে মদ, মাংস ও স্ত্রী সংসর্গ থেকে আমি যেন বিরত থাকি। স্পর্শ পর্যন্ত করব না। অতঃপর মায়ের মত পাওয়া গেল। এদিকে আমার জাত ভাইরা আমার বিলেত যাওয়ার ব্যাপারে অস্থির হয়ে উঠল। এ পর্যন্ত কোন মোঢ়বেনিয়া বিলেত যায় নি। আমার যদি তেমন দুঃসাহস হয়ে থাকে তো আমার উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। মোঢ় বেনিয়াদের একটা সভা ডাকা হলো আর হুকুম এলো আমায় সে সভায় হাজির হবার জন্য। আমি হাজির হলাম। কি করে যে হঠাৎ এত সাহস সঞ্চয় করেছিলাম সে আমি নিজেই জানি না। সেই সভায় হাজির হতে গিয়ে আমার না হলো ভয় না হলো সংকোচ। শেঠ আমায় বললেন “দেখো বাপু মোঢ় বেনিয়া সমাজের বিচারে তোমার বিলেত যাওয়ার প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত নয় আমাদের ধর্মে বলে সমুদ্র পার হওয়া নিষিদ্ধ। তাছাড়া শোনা যায় ধর্মীয় আচার বিচার লঙ্ঘন না করে বিলেতে বসবাস করা শক্ত। সেখানে সাহেবদের সাথে খানাপিনা করতে হয়, আমি জবাবে বললাম, আমার তো মনে হয় না বিলেত যাওয়া ধর্ম বিরুদ্ধ। আমি সেখানে যেতে চাই উচ্চ শিক্ষার জন্য। যে তিনটি বিষয়ে আপনাদের সবচেয়ে বেশি ভয় আমি মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি সেগুলো পরিহার করে চলব। শেঠ বললেন, সেই যাই হোক আমরা তোমাকে বলতে চাই সেখানে ধর্ম মেনে চলা একেবারেই অসম্ভব। তুমি তো জানো তোমার বাবার সাথে আমার কেমন সদ্ভাব ছিল। আমার কথা তোমার মান্য করা উচিত। আমি বললাম বাবার সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক ছিল সে আমি জানি। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি নিরুপায়। বিলেত যাওয়ার সংকল্প বদলাতে পারব না। কিন্তু সমাজের বিধান কি অমান্য করবে। আমি তো উপায় দেখছি না। আমার মনে হয় এ রকম ব্যাপারে জাত বা সমাজের হাত দেওয়া ঠিক নয়।

এরপর গান্ধীজীকে ভর্ৎসনা করা হলো এবং জাতিচ্যুত করার ঘোষণা দেওয়া হলো। অতঃপর সমস্ত প্রতিকূলতার সাথে লড়ে তিনি সমুদ্র পথে মেটাই ও শুকনো ফল ফ্লানেনের দুটি সাদা স্যুট নিয়ে বিলেতের উদ্দেশ্য রওনা হলেন। ইংরেজি না জানার কারণে জাহাজে কারো সাথে তিনি মিশতে পারতেন না। কেবিনের এক কোনায় অনেকটা মুখ গুঁজে বসে থাকতেন। অবশেষে লন্ডন পৌঁছে নতুন জীবন সংগ্রামে পড়লেন এবং উতরেও গেলেন। ব্যারিস্টার হলেন সাহেবী চালচলন সবই রপ্ত করলেন কিন্তু মায়ের কাছে দেওয়া ওয়াদা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হলেন না। ক্ষিতিশ রায় অনূদিত গান্ধীজীর “আত্মকথা অথবা সত্যের সন্ধানে” বইটি পাঠককে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। গান্ধীজীর বর্ণাঢ্য জীবনের আদ্যপান্ত খুব সরলভাবে উপস্থাপন করা হয়। ৫০০ শত পৃষ্ঠার এই বইটিকে পাঁচটি অধ্যায় ভাগ করা হয়। তাঁর জীবনের এমন কোন দিক নেই যা জনসাধারণের অজ্ঞাত। মহাত্মা ছিলেন সত্যিকারের জীবনশিল্পী। গান্ধীজীর আত্মকথার জনপ্রিয়তার প্রমাণ মিলবে বিভিন্ন ভাষায় তার অনুবাদের ইতিহাস দেখলে। এত সংখ্যক ভারতীয় ও বিদেশি ভাষায় পৃথিবীর কম গ্রন্থই অনূদিত হয়েছে। ভারতে ইংরেজি ছাড়াও হিন্দি, অসমিয়া, বাংলা, ওড়িয়া, উর্দু, তেলুগু, তামিল, কন্নড়, মালয়লম, মারাটি, পাঞ্জাবী, সিন্ধি ও মনিপুরের মেইতি অর্থাৎ ১৫টি ভাষায় আত্মকথা পাওয়া যায়। ভারতের বাইরে আরবি, স্প্যানিশ, ব্রাজিলিয়ান, জার্মান, পোলিশ, তিব্বতি, সার্বোক্রোশ তুর্কি, সিংহলি, ইতালিয়ান, ইন্দোনেশিয়ান, ফরাসি, সুইডিশ ডাচ, পর্তুগীজ, হিব্রু, ফিনিশ মোট একুশটি ভাষায় এ যাবত আত্মকথা প্রকাশিত হয়েছে।

বইটির দাম পাঁচশত রুপী।

x