গাধা কাহিনি

সত্যব্রত বড়ুয়া

শুক্রবার , ৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ
35

চাণক্য একজন ধীমান কূটনীতিবিদ ছিলেন। মৌর্য সাম্রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করবার পেছনে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। রাজনীতিতে ‘চাণক্য নীতি’ নামে একটি প্রবাদসম কথা চালু রয়েছে। তিনি রাজনীতিবিদদের গাধার কাছ থেকে ধৈর্যগুণ গ্রহণ করতে বলেছেন। আসলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজন রয়েছে। গাধার এই অনন্য সাধারণ গুনটি থাকা সত্বেও গাধা কথাটি তুচ্ছার্থে কেন ব্যবহার করা হয় তা আমার মাথায় ঢুকেনা। শৈশবে বাবা আমাকে পড়াতে বসালে কখনো ধৈর্য ধারণ করতে পারতেন না। তিনি রাগ ঝাড়তেন আমাকে গাধা ডেকে। একবার তিনি এতই রেগে গিয়েছিলেন যে দিশেহারা হয়ে তিনি আমাকে ‘গাধার বাচ্চা কোথাকার’ ডেকে ফেলেছিলেন। আমি জানতাম মানুষ কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি দেয়। কিন্তু গাধার বাচ্চা গালিটি প্রথম আমি বাবার মুখে শুনেছিলাম। আমার খুব মনে পড়ে বিয়ের পর নতুন বউ এর সাথে আমি কথা বলতে বিব্রত বোধ করছিলাম বলে বাবা আমাকে বলেছিলেন, তুই এখনো গাধা রয়ে গেলি। ছেলে বেলায় বাবার কাছ হতে আমি গাধা কথাটি এতই শুনেছি যে এটা আমার গা সওয়া হয়ে গিয়েছিলো। বড় হয়ে যাওয়ার পর তিনি অবশ্য আমাকে খুব কমই গাধা ডাকতেন। কিন্তু এতে আমি স্বস্তি পেতাম না। বাবা গাধা ডাকলে আমার রাত্রে ভালো ঘুম হতো। গাধারও নিশ্চয়ই এমন হয়। আমি মেধাহীন ছিলাম বলে বাবা আমাকে গাধা ডাকার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন। আমি সে সুযোগ পাইনি, কারণ আমার ছেলে যথেষ্ট মেধাবী ছিলো। ছেলেকে গাধা ডাকতে না পারার দুঃখ আমার এখনো রয়ে গেছে। আমি গাধা চরিত্রের মানুষ হলেও ধৈর্যশীল নই। ছেলে বেলায় আমি রেগে গেলে লাফালাফি করতাম। মা বলতেন, তুই ‘চিরুং মাছ’ এর মতো লাফাচ্ছিস কেন? ছেলে বেলায় আমার গাধা প্রাণিটি দেখবার খুব কৌতুহল ছিলো। গাধা দেখেছি বড় হয়ে। দেখেছি ছেলেকে নিয়ে যখন ঢাকায় চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। প্রবল উৎসাহে তাকে বলেছিলাম, ঐ দেখ্‌ গাধা। একটি মহাজন বাক্য রয়েছে, গাধা পেটালে ঘোড়া হয়না। আমার ধারণা ঘোড়া পেটালে সে ঘোড়া গাধা হয়ে যাবে। শুনেছি সেকালে ধোপারা গাধাকে কাপড় বয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কাজে লাগাতো। এতে বোঝা যায়- এ দেশে এক সময় গাধা ছিলো। এখন সে গাধা হারিয়ে গেলেও আমার মতো অনেক গাধা রয়েছে। আমরা বলি ‘গোবেচারা’। আমার কিন্তু গরুর চাইতে গাধাকেই বেশি বেচারা বলে মনে হয়। এ জন্যে ‘গোবেচারা’ না বলে বরং ‘গাবেচারা’ বলাই শ্রেয়। গরু রেগে গেলে শিং উচিয়ে তেড়ে আসে। গাধা কখনো রাগ করেনা। তা ছাড়া গুঁতো দেওয়ার মতো গাধার শিংও নেই। পুরুষ গরুকে আমরা ষাঁড় বলে থাকি। মহিলাকে বলি গাই। আমি জানিনা গাধার ক্ষেত্রে কি বলা হয়। গরুকে আবার বলদও করা হয়। গাধাকেও নিশ্চয়ই করা যাবে। কিন্তু গাধার বেলায় তখন গাধাকে কি বলা হবে সেটা আমার জানা নেই। বাংলা ভাষায় ‘গাধার টুপি’ বলে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। সার্কাসের ‘ক্লাউন’দের আমি গাধার টুপি পরে মানুষ হাসাতেও দেখেছি। আমার খুব ইচ্ছে করে গাধিনীর দুধ খেতে। আমি মনে করি এ দুধ খুব পুষ্টি সমৃদ্ধ। আমি জানিনা এ দেশে কেও গাধার খামার করছে কিনা। করলে ভালো হতো। দার্শনিকরা বলে থাকেন, ‘নো দাই সেলফ’ অর্থাৎ নিজেকে জানো বা আবিষ্কার করো। আবিষ্কার করলাম, আমি সত্যিই একজন খাঁটি গাধা।

x