গল্পটি কেবল প্রজাপতির নয়

মাধব দীপ

শনিবার , ২৭ অক্টোবর, ২০১৮ at ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
36

আচ্ছা, প্রতিকূল পরিবেশে সে কি সহজে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না? আমি জানি না, প্রজাপতির এই গল্পের সঙ্গে আমার কন্যাসন্তান জন্মানোর কোনো মিল আছে কিনা? মিল থাকুক- সেটা আমি ঘুণাক্ষরেও চাই না। জানি না, ওই রাতেই সিজারিয়ান ডেলিভারিতে না গেলে কোনো বিপদ হতো কি না! শুধু জানি- প্রাইভেট কারের এসি’র বাতাস সরাসরি কিছুক্ষণ আমার কন্যার গায়ে লাগলে, বৃষ্টির কয়েকফোটা পানি তার উপর পড়লেই বা একটু বেশি ঘামলেই কিংবা বাথরুমে ঢুকে পানি দিয়ে একটু বেশি সময় ধরে নাড়াচাড়া করলেই সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

২০১৫ সালের অক্টোবরের ২৯ তারিখ। আমার স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে ‘ফলোআপ’-এ যাবো। শহরের নামকরা চিকিৎসক। সিরিয়াল নিলাম সকালে। সন্ধ্যা সাতটায় যেতে হবে বিশেষজ্ঞ সেই চিকিৎসকের চেম্বারে। গেলাম। কিন্তু চিকিৎসক নেই। কী একটা প্রোগ্রামে আটকা পড়েছেন। সময় মতো আসতে পারবেন না। ওইদিন যদি দেখাতে চাই- তবে অপেক্ষা করতে হবে আরও ঘণ্টা তিনেক। রাত সাড়ে নয়টা কী ১০টা বাজে তিনি আসতে পারেন। জানালেন সিরিয়ালনাম্বার প্রদানকারী ব্যক্তিটি। ডেলিভারির প্রত্যাশিত তারিখ পরের মাসের ২০ তারিখের পর। ভাবলাম- এমন শরীর নিয়ে যখন চলেই আসলাম চিকিৎসকের চেম্বারে- তবে কয়েকঘণ্টা অপেক্ষা করে চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাৎ করেই যাই। পরদিন তো আবার শুক্রবার। চিকিৎসক মহোদয় চেম্বার করবেন না। যাই হোক, চিকিৎসকের চেম্বারের কাছেই ছিলো আত্মীয়ের বাসা। বনে গেলাম কয়েক ঘণ্টার অতিথি। পুনরায় চিকিৎসকের চেম্বারে ফিরলাম প্রায় ১০টার দিকে। চিকিৎসক আসলেন। ইউএসজি (আলট্রাসনোগ্রাম) রিপোর্ট দেখে বললেন- ‘সবকিছু ঠিক আছে। আগামীকাল ভোর-সকালে অপারেশান করিয়ে ফেলেন।’
আমি বললাম- ‘বলেন কী? আমরা তো প্রস্তুত না একেবারেই। প্রত্যাশিত তারিখ ছুঁতে আরও প্রায় ২৫ দিন বাকী।’ তিনি জানালেন- পরদিন থেকে তিনদিন তিনি এই চট্টগ্রাম শহরে থাকবেন না। রাঙামাটি যাবেন। ফিরবেন সোমবারের দিকে। আরও জানালেন- যদি কালই অপারেশন না করাই তবে এই তিনদিনের মধ্যে কোনো ঝামেলা হলে- সেই দায় তিনি নেবেন না।
কিছুটা টেনশানে পড়ে গেলাম। বললাম- “আমার তো আজকে আপনার সঙ্গে দেখা না হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। কারণ, সন্ধ্যা সাতটায় যখন এলাম আপনার চেম্বারে, তখন আপনি ছিলেন না। যদি বাসায় ফিরে যেতাম তখন, নিশ্চয়ই দেখা হতো পরবর্তী সোমবারে। কাছাকাছি এক আত্মীয়ের বাসা ছিলো বলে এখন আসাটা সম্ভব হয়েছে। আর, এখন বলছেন, ‘আগামীকাল সকাল ছয়টার দিকে অপারেশন করাতে হবে’?”
চিকিৎসক নাছোড়বান্দা। বারবার বলছেন- আগামীকালই অপারেশন করে ফেলতে। কী আর করা। রাত ১২টার দিকে প্রাইভেট হাসপাতালের কক্ষ বুক করলাম। ভর্তি করালাম স্ত্রীকে। পরদিন সকাল ছয়টা ৪২ মিনিটে আমাদের কোলজুড়ে এলো আমাদের প্রথম সন্তান ‘নক্ষত্রকণা উৎসা’।
যাই হোক, এই যে এতোক্ষণ পর্যন্ত একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পাড়লাম। এর পেছনের কারণ কী- সেটা বলার আগে চলুন প্রজাপতি নিয়ে একটি মোটিভেশনাল সত্যগল্প শুনি। একদিন একটি প্রজাপতির জন্মসময় ঘনিয়ে এলো। একটা লোক পাশে বসা ছিলো এবং বেশ কয়েকঘণ্টা ধরে দেখছিলো- প্রজাপতিটি তার সেই জন্মঘরের (খোল বা খোলস) ছোট্টছিদ্র দিয়ে বের হওয়ার তুমুল চেষ্টা করছে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চেষ্টা করার পর হঠাৎ করেই এটি তার নড়াচড়া বন্ধ করে দিলো। লোকটির মনে হলো- আর বোধ হয় প্রজাপতিটি পারছে না। যতোটুকু শক্তি ছিলো, এর সবটুকুই এটি ব্যবহার করেছে। কিন্তু ওইটুকুন ছিদ্র দিয়ে এটি আর বেরোতে পারছে না। লোকটি ঠিক করলো- তিনি প্রজাপতিটির বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে সাহায্য করবেন। একপর্র্র্যায়ে একটি কাঁচি যোগাড় করলেন। এরপর প্রজাপতিটির খোলস কিছুটা কেটে দিলেন। ছিদ্রটি আরও বড় হয়ে গেলো। মুহূর্তেই প্রজাপতিটি বেরিয়ে গেলো। কিন্তু হায়, শুষ্ক শরীর এবং স্বাভাবিকের চেয়ে ছোটো ও কুঞ্চিত ডানা নিয়ে জন্ম নিলো প্রজাপতিটি। লোকটি এরপর অনেকক্ষণ প্রজাপতিটির দিকে তাকিয়ে থাকলো এই ভেবে যে- নিশ্চয়ই যেকোনো মুহূর্তে প্রজাপতিটি তার ডানা মেলবে, ডানা দু’টি বড় হবে ও তা প্রসারিত করে দিয়ে পুরো শরীরকে শক্তি যোগাবে। এককথায় প্রজাপতিটি ওড়ার জন্য দারুণভাবে দৃঢ় হয়ে উঠবে- এই আশায় লোকটি তাকিয়ে রইলো বহুক্ষণ।
অথচ এর কিছুই হয়নি। বরং, প্রজাপতিটি তার অবশিষ্ট জীবনটুকু এভাবেই শুষ্ক শরীর ও কুঞ্চিত ডানা নিয়ে ওই জায়গার আশে-পাশেই কাটিয়ে দিলো। আর কখনোই ওড়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারলো না। প্রকৃতপক্ষে- লোকটি প্রজাপতিটি দেখে এতো বেশি দয়া ও মঙ্গলকামনায় আসক্ত হয়ে পড়ছিলো যে- তিনি বুঝতেই পারেননি- ওই ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে বেরোনোটাই ছিলো প্রকৃতির নিয়ম। এবং এভাবেই এটি তার বেঁচে থাকার জন্য পরিপক্বতা (ম্যাচুরিটি) লাভ করতো। ওই ছিদ্র দিয়ে বেরোনোর শক্তি বা দক্ষতা অর্জন করা তার ভবিষ্যতের জন্য জরুরি ছিলো। কেননা, এটাই একমাত্র পথ- যার মাধ্যমে প্রজাপতিটির শরীর থেকে একধরনের বিশেষ তরল গিয়ে এর ডানায় স্থানান্তরিত হতো যা দিয়ে এটি ওড়ার সক্ষমতা অর্জন করতো। শরীরও তার শুষ্ক থাকতো না। কিন্তু এর কিছুই ঘটেনি প্রজাপতিটির সাথে। কারণ, সময়ের আগেই, প্রয়োজনীয় সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই এটি পৃথিবীর আলোয় চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলো।
আবারো তবে প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমার কন্যা সন্তানের বয়স এখন প্রায় তিনবছর। এই বয়সে সে যতোবার গ্রামের বাড়ি গেছে- ততোবারই সে অসুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু শহরের বাসার পরিবেশে সে এতো দ্রুত অসুস্থ হয় না। আচ্ছা, প্রতিকূল পরিবেশে সে কি সহজে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না? আমি জানি না, প্রজাপতির এই গল্পের সঙ্গে আমার কন্যাসন্তান জন্মানোর কোনো মিল আছে কিনা? মিল থাকুক- সেটা আমি ঘুণাক্ষরেও চাই না। জানি না, ওই রাতেই সিজারিয়ান ডেলিভারিতে না গেলে কোনো বিপদ হতো কি না! শুধু জানি- প্রাইভেট কারের এসি’র বাতাস সরাসরি কিছুক্ষণ আমার কন্যার গায়ে লাগলে, বৃষ্টির কয়েকফোটা পানি তার উপর পড়লেই বা একটু বেশি ঘামলেই কিংবা বাথরুমে ঢুকে পানি দিয়ে একটু বেশি সময় ধরে নাড়াচাড়া করলেই সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে- শহরে শিশুজন্মানোর ক্ষেত্রে সিজারিয়ান ডেলিভারি এতো বাড়ছে কেনো? কিন্তু, এই প্রশ্ন করবো কাকে? কে দেবে উত্তর??

x