গল্পটা এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা রাঙামাটির রোকেয়ার

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ
126

 

আমি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হই তাঁর লেখা থেকে। আমি বিশ্বাস করিনাটক, গান, নাচ তথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের ভিতরগত পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আর তাই পাহাড়ের সাধারণ মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও একটি সাংস্কৃতিক দল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে আমার।’

স্বপ্নের শুরুটার কথাই বলি। ১৯৭১ সাল। তখন তিনি ১০ম শ্রেণির ছাত্রী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একঝাঁক তরুণকে নানাভাবে সহায়তা প্রদান করেন। বলতে গেলেতখন থেকেই বঙ্গবন্ধু তাঁর কাছে এক বিস্ময়কর নেতার নাম। অনুপ্রেরণা ও আদর্শের উৎস। ভাবতে লাগলেনকী করে তাঁর সান্নিধ্যে থেকে কাজ করা যায়। কিন্তু, আটপৌরে নারী জীবন…! চাইলেই কী সহজে সবকিছু হয়? পাওয়া যায়? করা যায়? বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই হঠাৎ বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। প্রচলিত স্বাভাবিক নিয়মেই সন্তান লালনপালনের গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। উপরন্তু, সরকারি চাকরিতে যুক্ত হওয়ায় সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করা আর হয়ে ওঠলো না। মেনে নিলেন বাস্তবতা। কিন্তু, মনে রয়ে গেলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মানুষের জন্য কিছু করার বাসনা।

তাঁর কথায়– ‘১৯৮৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সরকারি চাকরির পাশাপাশি সবসময় ভিতরেভিতরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে মানুষকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছি। ২০১৬ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসরগ্রহণের সঙ্গেসঙ্গে কালবিলম্ব না করে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ শুরু করি। একের পর এক সভা, সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মেয়েদের মাঝে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে জেলায় প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নিজহাতে গড়া সহযোগী সংগঠন যুব মহিলা লীগের জেলাশাখার যাত্রা শুরু হয়। সেখানে আমাকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করেন বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল ও জেলার নেতারা। তাঁরই নির্দেশে ও সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে মাত্র সাড়ে তিনমাসের মধ্যে জেলার ১০টি উপজেলায় যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে সে সময়টা ছিল বেশ অস্থিতিশীল। আওয়ামী নেতাকর্মীদের ওপর একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছিল। তখন এই বিরূপ পরিস্থিতিতে আমি এক মুহূর্তও থেমে থাকিনি।’

এতোক্ষণ যাঁর কথা বলছিলাম, তিনি আর কেউ নন। রোকেয়া আখতার। নিজের সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই ২০১৮ সালের এপ্রিলে সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁকে রাঙামাটি জেলার যুব মহিলা লীগের সভাপতির পদে নির্বাচিত করা হয়। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার দায় আরও বেড়ে যায়। প্রস্তুতি নিতে থাকি জেলার সাধারণ মানুষের বিশেষ করে নারীদের আস্থা অর্জনের। রাঙামাটির ১০ উপজেলায় জনসংযোগ তৈরি করতে আমি নানাধরনের ঝুঁকি সত্ত্বেও নিরলসভাবে কাজ করি। ফলে, তৈরি হয় আমার বিশাল কর্মীবাহিনী। বিশেষ করেজেলায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেড়ে যায় আশাতীতভাবে।

নারীর ক্ষমতায়নের এই সময়ে এসে রোকেয়া আখতারের এই এগিয়ে চলার পথটি একদমই মসৃণ ছিলো না। কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন রোকেয়া আখতার। টানা ৩৫ বছর। ওই পেশাতেও সফল ছিলেন তিনি। একাগ্রচিত্তে প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করেছেন জ্ঞানের আলো। রাজনীতির মাঠেও নিজের অবস্থানকে পোক্ত করেছেন ধীরেধীরে।

সবমিলিয়েইস্বপ্ন তাঁর অনেক বড়। দৃষ্টি তাঁর সামনের দিকে। স্বামীর স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমার স্বামী প্রয়াত আ ব ম আব্দুর রব ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীরসেনানী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ শেষে ৯নং সেক্টরের অধীনে থানা কমান্ডার হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে আমি’ বইটি প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। তিনি রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সদস্যও ছিলেন।”

রোকেয়া আখতার ইতোমধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মহিলা ও শিশু অধিদপ্তর থেকে জেলা শ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মাননা অর্জন করেন। ২০০৪ সালে জেলার ডেপুটি প্রোগ্রাম চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ কাবশিক্ষক নির্বাচিত হন। বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণও প্রদান করেন। তাঁর লেখা ও পরিচালনায় জারি গান পরিবেশন করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিভাগীয় পর্যায়েও বেশকিছু পুরস্কার অর্জন করে। তাঁর গান নিয়মিতভাবেই বাংলাদেশ বেতার, রাঙামাটি কেন্দ্রে প্রচারিত হয়।

তিনি বলেন– ‘বেগম রোকেয়াকে আমি যখন পড়ি তখন শুধু ভাবিকী যুদ্ধটাই না তিনি করে গেছেন নারীজাতির মুক্তির জন্য, কল্যাণের জন্য। আমি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হই তাঁর লেখা থেকে। আমি বিশ্বাস করিনাটক, গান, নাচ তথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের ভিতরগত পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আর তাই পাহাড়ের সাধারণ মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও একটি সাংস্কৃতিক দল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে আমার।’

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে রোকেয়া আখতার চান সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে সাংসদ হতে। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাবে কিনা জানি না, তবে এটা জানি যেমানুষের জন্য কিছু করার বাসনাই হচ্ছে বড় ইবাদত। এতে তিনি নিশ্চয়ই পিছপা হবেন না।

- Advertistment -