গর্ভকালীন ঝুঁকি : রক্তস্বল্পতা

হোমিও বীক্ষণ

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
129

মানব দেহের রক্তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে হিমোগ্লোবিন। রক্তে এই হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে তাকে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া বলে। আয়রন বা লৌহ রক্তে হিমোগ্লোবিনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে। আমাদের দেশের অনেক মহিলাই শরীরে আয়রনের অভাবজনিত কারণে রক্তস্বল্পতায় ভুগে থাকেন। এর কারণ হিসেবে মহিলাদের প্রতি সামাজিক বৈষম্যমূলক আচরণ, খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে অজ্ঞতা, বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু করে সমগ্র প্রজননকালে প্রতিমাসে একবার করে ঋতুবতি হওয়ার ফলে শরীর থেকে রক্তক্ষরণ, কৃমির সংক্রমণ প্রভৃতিকে দায়ী করা যেতে পারে।
কখন আয়রনের চাহিদা বেশি প্রয়োজন : গর্ভকালীন মহিলাদের শরীরে আয়রনের চাহিদা বেড়ে যায়। গর্ভবতী মা এবং গর্ভজাত বাচ্চার চাহিদা মেটাতে এই সময় স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুন বা তিনগুণ আয়রন প্রয়োজন হয়। গর্ভকালীন এই বাড়তি চাহিদা আগে থেকে বিদ্যমান রক্তস্বল্পতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ৭ গ্রাম/ডেসিলিটার-এর নিচে না আসলে সাধারণত কোনো প্রকার অসুবিধা বোধ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ না থাকলেও রক্ত পরীক্ষা করালে রক্তস্বল্পতা ধরা পড়তে পারে।
গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতার কারণ : রক্তস্বল্পতাজনিত কারণে গর্ভবতী মহিলা প্রায় সব সময়ই ক্লান্ত এবং দুর্বলতা বোধ করেন। * অবসন্নতা * মাথা ঝিমঝিম করা * বুক ধড়ফড় করা * অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা * শ্বাসকষ্ট হওয়া কিংবা হাত-পায়ে পানি আসা, পা ফোলে যাওয়া মারাত্মক রক্তস্বল্পতার লক্ষণ। * এই সময় চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যায়। * হাত-পায়ের তালু, জিহ্বা, দাঁতের মাড়ি এবং চোখের নিচের পাতার ভেতরের দিকে এই ফ্যাকাশেভাব পরিলক্ষিত হয়।
অন্য রোগের পূর্বাভাস : যখন রক্তস্বল্পতা অন্য জটিল রোগের পূর্বাভাস হিসেবে ধরা পড়ে তখন তাকে বলা হয় সেকেন্ডারি অ্যানিমিয়া। ক্রমশ পরীক্ষায় ধরা পড়ে লক্ষণ রক্তস্বল্পতা হলেও রোগটির উৎস অন্যত্র। সেকেন্ডারি অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে রেনাল ফেলিওর, শরীরের কোনও অংশে ক্যানসার, টিউবার কিউলোসিস, এইডস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, সিস্টেমিক লুপাস, আলসারেটিভ কোলাইটিস, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি রোগের উপসর্গ রূপে।
রোগ নির্ণয় : গর্ভকালীন এই জাতীয় উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো রক্তের রেটিকিউলোসাইট কাউন্ট ও ব্লাড সেলের সাইজ-শেপ পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তস্বল্পতার মাত্রা নির্ণয় করা উচিত। প্রয়োজনে এই পরীক্ষা একাধিকবার করা লাগতে পারে। এছাড়া অন্য কোন পরীক্ষার প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে করতে হবে। রক্তস্বল্পতা নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা না করালে গর্ভকালীন তা বেড়ে যায়।
গর্ভকালীন জটিলতা : অধিক মাত্রায় রক্তস্বল্পতা হার্ট ফেইলুর, গর্ভপাত কিংবা নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসবের মতো মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত মহিলাদের বিভিন্ন প্রকার জীবাণু সংক্রমণের আকাংখা থাকে এবং তারা প্রায়ই রোগাক্রান্ত হন। তাছাড়া রক্তস্বল্পতা প্রসবের সময় বা প্রসবের পরে অতিমাত্রায় রক্তপাতের ঝুঁকিও বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। উপরোক্ত জটিলতার কথা মাথায় রেখে রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত একজন মহিলার সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত গর্ভধারণ করা উচিত নয়।
গর্ভকালীন রোগীর খাওয়া-দাওয়া : গর্ভকালীন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার এবং আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। প্রচুর পরিমাণে রঙিন শাকসবজি (যেমন- কচুশাক, ডাঁটাশাক, লালশাক, মোচা, থোড়, ডুমুর) ও ফলমূল, দুধ, মাছ, মাংস, কলিজা, ডিম প্রভৃতি লৌহসমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তস্বল্পতা দূর হয়। এছাড়া ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার যেমন- আমলকি, লেবু, জামবুরা, আমড়া, আনারস, পেয়ারা ইত্যাদিও খেতে হবে। এতে শরীরে আয়রন বা লৌহের শোষণ ভালোমতো হয়। দুই গর্ভধারণের মাঝে কয়েক বছর সময় নিলেও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
গর্ভাবস্থায় শিশুর ওজন বৃদ্ধি না হওয়ার কারণ : * শিশু ও কিশোরী বয়সে দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তস্বল্পতায় ভোগা। * কিশোরী বা অল্প বয়সে গর্ভধারণ করা। * ঘন ঘন সন্তান ধারণ করা। * গর্ভাবস্থায় কম খাদ্য গ্রহণ ও সুষম খাদ্য গ্রহণ না করা। * গর্ভকালীন সময়ে রক্তস্বল্পতায় ভোগা। * বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ ও কৃমিতে আক্রান্ত হওয়া। * শারীরিক পরিশ্রম বেশি করা ও মানসিক উদ্বেগ থাকা। * খাদ্য সংক্রান্ত কুসংস্কার ও পরিবারে অসম খাদ্য বন্টন।
গর্ভকালীন পরিচর্যা ও প্রসূতি মায়ের পুষ্টি : মনে রাখতে হবে প্রসবোত্তর সেবা মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি অপরিহার্য অংশ। প্রসবের পর থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কে ‘প্রসবোত্তর কাল’ বলা হয়। এই সময় মায়ের বিশেষ সেবা প্রয়োজন। কারণ এই সময় শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের শরীরের ক্ষয় হয়। শিশুর বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান মায়ের দুধে বিদ্যমান। যা শিশু মায়ের কাছ থেকে পেয়ে থাকে। এই জন্য এই অবস্থায় মায়ের শরীর সুস্থ রাখার জন্য সব ধরনের পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার এবং বাড়তি যত্নের প্রয়োজন। একজন সুস্থ মহিলা গর্ভবতী হলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত (অন্ততঃ গর্ভকালের শেষ তিন মাস এবং প্রসব পরবর্তী এক মাস) আয়রণ এবং ফলিক এসিড জাতীয় ওষুধ খেতে হবে। এই ওষুধ খাওয়ার গুরুত্ব যাতে গর্ভবতী মহিলারা অনুধাবন করতে পারেন তজন্য চিকিৎসকদের উচিত হবে যত্নসহকারে এবং বিস্তারিতভাবে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তাদের বুঝিয়ে বলা। পেটব্যথা, কোষ্ঠ কাঠিন্য বা বুকজ্বলা হলে বেশি পরিমাণে পানি ও শাকসবজি খেতে হবে। মনে রাখতে হবে পুষ্টিগত কারণে সে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় অল্প খরচে, একটু স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে আয়রন সমৃদ্ধ দেশীয় খাবার গ্রহণ করলে তা সহজেই প্রতিরোধযোগ্য।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতা থেকে মুক্তি পাবার জন্য হোমিওপ্যাথিতে যথেষ্ট কার্যকর ওষুধ আছে। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগে এই রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। যথা- (১) ক্যালকেরিয়া ফস, (২) ক্যালকেরিয়া কার্ব, (৩) ফেরাম সেট, (৪) ফেরাম মিউর, (৫) পালসেটিলা, (৬) নেট্রাম মিউর, (৭) ম্যাঙ্গেনাম, (৮) চিনিনাম আর্স, (৯) কার্বোভেজ, (১০) এন্টিম ক্রুড, (১১) এসিড পিক, (১২) ফসফরাস, (১৩) আয়োডিয়াম, (১৪) হেলোনিয়াস, (১৫) আর্সেনিক আয়োড, (১৬) আর্জেন্ট নাইট্রিকাম, (১৭) চায়না, (১৮) আলফা, (১৯) নাঙভমিকা, (১৯) সালফারসহ আরো উল্লেখযোগ্য ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x