গর্ভকালীন ঝুঁকি ডায়াবেটিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ৪ মে, ২০১৯ at ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ
36

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় বাংলাদেশে। অঞ্চলভেদে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার ৬ থেকে ৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে সম্ভবত তা ২০ শতাংশের ওপরে। তাই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। সন্তান গর্ভধারণ যেকোনো নারীর জন্য বড় ঘটনা। এটি এক ধরনের মানসিক চাপও। এ সময় মায়ের স্বাভাবিক দৈনিক মিথস্ক্রিয়া, হরমোনের পরিমাণ ও এ সাপেক্ষে জৈবিক উদ্দীপনার মাত্রা এবং এটির গভীরতার তারতম্য হয়।
ডায়াবেটিস কিভাবে সংগঠিত হয়

আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন যে, কক্সেকি বি-৪ নামে এক ধরনের ভাইরাসকে মূলতঃ এর জন্য দায়ী। এরা দেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ইনসুলিন উৎপাদনকারী অগ্ন্যাশয়স্থ কোষ সমূহকে আক্রমণ করে। অতি সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেল বিজ্ঞান সাময়িকীতে জেনেভার বাণার্ড কনরাড ও বাণার্ড ম্যাস এর নেতৃত্বাধীন গবেষক দলের প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে তাঁরা জানান যে, এই ভাইরাস মানবদেহে লুক্কায়িত অবস্থায় সুপারটিজেন নামক এক ধরনের অনুপদার্থ তৈরি করে। সুপারটিজেন নামক এই তরল পদার্থটি মানবদেহের রক্ষা ব্যবস্থার মূল অঙ্গ লিম্ফোসাইটকে অত্যধিক তৎপর করে তোলে। এগুলো তখন অগ্ন্যাশয়ে ইনসুলিন উৎপাদক বিটা কোষকে আক্রমণ করে বসে। ফলে ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং রক্তে ইনসুলিনের অভাব দেখা দেয়। যার ফলে ডায়াবেটিস রোগের সূত্রপাত হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

যদি আপনি স্বাভাবিকের চাইতে বেশি মোটা হয়ে থাকেন। অতীতে যদি আপনি ৪-৫ কেজির বেশি ওজনের বাচ্চা প্রসব করে থাকেন। যদি আগের কোনো গর্ভাবস্থায় আপনার ডায়াবেটিস দেখা দিয়ে থাকে, আপনার বাবা-মা, ভাইবোন কারো যদি ডায়াবেটিস থেকে থাকে, জাতিগতভাবে কিছু কিছু মানুষের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। যেমন- দক্ষিণ এশিয়া (বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত), ক্যারাবিয়ান, মধ্য-পূর্ব এশিয়া (আরব, পারশিয়ান, তুর্কি) এসব অঞ্চলের জনগোষ্ঠী।
গর্ভধারণের পূর্বে মানসিক প্রস্তুতি

ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীর গর্ভধারণের প্রস্তুতি কমপক্ষে তিন মাস আগে শুরু করা জরুরী। সন্তান ধারণের পরিকল্পনার সময়ই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রত্যেক মা এবং তার পরিবারের সবার বিস্তারিত ও সঠিকভাবে জেনে নেয়া উচিত যে, কীভাবে ডায়াবেটিস ও গর্ভধারণ একে অপরকে প্রভাবিত করে। কী কী জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে এবং তা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় কী।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ

গর্ভবতীর রক্তে গ্লুকোজ পরিমাণের জন্য যে বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করা হয়, তার নাম ওজিটিটি (গ্লুকোজ-টলারেন্স টেস্ট)। এতে প্রথমে খালি পেটে গর্ভবতীর রক্ত ও মূত্র নিয়ে গ্লুকোজের পরিমাণ দেখা হয়। এরপর ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ ২০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পান করার (৫ মিনিট ধরে) ১ ঘন্টা পর এবং ২ ঘন্টা পর আবার রক্ত ও মূত্র নিয়ে তাতে গ্লুকোজের পরিমাণ দেখা হয়। খালি পেটে সারাত রাত (কমপক্ষে ৮ ঘন্টা না খেয়ে থাকার পর) রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক পরিমান ৩.৫ থেকে ৫.০ মিলিমোল বা লিটার, ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ ২০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ মিনিট ধরে খাবার ১ ঘন্টা পর রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক পরিমাণ হবে ১০.০ মিলিমোন বা লিটারের কম এবং ২ ঘন্টা পর ৮.৫ মিলিমোল বা লিটারের কম হওয়া বাঞ্ছনীয়। গর্ভবতীর রক্তে ৩টির কোনো একটি ক্ষেত্রে যদি গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকে, তা হলে তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (জিডিএম) বলা হবে। গর্ভবতীর ক্ষেত্রে গ্লুকোজ অসহিষ্ণুতা বলে কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে শুধু ডায়াবেটিস আছে কিনা নেই, বিভাজনটি এরূপ।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সফল ব্যবস্থাপনা যেসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে তা হলো- বিচক্ষণ পরিকল্পনা। এক্ষেত্রে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারী, তার পরিবার ও সেবাদান কারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন জরুরী। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে নিয়মিত বাড়িতেই গ্লুকোমিটারে রক্তের গ্লুকোজ পরিমান করা জরুরি। যাদের ওষুধ ছাড়াই শুধু খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও শারীরিক শ্রমের মাধ্যমে রক্তের গ্লুকোজ কাঙিক্ষত মাত্রায় রাখা সম্ভব হয়েছে, তারা দিনে ৪ বার বা ক্ষেত্র বিশেষে ৬ বার রক্তের গ্লুকোজ মাপবেন। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন ব্যবহার করতে যাচ্ছে, তাদের সপ্তাহে ২ বা ৩ দিন ৬ বার করে (প্রতিবার খাদ্য গ্রহণের আগে ও ২ ঘন্টা পরে) রক্তের গ্লুকোজ পরিমাপ করে লিপিবদ্ধ করতে হবে। এখন পর্যন্ত রক্তে গ্লুকোজের পরিমান খালি পেটে বা আহারের আগে ৫.২ মিলিমোল বা লিটার এবং খাদ্য গ্রহণের ২ ঘন্টা পরে ৬.৬ মিলিমোল বা লিটার লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধার্য করা আছে।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস

সন্তান ধারনের আগে থেকেই শর্করা নিয়ন্ত্রণে সুষম কিন্তু পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের সাহায্য নিন। গর্ভধারণ পরিকল্পনা শুরু থেকে গর্ভকালীন ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন ৫ মিলিগ্রাম ফলিত এসিড জাতীয় ওষুধ ও আয়রন জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করুন, যা শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা প্রতিরোধে উপকারী। রক্তশূন্যতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

গর্ভকালীন বিভিন্ন জটিলতা এড়াতে সঠিক ওজনে আসুন। যাদের বিএমআই ২৭ বা তার বেশি, তাদের ওজন কমানো জরুরি।
ব্লাড সুগার কন্ট্রোলে রাখুন

বাড়িতে নিয়মিত খাওয়ার আগে ও দুই ঘন্টা পর রক্তের শর্করা মাপুন এবং এগুলো যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫ এবং ৮ দশমিক ৫-এর নিচে রাখুন। গড় এইচবিএ১সি ৬ দশমিক ৫-এর নিচে অর্জন করুন।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের জটিলতা

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস জনিত বিভিন্ন জটিলতা যেমন- রেটিনা-কিডনি-স্নায়ু-রক্তনালির রোগ গর্ভকালীন সময়কে আরও জটিল থেকে জটিলতর করে তুলতে পারে। যাদের রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রিত নয়, তাদের মধ্যে বিভিন্ন গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি বেশি। যেমন- গর্ভপাত, প্রি-একলাম্পসিয়া, মেয়াদের আগেই প্রসব ইত্যাদি। মায়ের রক্তে উচ্চ শর্করা গর্ভের শিশুর বিভিন্ন ক্ষতি ঘটাতে পারে। যেমন- গর্ভে মৃত্যু, বিকলাঙ্গতা, স্থুলতা, প্রসবকালীন বিভিন্ন আঘাত ইত্যাদি।
যখন গর্ভধারণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ

কিডনির জটিলতা অর্থাৎ রক্তে ক্রিয়েটিনিন ২ মিলিগ্রাম বা তার বেশি, সিসিআর ৪৫ মিলি/মিনিটের কম, প্রস্রাবে আমিষের পরিমান দিনে ২ গ্রাম বা তার বেশি, রেটিনার জটিলতার সর্বোচ্চ পর্যায়, রক্তনালিজণিত হৃদরোগ, রক্তের এইচবিএ১সি ১০ শতাংশ বা তার বেশি- এসব ক্ষেত্রে গর্ভধারণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান

গর্ভকালীন ঝুঁকি ডায়াবেটিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে ফলদায়ক ওষুধ আছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহারে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যথা- ১. এসেটিক এসিড, ২. আর্জেন্ট মেট, ৩. ক্যালকেরিয়া, ৪. সিজিজিয়াম, ৫. কষ্টিকাম, ৬. জিমনেমা সিলবেস্টার, ৭. ল্যাকটিক এসিড, ৮. নেট্রাম সালফ, ৯. সিকেলি, ১০. ইউরেনিয়াম নাইট্রিকাম, ১১. এসিড ফস, ১২. আর্ণিকা, ১৩. ফসফরাস, ১৪. নেট্রাম মিউর, ১৫. লাইকোপোডিয়াম, ১৬. ম্যাগ্নেসিয়া সালফ, ১৭. লাইকোপাস ভার্জিনিকা, ১৮. ল্যাকটিক এসিড, ১৯. কুরারী, ২০. থুজা, ২১. নাঙভমিকা উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x