গরু দিয়ে ধান মাড়াই এখন আর দেখা যায় না

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
100

আধুনিক সভ্যতার প্রচলনে সীতাকুণ্ডে বিলুপ্তির পথে এক সময়কার গ্রামবাংলার ঐহিত্য গরু দিয়ে ধান মাড়াই। কৃষিক্ষেত্রে আধুনিকতার প্রচলনে এখন ধান বপন, রোপণ, ধান কাটা, মাড়াই করা এমনকি ধান থেকে চাল করা নেওয়াসহ প্রত্যেকটা কাজই সম্পন্ন হচ্ছে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার দ্বারা। গরু আর লাঙ্গল টানা সেই জরাজীর্ণ কৃষককে এখন আর দেখা যায় না। এতে কৃষকরা হালের গরু ছেড়ে চাষাবাদসহ সকল কৃষিকাজে এখন সাহায্য নেয় ট্রাক্টরের পাশাপাশি সকল আধুনিক যন্ত্রের।
জানা যায়, রূপ, রং আর ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। শষ্যের শ্যামলতা ভাটিয়ালী সুরের গান, রাখালের বাঁশি, কৃষাণের উদার জমিন, কৃষাণীর ধান ভানার উল্ল্লাস, ছয় রূপের ছয়টি ঋতু সব মিলিয়ে এ যেন কোনো শিল্পীর নিপুণ হাতে রং তুলিতে আঁকা স্বপ্নের দেশ। এদেশে সন্ধ্যা-সকালে ডাহুক, দোয়েল, কোয়েলের ডাকে ঘুম ভাঙত। প্রকৃতির পালাবদলে প্রতিবছর ফিরে আসতো ছয়টি ঋতু। ঋতু চক্রের ঘূর্ণায়মান রূপকালে যখন হেমন্তের আগমন ঘটতো তখন গ্রাম বাংলার কৃষকরা ধান কাটার উৎসবে মেতে উঠতো। কৃষকরা দিনে ধান কাটা ও বাড়িতে আনার পর সন্ধ্যার আধাঁরে মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠতো। এতো কর্ম ব্যস্ততার মাঝেও কৃষক, কৃষানির মুখে হাসির বলিরেখা ফুটে উঠত। ধান মাড়াইয়ের পর গ্রাম বাংলার প্রতিটি কৃষক পরিবার মেতে উঠতো নবান্ন উৎসবে। নতুন চালের ভাত, পিঠা-পুলি, আর পায়েসের গন্ধ ভেসে আসতো প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে।
মো.আমিন, জহিরুল ইসলাম, মো.এরশাদ ও মোশারফ হোসেনসহ সীতাকুণ্ডের বেশকয়েকজন কৃষক অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন,এক সময়ে ধান কাটার পর প্রতিটি গ্রামে রাতভর চলতো হালের গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের কাজ। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রচলনে কৃষিতে পুরানো এসব পদ্ধতি নেই বললেই চলে। এখন উন্নত মানের পাওয়ার টিলারের সাহায্যে পাঁচ মিনিটেই জমি প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে। আগের মত চাষাবাদে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা না করে পাম্পের সাহায্যে সেচ কাজ করে পানির চাহিদা মিটানো হচ্ছে। প্রতিনিয়তই নিত্যনতুন সব কীটনাশক বাজারে আসছে। এখন আর কৃষককে রৌদ্র বৃষ্টিতে ভিজে ধানের বীজ তার শষ্যক্ষেতে ছিটিয়ে দিতে হয় না। জমিতে বীজ ছিটানোর জন্যে এখন আছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। ধানের পাতা পরীক্ষা করে এ জমির উপযোগী কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। ধানের আগাছা পরিষ্কার করার জন্যেও ব্যবহার হচ্ছে এক ধরনের দাঁতালো যন্ত্র। ধান কাটার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে ধান কাটার যন্ত্র। দিনব্যাপী চাষাকে আর গায়ের ঘাম ঝরিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে না। আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রচলনে ধান রোপণ, কাটার পর হালের গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। তবে আধুনিক সভ্যতার ভিড়ে পুরানো ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে অনেকটাই শখের বসে মাঝে মাঝে তারা হালের গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের কাজ করে বলে জানান।
লায়ন গিয়াস উদ্দিন বলেন, বিজ্ঞানের নিত্যনতুন অবিষ্কার ও আধুনিক সভ্যতার প্রচলন এই দুইয়ের সমন্বয় কৃষিতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তবে এটাও ঠিক বিজ্ঞানের এই নব নব আবিষ্কারের ভিড়ে আমরা হারাতে বসেছি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে, আমাদের স্বকীয়তা ও আমাদের সত্তাকে। আগামী প্রজন্মের কাছে এক সময়কার এসব ঐতিহ্যকে পরিচিত করতে চাষাবাদে আধুনিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি এসব পুরানো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার দরকার বলে মনে করেন তিনি।

x