গরিব রোগীর প্রদীপ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল

ম. মাহমুদুর রহমান শাওন

শনিবার , ৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১২ পূর্বাহ্ণ
1421

গত বছরের শেষের দিকের ঘটনা। চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর গ্রামের পশ্চিমপট্টি এলাকার দিন মজুর মোহাম্মদ ইব্রাহিমের দেড় বছরের শিশু মোহাম্মদ মিরাজ হোসেন। সর্দি জ্বরের পর হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে গেলে ওই শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে যাওয়ার কথা জানালে অসহায় হয়ে পড়েন ওই শিশুর হতদরিদ্র পিতা। উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায় যায়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩৫ হাজার টাকা বিল করলে দিনমজুর ছেলে আর চিকিৎসা না করিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এমন সময় স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে ওই শিশুর অসুস্থ হয়ে যাওয়ার খবর পাই। পরে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসতে বলি। হাসপাতালে আনার পর তাকে আইসিইউ’তে নেয়া হয়। দেয়া হয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা। হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের আন্তরিকতা এবং চিকিৎসক ও অন্যান্য স্টাফদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সুস্থ হয় শিশু মিরাজ। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে শিশু মিরাজ ফিরে গেছে গরীব পিতা-মাতার কোলে। এটি একটি খণ্ড চিত্র। এবাবে প্রতিদিনই বেসরকারি এ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে কিংবা নামমাত্র টাকা নিয়ে সেবা নেয় অসংখ্য রোগী। কিন্তু হাসপাতালের প্রচার বিমুখ পরিচালনা কমিটির কারণে প্রচারের আলো পড়ে না। মহান এ সেবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. এ এস এম ফজলুল করিমসহ চট্টগ্রামের কয়েকজন মানবতাবাদী। এক সময় কেবল বহির্বিভাগে সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও আজ ৩৯ বছরে এসে চিকিৎসক-কর্মচারী মিলে পনের শতাধিক ব্যক্তির কর্মমুখরতায় চিকিৎসাসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল।
স্বল্প খরচে সহজে চিকিৎসা সেবা পাওয়া একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বৃহত্তর চট্টগ্রামে এক সময় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা ছিল অপ্রতুল। বিশেষায়িত মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান এখানে বলতে গেলে তেমন ছিল না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা আন্দরকিল্লাস্থ জেনারেল হাসপাতাল এ দুইটি হাসপাতালের পক্ষে বৃহত্তর চট্টগ্রামের কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবা দেয়া দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিশু এবং মায়েদের জন্য চট্টগ্রামে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল ছিল না। আর এই প্রয়োজনীয়তা ও শূন্যস্থানটি পূরণ করলো চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল।
প্রসূতি মা ও নবজাতক শিশুদেরকে নানাবিধ রোগ নিরাময়ে বিশেষায়িত মা ও শিশু হাসপাতালটি কতো বড় ভূমিকা রাখছে এর একটি ছোট্ট বাস্তব ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। চট্টগ্রামে মাতৃমৃত্যু ঠেকাতে ও শিশু মৃত্যু রোধে এই হাসপাতালের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল জনসাধারণের অর্থঅনুকূলে পরিচালিত মানবসেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান। আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যে এর গোড়াপত্তন। অন্য দশটি বেসরকারি হাসপাতালের মতো এখানে বাণিজ্যিক বা লাভজনক কোনো ব্যাপার নেই। এখানে শুধু চিকিৎসার বিনিময়ে রোগীর কাছ থেকে খরচটুকুই নেয়া হয়। প্রকারান্তরে রোগীদের অসহায়ত্বের কথা ভেবে সর্বোচ্চ ছাড়ও দেওয়া হয়। হতদরিদ্রদের চিকিৎসায় হাসপাতালের একটি যাকাত ফান্ড আছে। নিতান্তই গরিব অসহায় রোগীদেরকে যাকাত ফান্ড থেকে বিনা খরচে চিকিৎসা সেবাসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে দেওয়ার মতো মহৎ কাজ উদ্যোগও রয়েছে এ হাসপাতালের। হাসপাতাল কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হতে পারে না, গরিবেরও চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অধিকার আছে-চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এই প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ৩৯ বছরে এই প্রতিষ্ঠানটি গরিব ও অসহায় মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার ঠিকানা হয়ে উঠেছে। স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসা সেবার মাধ্যমেও গরিব রোগীদের জন্য চিকিৎসা ব্যয়ের ছাড় দেয় এরকম কয়টি হাসপাতাল দেশে রয়েছে?
চট্টগ্রাম মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল ৬৫০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। হাসপাতালের বহির্বিভাগ ছাড়াও রয়েছে শিশু আইসিইউ, এনআইসিইউ, এডাল্ট আইসিইউ, সিসিইউ, কিডনী ডায়ালাইসিস, ইউরোলজি, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা ইউনিট, অটিজম ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র, ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, গ্যাস্ট্রোএন্টারলজি ইউনিট, শিশু কিডনি রোগী ইউনিট, থেলাসেমিয়া ইউনিট, অনকোলজি ইউনিট, এডাল্ট নিউরোলজি, শিশু কার্ড্‌িওলজি, ল্যাবরেটরী সার্ভিস, ব্লাড ব্যাংক। এক কথায় একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। শিশু রোগী ছাড়াও বর্তমানে সকল বয়সী রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। প্রায় ৯ হাজার আজীবন সদস্য হাসপাতালের যাবতীয় কার্যক্রম নিয়মিতভাবে বুলেটিনের মাধ্যমে অবহিত হয়ে থাকে এবং এ বুলেটিন নিয়মিতভাবে হাসপাতালের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামবাসীর স্বাস্থ্যসেবা আরো একধাপ এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ৮৫০ শয্যা বিশিষ্ট নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে ত্বরিত গতিতে। ১৪ তলা এ ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। ২০১৯ সালের মধ্যে নবনির্মিত ভবনে এ হাসপাতালের আউটডোর সেবা চালু করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল একটি বিশাল প্রকল্প। ৩৯ বছরে এগিয়েছে অনেক দূর। শুধু মা ও শিশু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রূপান্তরিত হয়েছে জেনারেল হাসপাতালে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠা করেছে ১১০ আসনের চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউট অব চাইল হেলথ, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং কলেজ (বিএসসি নার্সিং)।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের একটি বড় প্রকল্প হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান ইসি কমিটি। সমাজের বিত্তবান ও সমাজ হিতৈষীদের সহায়তায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেককে চেয়ারম্যান করে গঠন করা হয়েছে বাস্তবায়ন কমিটি।
বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. এ এস এম ফজলুল করিম, ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. তাহের খান, সৈয়দ মোরশেদ হোসেন, জেনারেল সেক্রেটারি ডা. আঞ্জুমান আরা ইসলাম, জয়েন্ট সেক্রেটারি ডা. আরিফুল আমিন, ট্রেজারার রেজাউল করিম আজাদ, ইসি মেম্বার ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ, ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ আবছার চৌধুরী, এস এম কুতুব উদ্দিন, পারভেজ ইকবাল শরীফ, খায়েস আহমেদ ভুইয়াসহ ২৩ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি মানবতার সেবায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের ত্যাগ ও অবদানে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এক বিশাল মহীরূহ হয়ে উঠেছে সেই সেইসব মানবব্রতী কীর্তিমান ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

- Advertistment -