গবেষণা ফেলোশিপঃ একটি প্রস্তাবনা

মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত

শনিবার , ৯ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
126

২০১২ সালের শুরুর দিকে তিনজন ছাত্র ‘এম ফিল’ ডিগ্রি প্রোগ্রামের জন্য আমার তত্ত্বাবধানে গবেষণা শুরু করেছিল। এই তিনজন ছাত্র দেশের ভিন্ন দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ‘বিএসসি অনার্স’ এবং ‘এমএসসি’ ডিগ্রি সম্পন্ন করে ‘এমফিল’ ডিগ্রি প্রোগ্রামে বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। তিনজনের মধ্যে দুইজন বেশ কয়েক বছর পূর্বে তাদের ‘এমএসসি’ সম্পন্ন করেছিল, শুধু একজন ছাত্র ‘এমএসসি’ ডিগ্রি শেষ করার পর পরই আমাদের বিভাগে ‘এমফিল’ প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিল। আমি সদ্য ‘পিএইচডি’ সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরত এসেছি, এই তিনজন ছাত্র নিয়ে গবেষণা শুরু করার জন্য পূর্ণ উদ্যমে প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বভাবতই আমার প্রত্যাশা ছিল তিনজন ছাত্রই সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে তাদের গবেষণা কর্ম সম্পন্ন করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, ঐ ছাত্রদের আমি বিভাগে পাই না বললেই চলে। আমিই তাদের মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে নিয়ে আসি, বিভিন্ন কাজের অগ্রগতি জিজ্ঞেস করি। একসময় এই তিনজন ছাত্রের দুইজনই লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। তৃতীয় জন দুই বছরের ডিগ্রি, প্রায় চার বছরে সম্পন্ন করেছিল। বিভাগের অন্য সহকর্মীদেরও প্রায় একই অভিজ্ঞতা, যারা ‘এম ফিল’ ডিগ্রি প্রোগ্রামে ভর্তি হয় তাদের বেশিরভাগই ডিগ্রি সম্পন্ন করে না, কয়েকজন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ডিগ্রি সম্পন্ন করে, কদাচিৎ দুই একজন নির্ধারিত সময়ে ‘এম ফিল’ ডিগ্রি অর্জন করে।
এ পরিস্থিতিতে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হয়েছিল। বুয়েটের একাডেমিক কাউন্সিল এবং সিন্ডিকেটের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে ২০১৪ সালের অক্টোবর সেমিস্টার থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং গণিত বিভাগে তিন সেমিস্টার মেয়াদী রিসার্চ বেইজড ‘এমএসসি’ ডিগ্রি প্রোগ্রামে আমরা ছাত্র ভর্তি করলাম। পাশকৃত অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী তিন সেমিস্টার মেয়াদী উক্ত ‘এমএসসি’ ডিগ্রির জন্য একজন ছাত্রকে সর্বমোট ৩৬ ক্রেডিট সম্পন্ন করতে হবে, যার মধ্যে ১৮ ক্রেডিট থিওরি কোর্স এবং বাকি ১৮ ক্রেডিট রিসার্চ। প্রথম সেমিস্টারে ১২ ক্রেডিট থিওরি কোর্স সম্পন্ন হলে বিভাগের ‘বোর্ড অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ’ এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কমিটি ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ’ এ ছাত্রের গবেষণা প্রস্তাবনা পেশ করতে হয়। উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উক্ত কমিটি সন্তুষ্ট হলেই ওই ছাত্রের গবেষণা প্রস্তাবনা অনুমোদিত হয় এবং পরবর্তীতে তা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করা হয়। গবেষণা প্রস্তাবনা অনুমোদিত হবার পরে একই কমিটি উক্ত ছাত্রের জন্য চার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি পরীক্ষা কমিটি পাশ করে। প্রত্যেক ছাত্রের জন্য গঠিত পরীক্ষা কমিটিতে একজন সদস্য বিভাগের বাইরে থেকে (সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে) বহিরাগত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্ট ছাত্র কোর্স ওয়ার্ক এবং ডিগ্রির জন্য অনুমোদিত গবেষণা কর্ম সম্পাদন করে থিসিস সাবমিট করে। অনুমোদিত পরীক্ষা বোর্ডের সদস্যবৃন্দ উক্ত থিসিস পরীক্ষা করেন। পরবর্তীতে পরীক্ষা বোর্ডের সদস্যবৃন্দের উপস্থিতিতে একটি মৌখিক পরীক্ষা হয় এবং সেখানে ছাত্র তার গবেষণা উপস্থাপন করে। পরীক্ষা বোর্ডের সকল সদস্য উক্ত ছাত্রের থিসিস এবং মৌখিক পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হলেই তাকে ডিগ্রি প্রদানের জন্য সুপারিশ করেন। এভাবেই একজন ছাত্র বিভাগ থেকে ‘এম এস সি’ ডিগ্রি লাভ করে। বুয়েটের প্রকৌশল এবং স্থাপত্য বিভাগ সমূহের ছাত্রদের ঠিক একইভাবে দীর্ঘদিন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়। আমার জানা মতে, দেশের অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক এই রকম ভাবে বিজ্ঞানের কোন ছাত্রকে ‘এমএসসি’ ডিগ্রি দেওয়া হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থিসিস গ্রুপের ছাত্ররা এক বছরের (দুই সেমিস্টার) ‘এমএসসি’ ডিগ্রি সম্পন্ন করে, যার একটি বড় অংশ থাকে কোর্স ওয়ার্ক, সাথে অল্প কিছু ক্রেডিটের একটি থিসিস । একটি কথা বলা উচিৎ, ক্রেডিট অল্প হলেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ‘এমএসসি’ লেভেলেই যথেষ্ট ভালো মানের থিসিস করে এবং পিয়ার রিভিউড ‘আইএসআই’ জার্নালে তাদের গবেষণা প্রকাশ করে।
২০১৪ সালের অক্টোবর সেমিস্টারে বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যে সকল ছাত্র দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছর মেয়াদী ‘বিএসসি অনার্স’ ডিগ্রি সম্পন্ন করে ‘এমএসসি’ ডিগ্রি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিল তার মধ্য থেকে তিনজন আমার তত্ত্বাবধানে গবেষণা শুরু করে। এই তিনজন ছাত্র সার্বক্ষণিক আমার ‘ন্যানোটেকনোলজি রিসার্চ ল্যাবরেটরি’তে কাজ করতো, গবেষণা ল্যাবের নানা ধরনের এঙপেরিমেন্টাল সেট আপ তৈরি থেকে শুরু করে সার্বিক উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতো। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় ছিল তিনজনের মধ্য থেকে দুইজন ঠিক তিন সেমিস্টার শেষেই ডিগ্রি লাভ করেছিল। একজনের নির্ধারিত সময় থেকে অল্প কিছু সময় বেশি লেগেছিল। পরবর্তী সেমিস্টারে যারা ভর্তি হয়েছিল তারাও প্রায় সবাই নির্ধারিত সময়ে তাদের ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিল। এইসব ছাত্ররা ‘এমএসসি’ থিসিসের জন্য সম্পাদিত গবেষণা থেকে মানসম্মত অনেকগুলো গবেষণাপত্র প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন পাবলিশারের জার্নাল, যেমন- আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স, ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স ইউকে, রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি, এলসেভিয়ার ইত্যাদিতে প্রকাশ করেছে। ভিন্ন আঙ্গিকে তিন সেমিস্টার মেয়াদী এই রিসার্চ বেইজড ‘এমএসসি’ ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালুর পর আমাদের বিভাগে গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা আমি লক্ষ্য করলাম। এই রকম একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের জন্য বুয়েটের একাডেমিক কাউন্সিল এবং সিন্ডিকেটের বিজ্ঞ সদস্যবৃন্দকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
প্রায় দুই যুগ পূর্বে আমাদের দেশে অনার্স ডিগ্রি প্রোগ্রাম ছিল তিন বছর মেয়াদী। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে উক্ত ডিগ্রি প্রোগ্রামকে চার বছর মেয়াদী করা হয়েছে। চার বছরের অনার্স ডিগ্রি এবং এক বছর কিংবা দেড় বছর মেয়াদী মাস্টার্স ডিগ্রি শেষে ‘এমফিল’ করা সার্বিক বিচারে অনর্থক। এই মুহূর্তে যা করা যেতে পারে তা হল, যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের (দুই সেমিস্টার) মাস্টার্স প্রোগ্রাম রয়েছে তা দেড় বছরে (তিন সেমিস্টার) উন্নীত করা। সকল অনুষদের সকল বিভাগে এক সাথে সম্ভব না হলে অন্তত বিজ্ঞান অনুষদ থেকে শুরু করা। মাস্টার্সে এখনকার মতো থিসিস এবং নন-থিসিস গ্রুপ থাকবে। তবে থিসিস গ্রুপের থিসিস ক্রেডিট যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। একজন ছাত্র যেন গবেষণার জন্য ভালো মানের একটি টেনিং মাস্টার্স লেভেলেই পেয়ে যায় তার জন্য উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশ এবং সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে বুয়েটের অর্ডিন্যান্স অনুসরণ করা যেতে পারে এবং প্রয়োজন মোতাবেক এটিকে আরো যুগোপযোগী করা যেতে পারে।
স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে তিন সেমিস্টারের রিসার্চ বেইজড মাস্টার্স ডিগ্রি চালু করে লাভ কী? আমার গত চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো। আমি যেসব ছাত্রদের নিয়ে কাজ করেছি তাদের অনেকেই ঢাকার বাইরের নতুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছরের অনার্স ডিগ্রি শেষ করে এসেছে। ‘ন্যানোটেকনোলজি রিসার্চ ল্যাবরেটরি’তে বছর খানেক নিবিড়ভাবে গবেষণা কর্ম করার পর এদের অনেকের মধ্যেই অভূতপূর্ব উন্নতি দেখেছি। কিছুদিন পূর্বে একজন ছাত্র আমার তত্ত্বাবধানে মাস্টার্স শেষ করলো। সে ঢাকার বাইরের নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে বুয়েটে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছিল । গত সপ্তাহে জানলাম সে বিখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পিএইচডি’ ডিগ্রি করার জন্য ফেলোশিপ পেয়েছে। একদম নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করা একজন ছাত্রী আমার তত্ত্বাবধানে মাস্টার্স করে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ নিয়ে পড়তে গেলো। আরও কয়েকজন দেশের বিভিন্ন পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছে এবং ফেলোশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে যাবার জন্য চেষ্টা করছে।
উল্লেখ্য যে, বুয়েটের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ প্রতি বছর বিশ্ব সেরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন ধরনের ফেলোশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমায়। এই বছর বুয়েটের একজন ছাত্রী জানালো সে ‘এমআইটি’, ‘স্ট্যানফোর্ড’ এবং ‘ইউসি বার্কলে’ র মতো তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ফুল ফান্ডসহ এডমিশন পেয়েছে। ইদানীং যারা বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে ফেলোশিপ পাচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই দেশে থাকাকালীন অবস্থায় ভালো মানের কিছু গবেষণা করেছে এবং ওই গবেষণা পত্র পিয়ার রিভিউড ‘আইএসআই’ জার্নালে পাবলিশ করে গবেষণায় তাদের পারদর্শিতা প্রমাণ করেছে। আমার ‘ন্যানোটেক রিসার্চ ল্যাবে’ বুয়েটের বিভিন্ন বিভাগের যে সকল ছাত্রছাত্রী এঙপেরিমেন্টাল গবেষণা করছে তাদের প্রায় সবাইকে দেখলাম বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ের একদম প্রথম দিকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে পুরো ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্টসহ এডমিশন পেয়েছে। গবেষণায় পূর্ব অভিজ্ঞতা ফান্ড পেতে বিশেষ সহায়ক ছিল বলেই তারা সবাই জানিয়েছে।
এখনকার যুগে গবেষণায় একদম নবিশ এমন কোন ছাত্রকে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান কিংবা অস্ট্রেলিয়ার কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও প্রফেসর বৃত্তিসহ ভর্তির জন্য ভর্তি কমিটিকে সুপারিশ করেন না। কারণটা খুব স্বাভাবিক। প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বিশ্বের কেউ চায় না গবেষণায় একদম নতুন একজন ছাত্রকে নিয়ে গবেষণার ‘এ বি সি ডি’ শেখাতে। বিশেষ করে চীন কিংবা ভারতের মতো দেশ থেকে যে সকল ছাত্র আবেদন করে তাদের গবেষণার পূর্ব অভিজ্ঞতা সত্যিকার অর্থে আমাদের বেশিরভাগ ছাত্রদের থেকে ভালো। তাই আমাদের দেশের যে সকল ছাত্রছাত্রী অনার্স কিংবা মাস্টার্স লেভেলে কিছু ভালো মানের গবেষণা করেছে তারাই খুব ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তিসহ ভর্তির জন্য বিবেচিত হয়। এই রকম ভাবে প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায় বড় জোর কয়েক শত ছাত্রছাত্রী। ষোল কোটি মানুষের এই দেশে কিছু বিশেষ বাস্তব পদক্ষেপ নিলে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তিসহ পড়তে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কয়েক শত থেকে অতি সহজেই কয়েক হাজারে উন্নীত করা যেতে পারে।
স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে, ওই পদক্ষেপগুলো কী কী? সমপ্রতি সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারলাম, দেশে ফেরত আসার শর্তে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার “প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ ২০১৯’’ ঘোষণা করেছে যার আওতায় সরকার থেকে মাস্টার্সের জন্য ৬০ লাখ টাকা ও পিএইচডির জন্য ২ কোটি টাকা দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভরনেন্স ইনোভেশন ইউনিটের “টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ” প্রকল্পের আওতায় উচ্চতর শিক্ষায় (মাস্টার্স এবং পিএইচডি) ‘প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ’ দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিকট থেকে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়েছে (দৈনিক আমাদের প্রতিদিন, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। মাস্টার্সের জন্য ৬০ লাখ টাকা ও পিএইচডির জন্য ২ কোটি, ফেলোশিপের এই অর্থের পরিমাণ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। সরকার উচ্চ শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। একইসাথে ফলপ্রসূ বিনিয়োগের লক্ষ্যে একজন অধ্যাপক এবং গবেষক হিসেবে প্রাসঙ্গিক কিছু প্রস্তাব তুলে ধরতে চাই।
আমার প্রথম প্রস্তাব হবে দেশে মাস্টার্স ডিগ্রি দেড় বছর (তিন সেমিস্টার) মেয়াদী করা। রিসার্চ বেইজড মাস্টার্স ডিগ্রির কোর্স ওয়ার্ক এবং থিসিসের লোড সমান করা। যারা রিসার্চ বেইজড (থিসিস গ্রুপ) মাস্টার্স ডিগ্রি করবে তাদেরকে অন্তত এক বছর বৃত্তি হিসেবে প্রতি মাসে বিশ হাজার টাকা দেওয়া। কয়জন ছাত্রকে এই বৃত্তি দেয়া হবে এটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বিভাগে কয়জন যোগ্য গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক রয়েছেন তার উপর। একটি কথা মনে রাখা উচিৎ কোন ছাত্রের তত্ত্বাবধায়ক গবেষণায় সক্রিয় না হলে ওই ছাত্রের পক্ষে মানসম্মত গবেষণা সম্পাদন অসম্ভব। ধরুন, কোন একটি বিভাগে পাঁচজন শিক্ষক সক্রিয়ভাবে গবেষণা করেন, তাহলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বিভাগে অন্তত দশজন শিক্ষার্থী পেতে পারে এই গবেষণা বৃত্তি।
আমি ‘পিএইচডি’ ডিগ্রি করেছি যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গবেষণার খরচ, টিউশন ফি ইত্যাদি ছাড়াও আমাকে প্রতি মাসে দেওয়া হতো প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা (১২৫০ পাউন্ড)। সাড়ে তিন বছর থাকা খাওয়ার জন্য বৃত্তি হিসেবে প্রাপ্ত টাকা হিসেব করলে দাঁড়ায় প্রায় সাতষট্টি লাখ টাকা। স্ত্রী, কন্যা নিয়ে গ্লাসগো শহরে বাস করেছি এবং ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফেরত আসার সময় কয়েক লক্ষ টাকা নিয়ে এসেছি (প্রসঙ্গক্রমে ব্যক্তিগত কথা বলার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী)। এইবার হিসেব করুন, মাস্টার্সের দশজন ছাত্রকে একবছর মাসে বিশ হাজার করে টাকা ফেলোশিপ দেওয়া হলে সর্বমোট খরচ হবে চব্বিশ লাখ টাকা। ওই দশজন ছাত্রের মধ্যে তিনজনও যদি মাস্টার্সে ভালো মানের গবেষণা করে বিদেশে ‘পিএইচডি’ ডিগ্রি অর্জন করতে বিদেশের বৃত্তি নিয়ে যায় তাহলে ওই তিনজন শুধু থাকা খাওয়ার খরচ হিসেবে পাবে কমপক্ষে এক কোটি আশি লাখ টাকা। ‘পিএইচডি’ কালীন অবস্থায় যদি পরিবারের সদস্যদের তাদের বৃত্তির টাকার ছোট একটি অংশ উপহার হিসেবেও পাঠায় তাহলে আমাদের সরকার যে দশজনকে মাস্টার্সে চব্বিশ লাখ টাকা বৃত্তি দিয়েছিলেন ওই টাকা দেশে ফেরত চলে আসবে। একই সাথে তিনজন ছাত্রের ‘পিএইচডি’ ডিগ্রিও হয়ে যাবে। তিনজনের মধ্যে একজন ছাত্রও যদি দেশে ফেরত আসে তাহলে সরকারের বেঁচে যাবে আরও দুই কোটি টাকা। অন্তত বিজ্ঞান এবং প্রকৌশলের বিভিন্ন বিষয়ে পৃথিবী ব্যাপী কোটি কোটি পাউন্ড/ ডলারের বৃত্তি রয়েছে, উপযুক্ত লোক আবেদন করলে বৃত্তি না পাবার সম্ভাবনা শূন্য। আর মাত্র কয়েক বছর পর আমরা মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি। অন্তত মাস্টার্স লেভেলের রিসার্চ করানোর, ভালো মানের মাস্টার্স ডিগ্রি করানোর মতো দক্ষ শিক্ষক, গবেষক এবং সর্বোপরি অবকাঠামো আমাদের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে নিঃসন্দেহে। আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন- ‘হেকেপ’ এর আওতায় কয়েক হাজার কোটি টাকা রিসার্চ গ্রান্ট প্রদান করা হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি যদি গবেষণার জন্য উপযুক্ত এবং আগ্রহী ছাত্র না পায়, তাহলে এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার জন্য?
অনেক বছর ধরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি প্রোগ্রামের ছাত্রদের ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ফেলোশিপে মাস্টার্সের একজন ছাত্রকে এক বছরের জন্য একসাথে চুয়ান্ন হাজার টাকা প্রদান করা হয়। আমার ছাত্রদের দেখেছি এই টাকা পায় মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ হওয়ার মুহূর্তে। পুরো সময়টি আর্থিক টানাপোড়েনের মাঝে বাস করে ডিগ্রি শেষ করার পর্যায়ে একসাথে এই ফেলোশিপের টাকা পায় বিধায় এই অর্থ গবেষণা কর্মে তেমন কোনও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের সাথে আলাপ করে নিশ্চিত হলাম যে গবেষণা চলাকালীন ফেলোশিপের টাকাটি না পাওয়াতে গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং যে উদ্দেশ্যে এই গবেষণা সহায়তা গ্রান্ট প্রদান করা হয় তা অপূর্ণ থেকে যায়।
আমার প্রস্তাব হচ্ছে এই বৃত্তি আরো সুপরিকল্পিতভাবে দেওয়া হোক। এক বছরের ফেলোশিপ একসাথে না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে মাস্টার্সের ছাত্রকে মাসে মাসে অন্তত বিশ হাজার করে টাকা ফেলোশিপ দেওয়া হোক। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে ফেলোশিপ না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে একটি সংস্থা থেকে দেওয়া হোক, অথবা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এই ফেলোশিপ দেওয়া হোক। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্রে ফেলোশিপ দেওয়ার জন্য কয়েকটি অনুমোদিত কমিটি রয়েছে। এই সকল কমিটি কয়েক মিনিটের একটি মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ফেলোশিপের জন্য গবেষকদের নাম প্রস্তাব করেন। আমি মনে করি, এইভাবে মৌখিক পরীক্ষা না নিয়ে অনার্সের ফলাফলের ভিত্তিতে মাস্টার্সের ফেলোশিপ দেওয়া উচিৎ। এতে করে একজন ছাত্র আগে থেকেই একটি সুস্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে এবং স্বভাবতই অনার্স লেভেলে ভালোভাবে পড়াশুনায় উৎসাহী হবে। রাজশাহী কিংবা চট্টগ্রাম থেকে একজন ছাত্রকে কয়েক মিনিটের একটি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকা আসতে হয়, ফেলোশিপ পেলে চেক নেওয়ার জন্য আবার ঢাকা আসতে হয়, এটি কতটা যুক্তিযুক্ত? আর ফেলোশিপ না পেলে একজন ছাত্রের আসা যাওয়া এবং ঢাকায় একদিন থাকা খাওয়ার খরচটুকু দয়া করে যেন একটু চিন্তা করি ! আমি মনে করি, যে সকল কমিটি ফেলোশিপের জন্য ছাত্র নির্বাচন করেন ওই একই কমিটি বিগত কয়েক বছরের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিভাগে কতটি ফেলোশিপ দেওয়া যেতে পারে তা প্রস্তাব করতে পারেন। অন্তত আগামী দুই বছর সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিভাগের কতজন ছাত্র মাস্টার্স লেভেলে ফেলোশিপ পেতে পারে তা নির্ধারণ করা খুব কঠিন কাজ নয়। দুই বছর পরে এই সংখ্যা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা যেতে পারে। এভাবেই আবেদনকারী গবেষকদের মধ্য থেকে অনার্সের ফলাফলের ভিত্তিতে মাস্টার্সের ফেলো নির্বাচন করা হবে। যারা মাস্টার্স লেভেলে গবেষণায় যথেষ্ট দক্ষতার স্বাক্ষর রাখবে তারা ‘মাস্টার্স লিডিং টু পিএইচডি’ ডিগ্রির জন্য বিবেচিত হবে। দেশ বিদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করে ‘পিএইচডি’ চলাকালীন অবস্থায় একজন ছাত্রকে মাসে অন্তত পঞ্চাশ হাজার টাকা দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
পরিশেষে, খুব অল্প কথায় আমার প্রস্তাবগুলি হচ্ছে: (ক) দেড় বছর মেয়াদী রিসার্চ বেইজড মাস্টার্স ডিগ্রি চালু করা হোক, (খ) ‘এম ফিল’ ডিগ্রি প্রোগ্রাম লিখিত ভাবে বিলুপ্ত সম্ভব না হলেও পুরোপুরি নিরুৎসাহিত করা হোক, (গ) মাস্টার্স লেভেলের একজন ছাত্রকে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কমপক্ষে এক বছর মাসে মাসে বিশ হাজার টাকা ফেলোশিপ দেওয়া হোক, (ঘ) ফেলোশিপ দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র অনার্সের ফলাফল বিবেচনা করা হোক, (ঙ) মাস্টার্স লেভেলে যারা গবেষণায় মেধা এবং দক্ষতার প্রমাণ দিবে তাদেরকে ‘মাস্টার্স লিডিং টু পিএইচডি’ ডিগ্রি করার সুযোগ দেওয়া হোক, (চ) ‘পিএইচডি’ চলাকালীন অবস্থায় একজন ছাত্রকে বছর শেষে সন্তোষজনক রিপোর্ট দিতে হবে এই শর্ত সাপেক্ষে অন্তত সাড়ে তিন বছর মাসে মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা ফেলোশিপ দেওয়া হোক।
আপনার সন্তান, আমার সন্তান, কিংবা তাহার সন্তান পড়াশুনা শেষ করে প্রশাসক, শিক্ষক, বিচারক, রাজনীতিবিদ কী হবে তা আমরা কেউ জানিনা। তবে যা নিশ্চিত করে জানি, তা হলো আমাদের সন্তানদের এই শতকের উপযোগী, পরিশ্রমী, দক্ষ, বুদ্ধিদীপ্ত মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ফেলোশিপ দেওয়ার নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে কার্যকরী এবং সময় উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য এতদ-সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি।

সৌজন্যে : বিডিনিউজ.

x