গণসংগীতের শিল্পী অশোক সেনগুপ্ত

আনন্দন প্রতিবেদক

বৃহস্পতিবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
18

‘যেখানে পাখির গানে সকাল আসে/ রাঙা সূর্য হাসে সবুজ ঘাসে/ আমি যেন বারবার জন্ম লভি সেই দেশে/ আমার বাংলাদেশে’, ‘জেগে ওঠো বাংলা একাত্তরের চেতনায়/ এবার অস্ত্র নয় জনযুদ্ধে আনব বিজয়/ দুর্বার একতায়/ জেগে ওঠো বাংলা/ জেগে ওঠো’, ‘তোরা যুদ্ধ অপরাধী/ তোরা মানবতাবিরোধী/ তোদের হবে না দেশে ঠাঁই/ তাই তো জেগেছে বিপ্লবী জনতা/ তোদের বিচার চাই’, ‘বাংলা মাগো সবুজ ঘাসের চাদর দিয়ো জাতির পিতার গায়/ পরম সুখে ঘুমিয়ে থাকুক টুঙ্গিপাড়ায়’। এরকম অনেক জনপ্রিয় গণসংগীতের শিল্পী অশোক সেনগুপ্ত। চট্টগ্রাম শুধু নয়, বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে অশোক সেনগুপ্ত খুব পরিচিত একটি নাম। বিভিন্ন গণআন্দোলনে গণসংগীত নিয়ে যাঁর দৃপ্ত পদচারণা ভাবিয়েছে, জাগিয়েছে সমাজের প্রতিটি শ্রেণিপেশার মানুষকে। অশোক সেনগুপ্তের জন্ম বোয়ালখালীর খিতাপচর গ্রামে ১৯৪৯ সালে। মা মৃণালিণী সেনগুপ্তা, বাবা যতীন্দ্রলাল সেনগুপ্ত। ১৩ বছর বয়সে তাঁর সংগীতজীবনের শুরু। বাংলাদেশ বেতারে আধুনিক গান আর বাংলাদেশ টেলিভিশনে নজরুলসংগীতে প্রথম শ্রেণির শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারে ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। গণসংগীতের শিক্ষক হিসেবেও ছিল তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি। অশোক সেনগুপ্ত চার শতাধিক গণসংগীত রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং তাতে কণ্ঠ দিয়েছেন।
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বন্ধুদের সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন বঙ্গশ্রী। স্বাধীনতা সংগ্রামের গানগুলো পরিবেশন করেছেন দেশের বিভিন্ন স্থানের গণমুখী অনুষ্ঠানগুলোতে। ৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী সামরিক শাসন আমলে ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা’র আওতায় তিন মাস সতের দিন দেশদ্রোহিতার মামলায় ডিটেনশনে আটক থেকে কারাভোগ করেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, চট্টলবীর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর উদ্যোগে গঠিত হয় আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠী, যার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অশোক সেনগুপ্ত। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে, গ্রামে-গঞ্জে গণসংগীত নিয়ে এই সংগঠন সাহসী ভূমিকা রাখে তাঁরই নেতৃত্বে। মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুলে পড়াকালীন বন্ধু হিসেবে সাথে পান শিল্পী প্রবাল চৌধুরী, গোপাল কৃষ্ণ চৌধুরী, নাট্যকার মিলন চৌধুরীকে। পরে প্রাতিষ্ঠানিক দীক্ষা গ্রহণ করেন ওস্তাদ শওকত আলীর কাছে।
সংগীত যে গণমানুষের হাতিয়ার হতে পারে তা অশোক সেনগুপ্ত দেখিয়ে দিয়েছেন। ৬৯ এর উত্তপ্ত রাজপথে থেকেছেন গানকে হাতিয়ার মেনে। সেই সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের গানগুলো পরিবেশন করেছেন দেশের বিভিন্ন স্থানের গণমুখী অনুষ্ঠানগুলোতে। শিক্ষক হিসেবে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীদের ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছেন গণসংগীতের দৃপ্ত শিখাটুকু। ব্যক্তিগত জীবনে সহধর্মিনী হিসেবে পেয়েছেন কবিরাজ কবিরত্ন শ্যামাচরণ কবিরাজ মহাজনের নাতনী নৃত্যশিল্পী রত্না সেনগুপ্তাকে। দুই সন্তান কত্থক নৃত্যশিল্পী তিলোত্তমা সেনগুপ্তা এবং অভিনয় ও আবৃত্তি শিল্পী ইমন সেনগুপ্ত (প্রয়াত)। জামাতা নাট্যজন অসীম দাশ। অশোক সেনগুপ্ত অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। যেখানে থাকবে না বৈষম্য ও বঞ্চনা।

x