গণপরিবহনে যৌন হয়রানির : ঢাকার সমীক্ষা

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ১১ মে, ২০১৯ at ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
22

এমন কোনো দিন বাদ নেই যে পত্রিকার পাতা খুললেই নারী নির্যাতনের খবর চোখে পড়েনি। ঘরের ভিতর কিংবা বাইরে, পথে-ঘাটে, মাঠে-ময়দানে, বাসে, ট্রাকে, মাইক্রোবাসে এমনকি নৌযানে- সবখানে-সবস্থানে ঘাপটি মেরে বসে আছে ধর্ষকরা- নারী নির্যাতনকারীরা? সুযোগ পেলেই সেইসব পুরুষের ভিতর থেকে হায়েনা বেরিয়ে আসে।
সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়- বাংলাদেশে গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্যান্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রাস্তা থেকে শুরু করে গণপরিবহনে ভ্রমণ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা আর তদারকির অভাবকে যৌন হয়রানির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রাক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে পরিচালিত ওই গবেষণাটির জরিপে ৩৫৭ জন নারী অংশ নেন। আর গুণগত গবেষণায় ২৯ জন করে নারী ও পুরুষ অংশ নেন।
ঢাকার মতিঝিল, মহাখালী, বনানী, মিরপুর ও কল্যাণপুর, গাজীপুর ও সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের খাগান গ্রামের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কর্মজীবী নারী ও গৃহিণী যারা প্রতিনিয়ত গণপরিবহন ব্যবহার করেন তাদের নিয়ে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এছাড়াও ২৯ জন পুরুষ যাত্রী, বাস, টেম্পো ও সিএনজিচালক ও চালকের সহকারীরও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ নারী বাস, টেম্পো বা সিএনজিতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে টেম্পোতে যাতায়াতকারীরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও পথচারী ২৬ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের কথা বলেছেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ নারীই (৬৬ শতাংশ) জানিয়েছেন, তারা ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সমন্বয়ক হাসনে আরা বেগম বলেন, অশালীন বা পীড়নমূলক ভাষার মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন ৬৮ শতাংশ নারী। ৮১ ভাগ নারী বলছেন, যে তাকে চেনে না সে তার দিকে অশ্লীল বা কুদৃষ্টিতে তাকিয়েছে। বয়সভেদে এর কোনো পার্থক্য নেই। সব বয়সী নারীরাই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
ওই গবেষণায় আরও বলা হয়- যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে অধিকাংশই অর্থাৎ ৮১ শতাংশ নারীই নিশ্চুপ থাকেন। হাসনে আরা বেগম জানান, যৌন হয়রানির শিকার হলে তাদের কিছু করার নেই বলেই তারা চুপ থাকেন। ৭৯ শতাংশ নারী আক্রান্ত হওয়ার স্থানটি থেকে সরে যান এবং ৫৫ শতাংশ নারী হয়রানিকারীকে আচরণটি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ১৪ শতাংশ নারী শারীরিকভাবে এ আচরণ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এছাড়াও ৪৬ ভাগ নারী নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য হিজাব ব্যবহার করছেন বলেও জানান এ গবেষক।
নারীর প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধ ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক নিশ্চিতে যুবসমাজ, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ বৃদ্ধি, সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনগণকে সংগঠিত করা এবং নীতিগত পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। পাশাপাশি সড়ক ও যানবাহনের নকশা, পরিবহন খাতে সেবা প্রদানকারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তদারকি নিশ্চিত করা এবং সড়ক ও পরিবহন ব্যবহারকারীদের নিরাপদ আচরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়। গবেষণা প্রতিবেনের সূত্র: দৈনিক আজাদী

x