গণতন্ত্রের ডায়রিয়া

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৩০ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
28

পৃথিবীতে যে ক’টি শান্তি, স্বস্তির দেশ আছে, ওরা খুব কমই খবরের শিরোনাম হয়। ওসব দেশের নেতারাও ভিআইপি না। কারণ সোজা, প্রচারের রঙিন হাওয়া ছাড়া ভিআইপি হওয়া যায়না। মজার ব্যাপার, ওসব নেতাদের ভিআইপি হয়ে মিডিয়া কাঁপানোর কোন ইচ্ছে বা সাধও নেই। দেশ ও দেশের মানুষ শান্তিতে থাকলেই তারা খুশি। এর জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবকিছু করেন তাঁরা। দেশ ও মানুষের কল্যাণে টানা ১৬/১৮ ঘন্টা কাজ করেন। দেশগুলোর মিডিয়ায়ও ওনাদের নিয়ে খুব কম হৈ চৈ বা খবরের ভাসেনা। ওঁরা দশজন সাধারণ নাগরিকের মতোই নীরবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যান। আলাদা মর্যাদা বা ভোগের মোহ জয় করে। দেশগুলো বেশিরভাগই নিজস্ব শাসন পদ্ধতিতেই চলছে যুগের পর যুগ। বেশিরভাগের অবস্থান উত্তর পশ্চিম ইউরোপে। বাকি আছে নিউজিল্যান্ড আইসল্যান্ড ইত্যাদি।
নিউজিল্যান্ডের কথাই ধরুন, দেশটিতে কে কখন প্রধানমন্ত্রী হন, বিশ্বের কম লোকই জানেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্নাল্ডের কথাই ধরুন। ৩৬ বছরেরও কম বয়সে তিনি নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। বিশ্ব মিডিয়ায় খবরটি আসেনি। ক্রাইস্টচার্চে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী একজন ঘাতক দুটো মসজিদে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রায় পৌনে দু’শ মুসল্লি হত্যাকান্ডের পর হঠাৎ করে জেসিন্ডা বিশ্ব মিডিয়া কেন্দ্রে চলে আসেন। হামলার পর জেসিন্ডার মানবতাবাদী অবস্থান মিডিয়ায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়োয়। জেসিন্ডার অনন্যসাধারণ মানবিকতার কথা আগে লিখেছি, তাই পুনরাবৃত্তি নয়। কিন্তু তিনি দেশটির টানা শান্তির উপর নেমে আসা ভয়ঙ্কর ক্ষত চিরতরে মুছে দিতে যে সব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছেন,তাও এক কথায় যুগান্তকারী। না, কোন নোবেল শান্তি পদকের লোভে নয়, দেশ ও মানুষকে ভালবেসে যা কিছু করার সব করেছেন। দ্রুত দেশটির ভারী ও আধা স্বয়ংক্রিয় সব অস্ত্র উপযুক্ত দাম দিয়ে নাগরিকদের কাছ থেকে ফেরত নিচ্ছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই প্রথম এমন নজির রেখেছেন। বন্ধ করে দিয়েছেন প্রাণঘাতী ভারী ও আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের লাইসেন্স। কয়েকটি দেশের শান্তিবাদী গোষ্ঠী নোবেল শান্তি পদক কমিটির কাছে তাঁর নাম মনোনয়নের জন্য জমা দিতে চাইলে তিনি সোজা না করে দিয়েছেন। বুঝুন মানবিকতা কাকে বলে! ক্রাইষ্টচার্চ হত্যাযজ্ঞের পর তিনি দেশটিকে চিরশান্তির মানবিক দেশ গড়তে যা কিছু দরকার সব করছেন। উল্লেখ্য নিউজিল্যান্ডও শান্তি ও স্বস্তির দেশ হিসাবে বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় আছে। আছে ইউরোপের স্ক্যানডেভিয়ান অঞ্চলের ৫টি দেশ। এরামাঝে ফিনল্যান্ডের বৈশ্বিক শান্তির অবস্থান এক নম্বরে। তালিকায় ডেনমার্ক, হল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, আইসল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ আরো কিছু দেশ আছে। এসব দেশে নিরঙ্কুশ ও শুদ্ধ গণতন্ত্র আছে, এমন বলা বোধহয় ভুল। নিজেদের নিয়মে ওরা শাসন ব্যবস্থা সাজিয়েছে। কিন্তু দারুণ সফল, নাগরিকেরাও নিরবিচ্ছিন্ন সুখ-শান্তি ভোগ করছেন।
এবার বিশ্বসেরা গণতান্ত্রিক দেশ ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের অবস্থা দেখে নিই। বিশ্বের বৃহত্তম ওয়েষ্ট মিনষ্টার বা সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ ভারত। কী হচ্ছে সেখানে? ডাইনি সন্দেহে দিনে গড়ে দু’জনকে পিটিয়ে মারা হয়। কোন গরীব মুসলিম মোষ, ভেড়ার মাংস বহন করলেও গোমাংস বহনের গুজব ছড়িয়ে দিনে দিনে তিন জনকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে, মোদি জমানায়। রাজধানী দিল্লিসহ শিশু ও নারীর উপর যৌন সহিংসতা পুরো দেশেই ভয়াবহ সংক্রমণ ছড়িয়েছে। দলিত নিপীড়ন, খুনের ঘটনাও অসংখ্য। আহমেদাবাদে সবরমতি ট্রেনে কর সেবকদের বগিতে আগুন দেয়ার ঘটনা সাজিয়ে মোদি মূখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন দু’জন মুসলিম সংসদ সদস্যসহ দাঙ্গা লাগিয়ে গুজরাটে খুন করা হয় অসংখ্য মানুষ। যার বিচার এখনো হয়নি। সমপ্রতি মুজাফফর নগরসহ আরো কয়েক জায়গায় দাঙ্গায় খুণ হয় বহু মানুষকে। ক’দিন আগে উত্তর প্রদেশের বেনারসের কাছে দলিত সমপ্রদায়ের ডজনের বেশি নিরীহ মানুষ গুলি করে খুন করে অভিজাত ভূমিদস্যু উচ্চ বর্ণের অভিজাত পরিবার। পিটিয়ে হত্যাসহ, সামপ্রদায়িক হামলায় খুনের ঘটনাগুলোর ঠিকমত বিচারও হয়না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থায় ট্রাম্প জমানার শান্তির নমুনা সবার জানা। যৌন ও যুদ্ধোম্মাদ ট্রাম্প ইসরায়েল ও সৌদি রাজতন্ত্রের সাথে জোট করে পুরো পৃথিবীকে পরমাণু যুদ্ধের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন গায়ের জোরে। নিজের অপকর্ম ঢাকা আর শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরে ‘আমেরিকা ইজ ফার্স্ট’ অহমিকায় চীনসহ কয়েকটি দেশের সাথে বানিজ্য বিধিনিষেধ কার্যকর করে আরেকবার বিশ্বমন্দাকে আদর করে ডেকে আনছেন । গণতন্ত্রের দাইমাখ্যাত ইংল্যান্ডেও গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস চলছে। নয়া প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ব্যাক্তিগত জীবনের সংকট ও ব্রেঙিট সঙ্কট মিলেজুলে একাকার। তার উপর ইরানের সাথে ট্যাঙ্কার দখল-বেদখলের রোমহষর্ক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। তুলনায় পাকিস্তানি সেনাসদর নিয়ন্ত্রিত ইমরান খান মার্কা গণতন্ত্র হিসাবে আনাই অনুচিত।সব মিলিয়ে বিশ্বের গণতান্ত্রিক বড় দেশগুলো একফোঁটাও শান্তিতে নেই। নিজেদের অশান্তি এরা আবার চাপিয়ে দিচ্ছে পুরো বিশ্বের ঘাড়ে। ট্রাম্প বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসার বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতি এখন মহাসঙ্কটে। মজার ব্যাপার, সঙ্কট বেশি মাত্রায় কব্জা করেছে ট্রাম্প ল্যান্ড তথা মার্কিন মুল্লুককে। এবারের অবিশ্বাস্য বন্যা খোদ ওয়াইট হাউসকে ডুবিয়ে দিয়েছে। কয়েক রাজ্যে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড ছাড়িয়ে দাবানল সৃষ্টি হয়। আবার কয়েক ফুট বরফের নিচে ডুবে যায় বহু জনপদ। এদিকে এবারের গরমে ক’দিন আগে প্রচন্ড তাপদাহের পর ইউরোপের ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুঙ্মেবার্গে তাপমাত্রা আবারো রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সের ফসল তোলার ভরা মৌসুমে ফসল ক্ষেতে আগুন ধরে যাওয়ায় জরুরি সতর্কতা জারি করে ফসল কাটা বন্ধ রাখা হয়েছে। তাপমাত্রা ৪২ ছুঁইছুঁই। তাপদাহ গ্রিনল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। যদি তাই ঘটে, গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুঝুন বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র আর আবহাওয়ার খেলা! স্বাভাবিক, প্রকৃতির উপর টানা নির্যাতন করলে শোধতো নেবেই। যেভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হচ্ছে, বৈদ্যুতিক স্থাপনা নির্ভরতা (এসি, ফ্রিজ, গাড়িসহ অন্য গ্যাজেট) বাড়ছে, প্রাকৃতিক বনভূমি জলাধার ধংস, দখল চলছে এর পরিণামতো ভোগ করতেই হবে! প্রকৃতিতে যেভাবে দুষণ ছড়ানো হচ্ছে , আমরাতো নিজেরাই কেয়ামতকে ডেকে আনছি।
মোদ্দা কথা, গণতন্ত্র এখন নামে আছে-কামে নয়। প্রচন্ড আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদী সভ্যতা হচ্ছে, আসলে চরম অসভ্যতা ও ধংসের প্রাক লক্ষণ। এখন তাই চলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। গণতন্ত্রের যতই বিশুদ্ধ সালসা গেলানো হোক, ডায়রিয়া থামবেনা। সুবিধাভোগী ন্যাতাদের সুবচন ডায়রিয়া, গুজব ডায়রিয়া, ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, হুজুর, মাষ্টারসহ সব শ্রেণির মানুষের লুচ্চামির ডায়েরিয়া বাড়বেই! শিশুর জন্য মাদ্রাসা, ধর্মীয় স্থাপনা, স্কুল, এতিমখানা, গৃহকোণ কোনটাই আর নিরাপদ নেই। নারীও এখন লোভাতুর হায়েনার হামলার সহজ টার্গেট। অথচ দেশের সব শীর্ষ জায়গায় ও পেশায় এখন নারী! যুদ্ধ বিমানের পাইলট, জাতিসংঘ শান্তি মিশন, ট্রেন চালক, ট্রাক চালক, আর্মি জেনারেল, লায়ন গভর্ণর থেকে প্রধানমন্ত্রী! কোথায় নেই, নারী? কিন্তু তবুও হচ্ছেটা কী? এটা কী গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির সংকট? মোটেই না, সঙ্কটটা বোধ- মনন ও মানবিকতার। এসব মানবিক গুণ লুপ্ত হয়ে গেলে মানুষ আর মানুষ নয়, দ্বিপদী শ্বাপদে রূপান্তরিত হয়। আমাদেরও রূপান্তর কাল চলছে। সাথে বিপুল জনসংখ্যার চাপ। আমরা অপরাধের কথা যত বেশি বলি জনচাপের কথা ভুলে থাকি ততবেশি! এমন হলে কীভাবে দেশ সঠিক ট্র্যাকে থাকবে। থাকবেনা।

x