খেয়াঘাটের মাঝি

রেজাউল করিম

বুধবার , ৮ মে, ২০১৯ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
84

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য শিশুতোষ মানস গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে। ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে/ কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক/ রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।’ (আমাদের ছোট নদী, সহজ পাঠ)।
প্রকৃতির প্রতি তাঁর দরদ অন্যরকম। প্রকৃতির নানান বিষয়কে তুলে এনেছেন শিশুদের ছড়া কবিতায়। বৃষ্টি, নদী, চাঁদ, ফুল, পাখি এসব কিছুই শিশুদের দারুণ প্রিয়। আর এগুলো নিয়ে যখন ছড়া ও কবিতা হয় তখন তা আরো উপভোগ্য। কবিতায় : ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর/ নদেয় এল বান/ আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা/ কোথায় বা সীমানা/
দেশে দেশে খেলে বেড়ায়/ কেউ করে না মানা/ কত নতুন ফুলের বনে/ বিষ্টি দিয়ে যায়/ পলে পলে নতুন খেলা/ কোথায় ভেবে পায়/ মেঘের খেলা দেখে কত/ খেলা পড়ে মনে/ কত দিনের নুকোচুরি/ কত ঘরের কোণে/ তারি সঙ্গে মনে পড়ে/ ছেলেবেলার গান/ বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর/ নদেয় এল বান।’ (বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর)।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সচেতন খেয়ালি মনের মানুষ। বিচিত্র রকম সাধ, ইচ্ছে ছিলো তার মনের মধ্যে। ছোটদের মতো তার মনটাও যখন যা দেখেছেন তাই করতে চেয়েছেন, হতেচেয়েছেন। ‘যখন যেমন মনে করি/ তাই হতে পাই যদি/ আমি তবে এক্‌খনি হই/ ইছামতী নদী।’ অথবা ‘মা যদি হও রাজি/ বড়ো হলে আমি হব/
খেয়াঘাটের মাঝি’ (মাঝি, শিশু)। কবি পাখি নিয়ে লিখেছেন-‘কিচিমিচি করে সেথা/ শালিকের ঝাঁক/ রাতে উঠে থেকে থেকে/ শেয়ালের হাঁক’। প্রকৃতির কবি, প্রেমের কবি, ভালোবাসতেন বৃষ্টিও। পাখির কিচির মিচির গান গাওয়া, নদীর কলকল ছলছল ছুটে চলার ধ্বনি কবির মনকে আনন্দ দিয়েছে। নদীর কথা, বৃষ্টির কথা, পাখির কথা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার ছড়া-কবিতায়। আষাঢ় মাসের মেঘ দেখে কবি বলেছেন-‘নীল নব গনে আষাঢ় গগনে/ তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ ও গো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।’
বৃষ্টির পর আকাশে রোদ উঠেছে। রংধনুর সাত রঙের লুকোচুরি খেলা। বেজে উঠেছে স্কুলের ছুটির ঘণ্টা। বাঁধ ভাঙা ছেলে-মেয়েদের বাড়ির পানে ছুটে চলা। রংধনুর সাত রঙের সঙ্গে এ সময় ছেলে-মেয়েরা আনন্দে মেতে উঠে। এই আনন্দের মুহূর্তে আরও একটু বেশি আনন্দ দিয়ে গিয়ে কবি লিখেছেন-‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে/ বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই/ আজ আমাদের ছুটি।’ মা পালকিতে করে যাচ্ছিলেন। আর খোকা যাচ্ছিল মায়ের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে। মা তখন ভীষণ ভয় পাচ্ছিলেন। ডাকাতের ভয়ে মা ভেঙে পড়েছেন। ‘তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে/ ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে/ আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে/ আমি আছি, ভয় কেন মা করো।’ কবি মা’কে এভাবেই সাহস দিয়ে যাচ্ছিলেন। কবির ইচ্ছে হলেই মা’কে নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুওে বেড়াতেন। কখনও রাজপুত্র হয়ে আবার কখনও বীরপুরুষ হয়ে। মা খোকাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। আর তাইতো কখনও না করতে পারেননি। খোকার যে কোনো ইচ্ছাই মা হাসি মুখে মেনে নিতেন। খোকা এখানেও তার ইচ্ছার কথাটি বলতে ভুল করেনি।
চাঁদকে নিয়ে কতো গল্প-কবিতা-ছড়া লেখা হয়েছে তার হিসেব নেই। চাঁদ শিশুদের যেমন প্রিয়, তেমনি বড়দেরও। চাঁদকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রচুর লিখেছেন। ‘দিনের আলো নিভে এল/ সূর্যি ডোবে ডোবে/ আকাশ ঘিরে মেঘ ছুটেছে/ চাঁদের লোভে লোভে।’ আবার রচনা করেছেন-‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে।’
কবিগুরুর ছড়ায় ছড়িয়ে রয়েছে মজা, মিশে রয়েছে অদ্ভুত সব কাহিনি। তিনি কখনো হেঁটেছেন বাস্তব জগতে, আবার কখনো বিচরণ করেছেন কল্পনার জগতে। শিশুদের মনকে বুঝতেন বলেই তাদের উপযোগী রচনায় তিনি ছিলেন দক্ষ। তাঁর ‘শিশু’, ‘শিশু ভোলানাথ’, ‘খাপছাড়া’, ‘ছড়ার ছবি’, ‘ছড়া’ ইত্যাদি বই ছোটদের আনন্দে ভাসিয়ে দিয়েছেন। ছোটদের জন্য তিনি কখনো ছোট হয়েছেন, আবার কখনো নিজে ছোটদের উদ্দেশে বড় হয়ে লিখেছেন। ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে/ উঁকি মারে আকাশে।’ তখন মনে হয়, কোনো চিরপরিচিত গ্রামের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। তালগাছটা একটা মানুষ হয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো আবার তিনি হয়ে গেছেন মাঝি। ‘আমার যেতে ইচ্ছে করে/ নদীটির ওই পাড়ে/ যেথায় ধারে ধারে/ বাঁশের খুঁটায় ডিঙি নৌকা/ বাঁধা সারে সারে।’
ছোটদের জন্য রচনা করেছেন নাটকও। কবির ‘ডাকঘর’ নাটকটি সবার কাছে প্রিয়। অমলের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার প্রত্যাশা সব শিশুর অন্তরের ইচ্ছাকে প্রকাশ করে। দইওয়ালার ডাক শুনে মনে হয় আমাদের ঠিক পাশ দিয়ে যেন দইয়ের ডুগি নিয়ে ছুটে চলেছে কোনো লাল মাটির দেশের দইওয়ালা। কিন্তু বর্তমানের নাগরিক-শিশু ‘দইওয়ালা’ চিনে না বললেই চলে। তারা কল্পনার জগতে ‘দইওয়ালা’ খুঁজে পায় এই নাটকে। কবির ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের কথা যে একবার পড়ে সে আর তাকে ভুলতে পারে না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (১৮৬১ সালের ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর অভিজাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। এই পরিবারের পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গ থেকে ব্যবসায়ের সূত্রে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের চেষ্টায় এ বংশের জমিদারি এবং ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে লালিত এবং আত্মপ্রতিষ্ঠিত দ্বারকানাথ ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি জনহিতকর কাজেও সাফল্য অর্জন করেন। জমিদার বংশের হয়েও রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ-সংস্কারক। মূলত কবি হিসেবেই তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত। ১৯১৩ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এশিয়ার বিদগ্ধ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেন।
রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনের প্রেক্ষাপটেই তাঁর কবিমানস ও সাহিত্যকর্মের স্বরূপ অনুধাবন সম্ভব। জীবনের পর্বে পর্বে তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা ও সাহিত্যাদর্শের পরিবর্তন ঘটেছে। যুগে যুগে পৃথিবীতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে রূপান্তর ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ সবকিছুকেই আত্মস্থ করেছেন গভীর অনুশীলন, ক্রমাগত নিরীক্ষা এবং বিশ্বপরিক্রমার মধ্য দিয়ে। তাই তাঁর সাহিত্যজীবনের নানা পর্যায়ে বিষয় ও আঙ্গিকের নিরন্তর পালাবদল লক্ষণীয়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল তাঁর অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্য্যনাট্য, ভ্রমণকাহিনী, চিঠিপত্র এবং দেশে বিদেশে প্রদত্ত বক্তৃতামালা। তাঁর অন্তর্নিহিত জীবনবোধ ছিল স্থির এবং বহু পরিবর্তনকে স্বীকার করে নিয়েও আপন আদর্শে প্রতিষ্ঠিত, অন্যদিকে তাঁর সৃজনশীল রূপটি ছিল চলিষ্ণু ও পরিবর্তনশীল। রবীন্দ্রনাথ কেবল তাঁর কালের কবি নন, তিনি কালজয়ী। বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর আবির্ভাব ছিল এক যুগান্তর। শিল্পকলা রবীন্দ্রনাথকে আশৈশব খুব টানতো। তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল রেখা ও রঙের সমবায়ে যে ছবি নির্মিত হয় তার মধ্যে প্রণণ ও বাণী সঞ্চারণের ব্যাপারটি । কিন্তু তিনি জীবনের প্রথমভাগে মেনে নিয়েছিলেন যে ছবি আঁকার ব্যাপারটি তাঁর আদৌ নয়। শৈশবেই পেন্সিল বা তুলির আঁচড়ে বাস্তবের প্রতিমূর্তি ফুটিয়ে তোলার যে সহজাত ক্ষমতার স্ফূরণ অনেককে চিত্রাংকণে উৎসাহী করে তোলে তা-ও তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। খেলার ছলেই তিনি আঁকতে শুরু করেছিলেন, তারপর একসময় তা নেশা হয়ে দাঁড়ায়। কার্যত তা কার্যত রেখা ও রং থেকে ছবি ফুটিয়ে তোলার স্বীয় শক্তির দৈনিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। চিত্রকলায় ঠাকুরের কোনো প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। আঁকতে আঁকতে এক ধরনের দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। আর ছবির সংখ্যা যখন আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যায় তখন তা’ আর নিছক খেলা থাকে না, তাকে চিত্রসাধনা ব’লেই স্বীকার ক’রে নিতে হয়। কবিগুরু ছবির নামাকরণের বিরোধী ছিলেন, কেননা তিনি বাস্তবের প্রতিচ্ছবি রূপায়ণের লক্ষ্য নিয়ে ছবি আঁকেন নি। তার মতে : ছবি প্রকৃতপক্ষে তাই ছবিটি দেখে যা মনে হয়। কার্যত: কী আঁকবেন স্থির না ক’রেই তিনি কলম-কাগজ নিয়ে বসেছেন। আর এভাবেই এক সময় কাগজে ছবির আভাস ফুটে উঠেছে।
শুধু সাহিত্য নয়, কবির প্রতিটি সৃষ্টিকর্মে রয়েছে গভীর মমত্ববোধ, ভালোবাসা। সবার জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। ছোটদের তিনি বেশি ভালোবাসতেন। আর ছোটদের জন্য সৃষ্টির করেছেন অনেক। তিনি শুধু বিশ্বকবি নন, শিশুদেরও কবি।

x