খেলাধুলায় এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা এগিয়ে যাক

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
14

‘প্রত্যেক পাড়ায় মহল্লায় নারীদের জন্য ব্যায়ামাগার গড়ে তুলতে হবে। সমাজের অর্ধেক হইলো নারী। সেই নারীকে অন্তঃপুরে বন্দি রাখিয়া যাহারা সমাজকে প্রগতির পথে আগাইয়া নিবার কথা বলেন তাহারা প্রকৃতপক্ষে সমাজকে পিছনের দিকে ঠেলিয়া দিতেছেন। নারীদের জন্য সব ধরনের খেলাধুলার সুযোগ করে দিতে হবে।’
-কবি সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী

শত প্রতিকূলতায়ও আপন আলোয় নিজেকে বিকশিত করছে নারী। রক্ষণশীল সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তাঁরা। ক্রীড়াঙ্গনে সামপ্রতিক সাফল্য এরই প্রমাণ বহন করে। সবাইকে অবাক করে একটার পর একটা সাফল্যগাথা রচনা করে চলেছেন আমাদের দেশের অদম্য নারী ক্রীড়াবিদরা। খেলার মাঠে তাদের হাতে ধরা লাল-সবুজের পতাকা এখন অনন্য উচ্চতায়। তাদের হাতেই রচিত হচ্ছে আমাদের সমৃদ্ধ ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাস। বিশ্ববাসী নতুন করে যেনো চিনে নিচ্ছে বাংলাদেশকে। একসময় ক্রিকেট কিংবা ফুটবলের মতো খেলাগুলো ছিল পুরুষদের একচ্ছত্র দখলে। নারীরা ক্রিকেট খেলতে মাঠে নামবে এটি এখনো অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ব্যাপার! কিন্তু এই ট্যাবু (অশোভনীয় বিষয়) দিন-দিন ভেঙে দিচ্ছে নারীরাই। খেলাধুলার অধিকাংশ ক্ষেত্র এখন নারীর পদচারণায় মুখর। শুধু কি তা-ই? প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে তাদের সাফল্যের গল্পও। এই তো্‌ কয়েকমাস আগে- এশিয়ার পরাশক্তি ভারতকে ফাইনালে ৩ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে জিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। টানা পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে তাঁরা।

ফুটবলে বাংলাদেশি নারীদের সাফল্যের গল্পটি আরও বিস্ময়কর। ২০১৫ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ দলের টুর্নামেন্টে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরে একদল কিশোরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে শুরু হয় হৈ চৈ। দেশের প্রত্যন্ত কালসিন্দুরের মতো এলাকায় বেড়ে ওঠেছে এই কিশোরী দলটি। এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে সমাজের নানাজনের নানা কথাকে পেছনে ফেলে তাদের বিস্ময়কর সাফল্যের গল্পটি সিনেমাকেও হার মানায়। তারা এখন সারা দেশের নারীদের কাছে অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ফাইনালে ১-০ গোলে হারায় ভারতকে। চ্যাম্পিয়ন ট্রফির পাশাপাশি ফেয়ার প্লে ট্রফিও পায় বাংলাদেশ। ওইবছর ওই টুর্নামেন্টের ৭ ম্যাচে মেয়েরা মোট গোল করে ২৮টি। সেই আসরে ফাইনালের আগেই লিগম্যাচে নেপাল, ভুটান ও ভারতকে যথাক্রমে ৬-০, ৩-০ ও ৩-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ।
সর্বশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর আবারও আমরা পেলাম পিলে চমকানো খবর! এবার অনূর্ধ্ব ১৮ সাফ ফুটবলে পাকিস্তানকে ১৭-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠে গেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। গত ৩০ সেপ্টেম্বর রবিবার সন্ধ্যায় ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। অক্টোবরের আসছে ৭ তারিখে এ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে গত আগস্টে ভুটানের চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামেই অনূর্ধ্ব-১৬ সাফে পাকিস্তানকে ১৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ।

যদি বলি- বাংলাদেশে নিভে যাওয়া ফুটবল উন্মাদনার শেষ সলতেটি যেনো তাঁরাই জ্বালিয়ে দিয়েছে আবার। খবরে প্রকাশ- আমাদের মেয়েরাও নাকি ক্লাব পর্যায়ে ফুটবল খেলতে যাচ্ছে অন্য দেশে। শুধু ফুটবল আর ক্রিকেটে নয়, গর্ব করার মতো আমাদের আরও অনেক নারী ক্রীড়াবিদ রয়েছেন, যাঁরা দেশের জন্য বিরল সম্মাননা বয়ে এনেছেন। টেবিল টেনিসের বিস্ময়, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ জোবেরা রহমান লিনু। ১৬ বার জাতীয় টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে যিনি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠিয়েছেন। সাঁতারেও পিছিয়ে নেই মেয়েরা। এসএ গেমসে দুটি সোনা জিতে সাড়া ফেলেছেন মাহফুজা আক্তার শিলা। বুদ্ধির খেলা দাবায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার শামীমা আক্তার লিজা। তিনি বাংলাদেশ মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে ২০০৫, ২০১০ ও ২০১৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হন। এছাড়া তিনি প্রথম বাংলাদেশি মহিলা দাবাডু হিসেবে বিশ্ব মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় অ্যাথলেটিকসের ৪০তম আসরের দ্রুততম মানবী হয়েছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিরিন। তিনি টানা চারবারের মতো দেশসেরা দ্রুততম মানবী হয়েছেন।
এককথায় কোথায় নেই নারীর সাফল্যের গল্প? ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, দাবা, টেবিল টেনিস, কাবাডি, ভারোত্তোলন, তায়কোয়ানডো প্রভৃতি খেলার প্রতিটিতেই রয়েছে বাংলার দামাল মেয়েদের সাফল্যগাথা। নতুন যে তীর-ধনুকের খেলা আরচ্যারি শুরু হয়েছে সেটিতেও বাংলার নারীরা সমানভাবে এগিয়ে আসছে।
তবে এটাও সত্যি যে- আমাদের সমাজ ও আপনজনের বাধার মুখে আরও অনেক নারীকেই হার মানতে হয় বা হচ্ছে। নারীর প্রতিটি সাফল্য তাই দাবি করে আরও বেশি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। খেলাধুলায় নারীর এসব সাফল্য অনুসরণ করে কোটি-কোটি বাঙালি নারী একদিন খেলাধুলাসহ সমাজের নানাক্ষেত্রে পুরুষতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজের জায়গা আদায় করে নেবে- এর চেয়ে বড় সুখবর আর কী হতে পারে?

x