খাবারে শিশুদের অ্যালার্জিতে আক্রান্তের হার কেন বাড়ছে

বৃহস্পতিবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
17

বিশ্বের শিশুদের মধ্যে খাবারের মাধ্যমে অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হওয়ার হার আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে বলে এক গবেষণায় দেখা গেছে। গত আগস্টে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ছয় বছরের এক মেয়ে দুগ্ধজাত খাবারের অ্যালার্জিতে মারা যায়। এছাড়া সমপ্রতি তিল এবং চিনাবাদাম খাওয়ার কারণে দুই ব্রিটিশ শিশুর মৃত্যুর খবর বিষয়টিকে নতুন করে সামনে আনে।
গত কয়েক দশকে পশ্চিমা দেশগুলোতে এই অ্যালার্জি প্রবণতা বেড়ে যাওয়া চোখে পড়ার মতো। উন্নয়নশীল দেশে এই অ্যালার্জির হার কম হলেও একেবারে যে নেই তা বলা যাবে না। জরিপে দেখা গেছে, গ্রামের চেয়ে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যেই এই অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আর ব্যস্ত নগরে কারো খাবার নিয়ে এ ধরনের বাধা নিষেধ সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে বোঝা হতে পারে। অ্যালার্জির হার কেন বাড়ছে এবং একে মোকাবেলা করার উপায় খুঁজতে গবেষকরা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। খবর বিবিসির।
অ্যালার্জি হওয়া না হওয়া সাধারণত আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। শরীরের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবেশের নানা উপাদানের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। যেটা খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। শরীরের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বলা হয় অ্যালার্জেন। এই অ্যালার্জেন যদি কখনো সংক্রমিত হয় তাহলে নানা ধরনের অ্যালার্জির উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, ত্বকের লাল রং ধারণ, চামড়ায় লাল চাকা চাকা হয়ে যাওয়া বা শরীরের কোনো অঙ্গ ফুলে ওঠা।
সবচেয়ে গুরুতর ক্ষেত্রে বমি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা অ্যানফিল্যাকটিক শক দেখা দিতে পারে। শিশুরা কয়েক ধরনের খাবারে অ্যালার্জিক হয়ে থাকে। যেমন, দুধ, ডিম, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, কাঠবাদাম, আখরোট, পাইন বাদাম, ব্রাজিল নাটস, পিক্যান্স, তিল, মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক ইত্যাদি। বিশ্ব দিনে দিনে কেন খাদ্য অ্যালার্জিক হয়ে উঠছে তার কোনো একক ব্যাখ্যা নেই। তবে এ নিয়ে বিজ্ঞানের কিছু তত্ত্ব রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো, বর্তমানের উন্নত স্বাস্থ্যবিধি এবং পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান। এখনকার শিশুরা আগের মতো সংক্রমণ রোগের শিকার হয় না বললেই চলে। রোগজীবাণুর সংস্পর্শে আসার বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে কাজ করবে এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
খাবারের প্রতি মানুষের ক্রমেই এতটা সংবেদনশীল বা অ্যালার্জিক হয়ে ওঠার পেছনে আগে পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয়কে মূল কারণ বলে ভাবা হতো। এর সঙ্গে পশ্চিমা জীবনযাত্রার সংশ্লিষ্টতাও খোঁজেন অনেকে। জরিপে দেখা গেছে, অভিবাসীদের নিজ দেশের তুলনায় গৃহীত দেশে হাঁপানি ও খাদ্য অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। পরিবেশগত পার্থক্যের কারণেই এমনটা হয়ে থাকে। এছাড়া দূষণ, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং রোগজীবাণুর সংস্পর্শে কম আসাকেও অ্যালার্জির হার বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ বলে ধরা হয়।
আমাদের শরীর ঠিক যে প্রক্রিয়ায় অ্যালার্জির সঙ্গে মোকাবিলা করে ঠিক একইভাবে এটি পরজীবী সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বাড়ানোর প্রতি নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে ভিটামিন ডি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে; যার কারণে শরীরের অ্যালার্জি প্রতিরোধের ক্ষমতা বেড়ে যায।
বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন ডি পায় না। এর প্রধান কারণ হলো তারা সূর্যের তাপে কম সময় ব্যয় করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভিটামিন ডি অভাবের হার গত এক দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একটি নতুন ডুয়েল অ্যালার্জেন এঙপোজার তত্ত্ব দিয়েও অ্যালার্জি প্রতিরোধ করা যায়। এই তত্ত্ব বলছে, খাদ্য অ্যালার্জিতে শিকার হওয়া না হওয়া নির্ভর করে ওই খাবার গ্রহণের সময়, পরিমাণ এবং ফর্ম অফ এঙপোজার বা কীভাবে অ্যালার্জিক আক্রমণ হয় তার ওপর। শিশুকে দুধ পান করানোর সময় মা যদি নিজে সব ধরনের খাবার খেয়ে থাকেন তাহলে এর ফলাফল বেশ ভালো হয়। এতে মা ও শিশুর অ্যালার্জি সংক্রমণের হার কমে যায়। কেননা এ সময় অন্ত্রের ইমিউন সিস্টেম যেকোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা নতুন খাবারের নানা অপরিচিত উপাদানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকে। এছাড়া শিশুদের অল্প বয়স থেকেই অ্যালার্জি সংবেদনশীল খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস করলে তাদের এই সমস্যায় ভোগার আশঙ্কা থাকে না। লন্ডন কিংস কলেজের গবেষকরা এ নিয়ে পাঁচ বছরের শিশুদের ওপর জরিপ চালায়। দেখা গেছে, যারা ছোট থেকেই নিয়মিত চিনাবাদাম খায় তাদের এই বাদামে অ্যালার্জির হার ৮০ শতাংশ কমে যায়। বর্তমান বিশ্বে খাদ্য অ্যালার্জির কোনো প্রতিকার নেই। এটি পুরোপুরি নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের উপরে।

x