খাদ্য সার্বভৌমত্বকে খাদ্য নিরাপত্তার পূর্বশর্ত হিসেবে ভাবতে হবে

শুক্রবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৪:৩৪ পূর্বাহ্ণ
67

১১৯টি দেশের ওপর জরিপ করে সম্প্রতি গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ ২৬ দশমিক ৫০ স্কোর নিয়ে ৮৮তম অবস্থানে আছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৩৭ দশমিক ৬ এবং ২০০৫ সালে ৩২ দশমিক ২। ক্ষুধার সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্ক নিবিড়ভাবেই জড়িত। গরিব মানুষের হার বেশি হলে অভুক্ত লোকের সংখ্যা, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। যদিও বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত ২০০৮ সালে যেখানে এ দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ৬৩০ মার্কিন ডলার, সেখানে বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার বলে দাবি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশের অবস্থান থেকে বের হয়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্তরে পদার্পণ করেছে। তবে মধ্যম আয়ের দেশ হলেই যে দেশ থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য বিমোচিত হয়ে যাবে বা হয়ে গেছে, তা বলা যাবে না। এমন অনেক মধ্যম আয়ের দেশ আছে, যাদের মিলিয়ন মিলিয়ন ক্ষুধার্ত মানুষ আছে। বাংলাদেশের মানুষের দারিদ্র্যের পেছনে অনেক কারণ আছে বলে মনে করা হয়। এ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, দুর্বল অবকাঠামো, বন্যা, অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ ইত্যাদি প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়ে থাকে। এ দেশের নিম্নভূমিতে যারা বসবাস করেন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ইত্যাদির মতো অপ্রতিরোধ্য কিছু প্রাকৃতিক কারণে তাদের ফসল, ঘরবাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উজানে অবস্থিত দেশও এ দেশের মানুষের দুর্ভোগের জন্য কম দায়ী নয়। বর্ষাকালে উজানের পানি এসে ভাসিয়ে দিয়ে যায় আমাদের দেশ আর শীতকালে দেখা দেয় পানির অভাব। বন্যা আর খরাণ্ড এ দুই বিপরীত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন এ দেশের প্রান্তিক কৃষক। আর এ ক্ষতি সামলাতে গিয়ে তারা মহাজনি ঋণ বা অন্য কোনো খাত থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকেন। ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তারা দারিদ্র্যের বেড়াজালে আটকা পড়ে ঋণের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকেন। অবকাঠামোগত সমস্যাও দারিদ্র্যের পেছনে কম ভূমিকা রাখছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা বা বাজারে সহজে প্রবেশযোগ্যতার সঙ্গে দারিদ্র্যের নিবিড় একটা সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক সার্ভে থেকে দেখা যাচ্ছে, গরিব মানুষের সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশাধিকারের বেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থার বেশ জোরালো ভূমিকা রয়েছে। দেখা গেছে, ঢাকা থেকে রংপুর, দিনাজপুর বা এ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দূরত্ব বেশি হওয়ায় এ অঞ্চলে দরিদ্রের হার বেশি। কারণ রাজধানীর বাজারে প্রবেশ করতে এদের অনেক সময় লেগে যায়। এখানকার কৃষক কর্তৃক উৎপাদিত ফসলের মূল্য সরাসরি কৃষকের হাতে না এসে মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে তাদের হাতে আসছে। এতে কৃষক প্রকৃত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হলে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হলে দ্রুত মূল বাজারে প্রবেশ করতে পারলে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সরাসরি হাতে পেতেন; কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমের বাজার চাঙ্গা হতো। উপকূলীয় অঞ্চলের জন্যও একই কথা বলা যায়। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবেণ্ড ঢাকা, চট্টগ্রাম বা উন্নত অঞ্চলের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক কম। আবার শহর অঞ্চলে যেসব গরিব লোকের বসবাস, তারা সাধারণত শ্রমজীবী হয়ে থাকে। শ্রমই তাদের সম্পদ। শ্রম বিক্রি করতে গিয়ে প্রায়ই তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে যায়। এসব সমস্যার মধ্যেও দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। তবে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বর্তমান উদার বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশজ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশে খাদ্যাভাব যেন না থাকে, থাকলেও তা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

খাদ্য সার্বভৌমত্বকে খাদ্য নিরাপত্তার পূর্বশর্ত হিসেবে ভাবতে হবে। স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করা, বাজার স্থিতিশীল রাখা, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, সরকারিভাবে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখা, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, সুষ্ঠু ভূমিনীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নসহ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

x