খাতুনগঞ্জ ও চাকতাইয়ে ব্যবসায় মন্দা

সাধারণ মানুষের স্বস্তি, ব্যবসায়ীদের অস্বস্তি

সবুর শুভ

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
532

দেশে ভোগ্য পণ্যের সবচেয়ে বড় আড়ত হিসেবে পরিচিত খাতুনগঞ্জ ও চাকতাইয়ে এবার ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় বেশ মন্দা চলছে। দুইমাস ধরে এ ধরনের অবস্থা চলছে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা। এতে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে থাকলেও পুঁজি হারানোর শঙ্কায় আছেন আমদানিকারকরা। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকা গচ্ছা গেছে বলেও জানালেন তাঁরা। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, কৃষক যখন তার উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পান না তখন পরের বছর অনেক কৃষক আর মাঠে যান না লোকসানের কারণে। আমাদের অবস্থাও একইরকম। ব্যাংক লোন ও নিজেদের পুঁিজর উপর ভিত্তি করেই ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে। ব্যবসায় মন্দার এ ধকল কিভাবে সামাল দেব তা সংশ্লিষ্ট সকলকে চিন্তা করতে হবে। পণ্যমূল্য কমের কারণে লোকসানের মুখোমুখি খাতুনগঞ্জের শতাধিক আমদানিকারক। নানান জাতের ডাল, রসুন, চিনি আমদানি করে তারা এ লোকসানের সম্মুখীন হন বলে জানান। ফলে বিগত দুই মাসে প্রায় হাজার কোটি টাকা লোকসানের শিকার হয়েছেন আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা। অতিরিক্ত আমদানির পাশাপাশি ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রাম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। খাতুনগঞ্জ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ে ভোগ্যপণ্যের দর উঠানামা নিয়ে অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। অনেক আমদানিকারক চাহিদার পূর্বাভাস না দেখে অতিমাত্রায় পণ্য আমদানি করে একদিকে নিজেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে বাজারে পণ্যের দরপতন ঘটে। বিগত দুইমাসে বেশ কিছু পণ্যের ব্যাপক দরপতন ঘটেছে। বিশেষ করে চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, মশুর, মটর, মাশকলাই, মুগ, খেসারীর দর কমেছে।

ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার প্রতি মণ চিনির বাজারমূল্য ছিল ১৮৫০ টাকা। অথচ এক মাস আগেও চিনির মূল্য মণপ্রতি ১৯৩০৫০ টাকা। একমাস আগে প্রতিকেজি রসুন ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও সোমবার রসুন বিক্রি হয়েছে ৩৫৩৬ টাকা কেজিতে। অথচ সোমবার বন্দরে আসা প্রতিকেজি রসুনের আমদানি খরচসহ মূল্য পড়েছে ৫০৫৫ টাকা। শুধু রসুন আমদানি করেই গত একমাসে শতকোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

খাতুনগঞ্জে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে ছোলা ও ডাল জাতীয় পণ্যের। একমাস আগে যে ছোলার মূল্য ছিল ১৮০০ টাকা, সোমবার প্রতিমণ ছোলা বিক্রি হয়েছে ১৭০০ টাকায়। অথার্ৎ প্রতিমণে ১০০ টাকা নেই। অথচ এই ছোলার কস্টিং পড়েছে মণপ্রতি ২১০০ টাকা। বর্তমানে মশুর বিক্রি হচ্ছে প্রতিমণ ১৪০০ টাকায়। এক মাস আগে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও মশুর ডালের কস্টিং পড়েছে মণপ্রতি ১৭০০ টাকা।

অন্যদিকে প্রতিকেজি মটর বিক্রি হচ্ছে ২৫২৬ টাকায়। একই মটর একমাস আগে বিক্রি হয়েছে ২৯ টাকায়। এসব মটরের আমদানি মূল্য পড়েছে প্রতিকেজি ২৯ টাকার উপরে। মাশকলাই ডালের চিত্রও একই। ৪৭ টাকা কস্টিংয়ের মাশকলাই বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩৬ টাকা কেজিতে। সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে মুগ ডালের। ৭৫ টাকা কস্টিংয়ের মুগ ডাল খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজিতে। এই ডাল একমাসে আগে বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৬৫ টাকায়। আমদানি না হলেও খেসারি ডালের দামও কমেছে। একমাস আগে ৬০ টাকার খেসারি সোমবার বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৪০ টাকায়।

চাক্তাইয়ের আমদানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী হাজী আবুল বশর বলেন, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫৩৬ টাকা। একমাস আগে রসুন বিক্রি হয়েছিল ৮০ টাকা। অথচ এখন যে রসুন বন্দরে আসছে সবকিছু মিলে তার মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রতিকেজি ৫৫ টাকার কাছাকাছি।

ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক গ্রিন ইমপেঙ লিমিটেডের স্বত্ত্বাধিকারী মাহবুব রানা বলেন, গত দুই মাসে কোটি টাকার মতো লোকসান দিয়েছি। প্রতিটন মুগডাল ৭০ হাজার টাকা কস্টিং পড়লেও বিক্রি হয়েছে ৪২৪৩ হাজার টাকায়।

ডাল আমদানিকারক মেসার্স পায়েল ট্রেডার্সের কর্ণধার আশুতোষ মহাজন বলেন, অতিরিক্ত আমদানির পাশাপাশি সীতাকুণ্ডে বসানো ওজন স্কেলের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ঢাকার আমদানিকারকরা লাইটারে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভোগ্যপণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। এতে দেশের অন্যপ্রান্তের ব্যবসায়ীদের সাথে পেরে উঠছে না চট্টগ্রাম। তিনি আরো বলেন, গত দুই মাসে চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকরা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসানের শিকার হয়েছেন। পণ্যের ব্যাপক দরপতন হলেও ডলারের দাম বৃদ্ধি, অতিমাত্রায় আমদানির কারণে লোকসানের পরিমাণও আরো বেড়েছে।

চট্টগ্রাম ডাল মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম মহিউদ্দিন বলেন, ডাল আমদানিকারকরা একেবারে মরে গেছে। কোটি কোটি টাকার লোকসান গুণতে হচ্ছে। গত দুই মাস ধরে টানা দরপতন হয়েছে সব ধরণের ডালের।

খাতুনগঞ্জের শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মীর গ্রুপের পরিচালক মীর মোহাম্মদ হাসান বলেন, গত একমাসে মসলা জাতীয় পণ্য বাদে সব ধরণের ভোগ্যপণ্যের দাম কমেছে। অস্বাভাবিক দাম কমার কারণে আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশ বেকায়দায় আছেন।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগির আহমদ বলেন, আমদানিকৃত পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার কারণে খাতুনগঞ্জের অনেক আমদানিকারক পুঁজি হারাতে বসেছেন। এতে করে আমদানিকারকরা ব্যাংক ঋণ শোধ করতে পারছেন না। যার প্রভাব পড়বে সামগ্রিক ব্যবসার উপর।

x