খাতুনগঞ্জে বাড়ছে চেক প্রতারণার ঘটনা

জাহেদুল কবির

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ
429

মৌখিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এক সময় খাতুনগঞ্জে শত শত কোটি টাকা লেনদেন হতো। সেই বিশ্বাসেও এখন অবিশ্বাস্যভাবে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা এখন আর মৌখিক কথায় লেনদেন করেন না। বিভিন্ন সময় এক ব্যবসায়ী অপর ব্যবসায়ীর টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওযার ঘটনায় মূলত সেই বিশ্বাসে ছিড় ধরেছে। তবে এখন প্রতিটি লেনদেনই হয়ে থাকে ব্যাংকের মাধ্যমে। তাতেও যেন ব্যবসায়ীদের মুক্তি মিলছে না। পণ্যের বিপরীতে চেক দেয়া হলেও সেই চেকটি নগদায়ন না হয়ে অপর্যাপ্ত ব্যালেন্সের কারণে ডিজঅনার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এতে আদালতের চেক প্রতারণা মামলা হলেও ব্যবসায়ীদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে সেইসব মামলা ঝুলে থাকে। আবার দীর্ঘ সময় পর মামলা রায় হলেও ততদিনে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
খাতুনগঞ্জের কয়েকজন প্রবীণ ব্যবসায়ী জানান, বিশ্বাসই ছিলো খাতুনগঞ্জের মূল ভিত্তি। সাদা কাগজে লিখে শত শত কোটি টাকার লেনদেন হতো। কখনো কোনো ব্যবসায়ী কারো টাকা মেরে উধাও হয়ে যাওয়ার চিন্তা করেননি। তবে দুঃখজনক ঘটনা হলো- গত ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি বছর কিছু কিছু ব্যবসায়ী আরেক ব্যবসায়ীদের পাওনা বকেয়া রেখে উধাও হয়ে যেতে থাকে। তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হচ্ছে- ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনেও প্রতারিত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। দেখা যায়, পার্টি বাকিতে পণ্য কেনার বিপরীতে চেক দেন। কিন্তু দেখা যায়, চেকে উল্লেখিত নগদায়নের দিন ব্যাংকে অপর্যাপ্ত ব্যালেন্সের কারণে চেক ডিজঅনার হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আদালতের দ্বারস্থ হন। এতে ব্যবসায়ীদের সময়ের পাশাপাশি অর্থেরও অপচয় হয়। এসব ঘটনায় অনেক ব্যবসায়ী অব্যাহতভাবে লোকসান দিতে দিতে এক সময় ব্যবসা গুটিয়ে নিতেও বাধ্য হন। এদিকে খাতুনগঞ্জে আলোচিত চেক প্রতারণার মামলার ঘটনার অন্যতম হলো ইছাক ব্রাদার্সের এমডি হাজী মো. ইউনুস বিরুদ্ধে মেসার্স জে কে ট্রেডিংয়ের স্বত্ত্বাধিকারি মো. জাহাঙ্গীর আলমের করা মামলাটি। ৪ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার চেক প্রতারণার অভিযোগ এনে চলতি বছরের ২২ মে চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা ঠুকে দেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ইছাক ব্রাদার্সের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান টিএন্ডটিএস এন্টারপ্রাইজের সাথে খাতুনগঞ্জের জে কে ট্রেডিংয়ের দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা চলে আসছিলো। ব্যবসায়িক সূত্রে আমদানি করা গমের ডিও ক্রয় করে চেক প্রদান করেন হাজী মো. ইউনুছ। ব্যাংক এশিয়ার আগ্রাবাদ শাখার অনুকূলে ৪ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার একটি চেকটি তিন মাস ধরে নগদায়ন না হওয়ায় আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। তারপরও প্রাপ্য টাকা পরিশোধ হয়নি। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন।
এদিকে গত মঙ্গলবার চেক প্রতারণার মামলায় মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম নামের খাতুনগঞ্জের এক ব্যবসায়ীকে এক বছরের জেল ও ৩৫ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন আদালত। জানা গেছে, ইউসিবিএল খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে মেসার্স তানভীর এন্টারপ্রাইজ নামে ঋণ নিয়ে পরিশোধের জন্য ৩৫ লাখ টাকার একটি চেক দেন ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম। নির্ধারিত সময়ে চেকটি ডিজঅনার হলে ২০১৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ব্যাংকের এভিপি জহির আহমদ বাদী হয়ে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন।
এবিষয়ে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলায়মান বাদশা দৈনিক আজাদীকে বলেন, চেক ডিজঅনার হওয়াটা যেন চাক্তাই খাতুনগঞ্জে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একটা সময় ব্যাংক ছিলো না। সাদা কাগজে লেনদেন হতো। তখন কারো টাকা কেউ মেরে খায়নি। সব মিলিয়ে নিজেদের মধ্যেই এক ধরণের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই চেক প্রতারণাকারী ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। তাহলে অন্যরা সতর্ক হবে।

x