খাগরিয়ায় ফুল চাষে বিপ্লব পাল্টে গেছে অনেক কৃষকের ভাগ্য

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া

সোমবার , ১১ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
66

ফুল সুন্দর ও সম্প্রীতির প্রতীক। ফুলকে ভালবাসেনা এমন মানুষ পৃথিবীজুড়ে পাওয়া মুশকিল। সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের কাছে ফুলের আবেদন চিরন্তন। কবি সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত ফুল প্রেমিকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি, দু’টি যদি জোটে তবে একটিতে ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী’। ফুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। ফলে ভালবাসার ফুলে লেগেছে বাণিজ্যের ছোঁয়া। সাতকানিয়ার খাগরিয়ায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আবাদ করা হচ্ছে নানা জাতের ফুল। অন্যান্য ফসলের চেয়ে অধিক লাভ হওয়ায় ফুল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে কৃষকরা। এখানকার কৃষকরা ফুল চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে। পাল্টে দিয়েছে অনেক কৃষকের ভাগ্য। আর্থিক দৈন্যতা কাটিয়ে বনে গেছে লাখপতি। শুধুমাত্র ফুল চাষে পুলকিত হয়েছে তাদের জীবনধারা। ফুল চাষ কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে শত শত বেকার নারী-পুরুষের। চর খাগরিয়ার প্রত্যেকটি পরিবার কোন না কোনভাবে ফুলের সাথে জড়ানো। ফুলের গ্রাম হিসেবে পেয়েছে নতুন পরিচিতি। জীবন-জীবিকার পথ সুগম করতে আলু, মরিচসহ নানা জাতের সবজির পরিবর্তে সবাই ফুল চাষে মনোনিবেশ করছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যথাযথভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানকার ফুল চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন স্পন্দন আনতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের চর খাগরিয়ার মেঠোপথ ধরে চলা শুরু করলেই চোখে পড়বে অভাবনীয় নয়নাভিরাম দৃশ্যমালা। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়েই শোভা পাচ্ছে বর্ণিল দৃশ্য। চারদিকে লাল, নীল, সাদা, হলুদ, গোলাপী, খয়েরী রঙের বাহার। যতদূর চোখ যায় রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, গাঁদা, জবা, ডায়মন্ড, গরম ফেনিয়া, রতপুসুটি, টুনটুনি, বেলি, জারবেরা, জিপসি, স্টারকলি বোতাম ফুল, ক্যালেন্ডেলা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, স্বর্ণগুঁটি, চেরি, চন্দ্রমল্লিকা ও অলকানন্দাসহ নানা জাতের ফুলের সমারোহ। রাস্তার দু’পাশের বিল জুড়েই দৃষ্টিনন্দন ফুল আর ফুল। খেত থেকে বাতাসে ভেসে আসা ফুলের মোহনীয় গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে পথিকের মন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত নারী, পুরুষ ও শিশুরা খেত থেকে ফুল ছিঁড়ছে। কেউ খেতের আগাছা পরিষ্কার, সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ নানা পরিচর্যা করছে। আবার অনেকে খেত থেকে ছিঁড়ে আনা ফুল নিয়ে বাড়ির আঙিনায় বসে মালা গাঁথছে। বিশেষ করে এলাকার শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মহিলারাও বসে বসে ফুল গাঁথা, আঁটি বাঁধাসহ নানা কাজে মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।
ফুল চাষীরা জানান, পুরো খাগরিয়া ইউনিয়নে কম বেশি ফুল চাষ হয়। তবে চর খাগরিয়ার প্রায় প্রত্যেকটি পরিবার ফুল চাষে জড়িত। এখানকার কয়েক শত পরিবার ফুল চাষ করে। যেসব পরিবার ফুল চাষ করেনা তারাও নানা ভাবে ফুলের সাথে জড়ানো। এমনকি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে মেয়েরাও অবসর সময়ে ফুল ছিঁড়া, মালা গাঁথাসহ নানা কাজে সহযোগিতা করে। ফুল চাষ চর খাগরিয়ার মানুষের অভাব দুর করেছে। ফুল চাষ করে প্রায় পরিবার স্বাবলম্বি হয়ে উঠেছে।
সাতকানিয়ার চর খাগরিয়ার ফুল চাষি আবদুল গফুর জানান, ১৯৯১ সালের দিকে তার বড় ভাই আবদুল মোতালেবের হাত ধরেই খাগরিয়ায় ফুল চাষের যাত্রা শুরু হয়। তিনি ১৯৮৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেন। পরিবারের অভাবের তাড়নায় পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে চট্টগ্রামে একটি নার্সারীতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু চাকরির বেতন দিয়ে বাবা-মা ও ভাই বোনসহ ১২ জনের সংসারের চাকা ঘুরছিল না। অভাব অনটন লেগেই থাকতো। তখন কয়েক বছরের চাকরিতে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে গ্রামে এসে নেমে পড়েন ফুল চাষে। আবদুল মোতালেব মাত্র ২০ শতক জমিতে গাঁদা ফুল দিয়ে চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরই ভাল লাভ হওয়ায় পরের বছর থেকে ফুল চাষের পরিমাণ বাড়াতে থাকে। অন্যান্য ফসলের চেয়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় পরিবারের সবাই ফুল চাষের দিকে মনোযোগ দেয়। আর পেছনের দিকে ফিরে থাকাতে হয়নি। ফুল চাষে রাঙিয়ে যায় তাদের জীবন। পরিবারের সবাই মিলে ফুল চাষ করে পাল্টে নিয়েছে ভাগ্য।
আবদুল গফুর জানান, শুরুর দিকে ফুল বিক্রির জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে হতো। অনেক সময় সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হতাম। ফলে এভাবে কয়েক বছর যাওয়ার পর খাগরিয়ায় উৎপাদিত ফুলকে পুঁজি করে চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড়ের মোড় এলাকায় নিজেরাই স্টার পুষ্প বিতান নামে একটি দোকান দিই। আমাদের উৎপাদিত ফুলের পাশাপাশি অন্যান্য জায়গা থেকে ফুল কিনে এনে ব্যবসা শুরু করি। বছরের পর বছর ফুল চাষ বাড়াতে থাকি। পরে আরো একটি দোকান দিই।
তিনি জানান, কেটে গেছে আমাদের দুর্দিন। এক সময় অভাবের তাড়নায় আমরা ঠিক ভাবে লেখা পড়া করতে পারিনি। এখন আর আমাদের অভাব নেই। ফুল চাষকে পুঁজি করে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। এখন আমাদের থাকার পাকা বাড়ি, গাড়ি, জমি সব হয়েছে। ইচ্ছা মতো টাকা খরচ করে ভাই-বোনের বিয়ে দিয়েছি। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি। এবছরও আমরা প্রায় ২০ কানি জমিতে ফুল চাষ করেছি। ভবিষ্যতে আরো অধিক জমিতে ফুল চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরে তাদের দেখা দেখি এলাকার আরো অনেকে ফুল চাষ শুরু করেছেন। অন্যান্য ফসলের চেয়ে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকদের মাঝে ফুল চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দিন দিন ফুল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন সবাই। আর ফুল চাষের মাধ্যমে ফুলের মতো সুন্দর করে সাজিয়ে নিচ্ছেন জীবন। বর্তমানে সাতকানিয়ার চর খাগরিয়া এবং চন্দনাইশের জাফরাবাদে প্রায় ১ শত একর জমিতে নানা জাতের ফুল চাষ হয়।
চর খাগরিয়ার ওয়ালি পাড়ার সিকদার বাড়ির ফুল চাষি জাহাঙ্গীর আলম জানান, ৮ বছর বয়সে তার মা মারা যান। বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। সৎ মায়ের অত্যচার সহ্য করতে না পেরে প্রথমে নার্সারীতে পরে ফুলের দোকানে চাকরি নেন। এখন থেকে ১০ বছর আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ির পাশে খাজনা দিয়ে জমি নিয়ে ফুল চাষ শুরু করেন। প্রথম বছর মাত্র আট শতক জমিতে ফুল চাষ করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়। পরে ফুল চাষ বাড়াতে থাকি। এবছরও দুই কানি জমিতে গ্লাডিওলাস, গাঁদা, জিপসিসহ বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করেছি। ফলন খুব ভাল হয়েছে। লাভও হয়েছে বেশ ভাল। আগামীতে আরো অধিক জমিতে ফুল চাষ করবো। তিনি জানান, চর খাগরিয়ার অন্তত কয়েক শত পরিবার এখন ফুল চাষে জড়িত। যে কয়েকটি পরিবার ফুল চাষ করেনা তারাও ফুল ছিঁড়া, মালা গাঁথাসহ বিভিন্ন কাজে জড়িত। জাহাঙ্গীর আরো জানান, এখন ফুল বিক্রি করতে কোন সমস্যা হয় না। আমরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুল ছিঁড়ে, মালা ও লড় গেঁথে তৈরি করে রাখি। রাতে এবং ভোরে পাইকাররা এসে এসব ফুল শহরে নিয়ে যায়। তিনি আরো জানান, মহিউদ্দিন, রফিক আহমদ, হেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ শফি, আবদুস ছবুর, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, কামাল উদ্দিন ও মোহাম্মদ ইকবালসহ অনেক যুবক ফুল চাষ করে পাল্টে নিয়েছে তাদের ভাগ্য।
চর খাগরিয়া এলাকার কয়েকজন ফুল চাষী জানান, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে এখানকার ফুলের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। পহেলা বৈশাখ, থার্টি ফার্স্ট নাইট, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, বিশ্ব ভালবাসা দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ফুলের দাম খুব ভাল পাওয়া যায়। তারা জানান, গত কয়েক বছর যাবৎ বিদেশ থেকে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি হওয়ায় কাঁচা ফুলের দাম একটু কমে গেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাঁচা ফুলের পাশাপাশি প্লাস্টিকের ফুলও ব্যবহার করছে। তারা জানান, প্লাস্টিকের ফুল আমদানি কমিয়ে সরকার ফুল চাষে পৃষ্ঠপোষকতা করলে কৃষকরা উপকৃত হবে। ফুল চাষীরা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে পারবে।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানান, সাতকানিয়া পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কম বেশি ফুল চাষ হয়। তবে খাগরিয়ায় ব্যাপক ভাবে ফুল চাষ হচ্ছে। চর খাগরিয়া এলাকার অনেক কৃষক ফুল চাষে জড়িত। এখানকার কৃষকরা চন্দনাইশের জাফরাবাদ এলাকাও ফুল চাষ করেন। ফুল চাষ করে কৃষকরা লাভবানও হচ্ছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা দিনদিন ফুল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এখানে বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ হয়। তবে গ্লাডিওলাস, গাঁদা, স্টার, জিপসি, বোতাম ও জারবেরা ফুল বেশি চাষ হয়।
খাগরিয়া এলাকায় দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দোলন কৃষ্ণ নাথ জানান, এক সময় খাগরিয়ায় আরো ব্যাপকভাবে ফুল চাষ করা হতো। বিগত কয়েক বছর প্লাস্টিকের ফুল বাজার দখল করায় লোকসানের কারণে ফুল চাষিরা আগ্রহ হরিয়ে ফেলছিল। ফলে বিগত কয়েক বছরে ফুল চাষ কিছুটা কম হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার প্লাস্টিকের ফুলের চেয়ে কাঁচা ফুলের ব্যবহার বাড়ছে। প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহারে মানুষের আগ্রহ কিছুটা কমে যাচ্ছে। ফলে ফুল চাষে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। খাগরিয়া এলাকায় গত কয়েক বছরের চেয়ে এবারে ফুল চাষ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

- Advertistment -