কয়লা না হিরা?

আহমেদ মুনির

মঙ্গলবার , ২৮ মে, ২০১৯ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
35

‘মানুষকে নিজের প্রতি আস্থাশীল হতে দাও। তাদের হয়ে উঠতে দাও শিশুর মতো অসহায়। কারণ দুর্বলতাই মহৎ, দৃঢ়তার কোনো মূল্য নেই। মানুষ যখন জন্মায়, তখন সে থাকে দুর্বল এবং নমনীয়। আর যখন তাঁর মৃত্যু হয় সে হয়ে পড়ে কঠিন ও সংবেদনহীন। যখন একটি গাছ গজায় সেটা নরম এবং নেতিয়ে পড়া। কিন্তু যখন শুকিয়ে যায়, মৃত্যু হয় সেটারও। কাঠিন্য এবং শক্তি মৃত্যুরই সঙ্গী। নমনীয়তা এবং দুর্বলতা মানুষের সজীবতারই প্রকাশ। কারণ কাঠিন্য কখনো জয়লাভ করে না।’
‘স্টকার’ চলচ্চিত্রের এই সংলাপ আন্দ্রেই তারকোভস্কির অনন্য দার্শনিক সারবত্তা। বহু বছর আগে দেখার পর থেকেই বিখ্যাত উক্তিটিও মনে স্থায়ী হয়ে যায় আমার।
তবে একবার ব্যক্তিগত একটা সংকটের সময় জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিটশের বইয়ের পাতা ওলাটাতে ওল্টাতে বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করি পুরোপুরি বিপরীত এক উপলব্ধিতে তিনি পৌঁছেছিলেন। তাঁর কয়লা ও হিরার মধ্যে কথোপকথনের গল্প অনেকেরই জানা। কয়লার প্রশ্ন ছিল হিরার প্রতি, ‘তুমি কেন এত কঠিন? আমরা কী জাতভাই নই? হিরার পাল্টা প্রশ্ন, ‘কেন এত নরম তুমি, কেন এত দুর্বল, আমরা তো ভাই। তবু আমি কঠিন বলেই এই দ্যুতি’…
১৮৮৯ সালে প্রকাশিত নিটশের ‘টোয়াইলাইট অব দা আইডল’ বইতে এই বিষয়ের উল্লেখ আছে।
নিটশে প্রচলিত সব ধরনের নৈতিকতা বাতিল করেছেন। হতাশ হয়ে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর বেঁচে নেই’। আমরাই তাঁকে হত্যা করেছি। ঈশ্বরবিহীন এই পৃথিবীতে মানুষ কার ছায়াতলে বাঁচবে? কার কাছেই বা ত্রাণ চাইবে। নিটশে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তারও। মানুষই হবে তার ভাগ্যের নিয়ন্তা। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কল্পনা করেছেন এক ‘মহৎ মানুষ’ যিনি নিজের আপন ইচ্ছায় নিজেকে ব্যাখ্যা করেন এবং নিজের মূল্য নিজেই তৈরি করেন।
নিটশের ভাষায় ব্যক্তিগত শোক, হতাশা ও আকাঙ্ক্ষার মাঝে ডুবে যায় যারা তারা ঊন মানব। তার পক্ষে মহৎ কোনো সত্যে পৌঁছান সম্ভব নয়। নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে না নিলে সে মানুষ কি করে সৃজন করবে, হয়ে উঠবে নিজের ঈশ্বর?
নিটশের এই উপলব্ধি যে কাউকে জাগিয়ে তুলতে পারে দিতে পারে নতুন প্রাণ শক্তি। যদিও তাঁর অনুসারীদের অনেকে পৃথিবীতে যুদ্ধ ও গণহত্যার মতো ঘৃণ্য কাজ করেছেন তবু, এই উপলব্ধি নতুন এক শক্তির সম্ভাবনা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় ভেঙে পড়া অসহায় মানুষের সামনে। সেটা ব্যক্তিগত পরিত্রাণ বিষয়ে। এর সঙ্গে রাজনীতি ও সমাজের যোগ নেই।
জীবন-যাপনের আবর্তনের অভ্যস্ত নিয়ম সাধনা করে কত মানুষ পৃথিবীতে ঝরে গেছে। পৃথিবী তাদের বেদনা আর বেঁচে থাকার ইতিহাসকে কেবলই মাটি চাপা দিয়ে গেছে। সে জায়গায় নতুন প্রাণের স্ফুরণ ঘটেছে। মানব-সভ্যতা টিকে আছে এ জন্যই। লুপ্ত হয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়াই তো প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু বেদনার এই আবর্তনকে চিনতে পেরেছে কয়জন? বুদ্ধ যেমন বলেছেন, ‘অজ্ঞতাই সব দুঃখের কারণ।’ তাই জীবনের সার, সত্য কথাটার কাছে পৌঁছাতে হবে। সেটাই পরম জ্ঞান বা উইজডম।
আজ মনে হচ্ছে আত্মশক্তি অর্জনের একমাত্র উপায় নিজের তুচ্ছ বাসনা, হতাশা আর ব্যর্থতার বোঝাকে চেপে ধরা। জোরে চেপে ধরে কয়লা থেকে তাকে হিরায় পরিণত করা। তবে কী দেখা পাব সেই পরম মানবের? যে নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রক? রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার সংকটে এক মহামানবের উত্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কোথায় সেই মহামানব অথবা পরম মানব? ঊন মানব বা অব মানবের এই পৃথিবীতে সেই মহামানবের সন্ধান কে দেবে আমাদের?
নিটশে পড়তে পড়তে এসব প্রশ্ন ভিড় করছে মাথায়। আমি নাঙ্গা তরবারি হাতে কোনো যোদ্ধার স্বপ্ন দেখছি না। কেবল দেখছি একজন মানুষের স্বপ্ন, যে নিজের স্মৃতিকে বরফে জমিয়ে রাখতে পারে। একাকিত্বকে ভরিয়ে তুলতে পারে দৃঢ়তা আর নীরবতায়। পেছনে অতীতের আততায়ী, তাকে ক্ষমাহীনভাবে মেরে ফেলতে হবে। এই উপলব্ধিতে ছেয়ে আছে মন। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমি এটুকু আলো পেয়ে গেছি।

x