ক্ষোভে-বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েট

আবরার হত্যা ।। ১০ জন রিমান্ডে, গ্রেপ্তার আরো ৩ ।। দুদিন ধরে না খেয়ে বাকরুদ্ধ মা

আজাদী ডেস্ক

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
176

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ খুনের বিচার দাবিতে আন্দোলনে নামা বুয়েট শিক্ষার্থীরা মামলার অভিযোগপত্র না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েটে ক্যাম্পাসে উপাচার্যের কথায় সন্তুষ্ট না হওয়ার পর আন্দোলনরতদের মুখপাত্র হিসেবে সন্ধ্যায় এই ঘোষণা দেন ২০১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবুল মনসুর। খবর বিডিনিউজের।
তিনি বলেন, যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তাদেরকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। মামলার চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত বুয়েটের আসন্ন ভর্তি পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক এবং প্রশাসনিক কাজ স্থগিত থাকবে। পাশাপাশি আন্দোলনও চলবে। হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর আন্দোলনরতদের দাবির মুখে তাদের সামনে হাজির হয়ে তোপের মুখে পড়েন উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। গত রোববার রাতে বুয়েটের শেরে বাংলা হলে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার মারা যান বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার গ্রেপ্তার ১০ আসামিকে পাঁচদিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ। চকবাজার থানায় আবরারের বাবার করা মামলায় গতকাল গ্রেপ্তারদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছিল পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে বুয়েটের আরো তিন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা হলেন মনিরুজ্জামান মনির (২১), মো. আকাশ হোসেন (২১) ও শামসুল আরেফিন রাফাত (২১)। এই তিনজন আবরারের বাবার করা মামলার এজাহারনামীয় আসামি।
আবরারকে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। জানাজা স্থল রূপ নেয় প্রতিবাদ সমাবেশে। ফাহাদের মা রোকেয়া বেগম দুদিন ধরে না খেয়ে আহাজারি করতে করতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। জানাজার নামাজের পর জ্ঞান হারানোর উপক্রম বাবা বরকত উল্লাহর।
এদিকে, শেরে বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ জাফর ইকবাল খানের পদত্যাগের দাবি তুলে বুয়েট শিক্ষার্থী মনসুর বলেন, প্রভোস্ট ঘটনার পরেও দায়িত্ব পালন করেননি। বরং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এজন্য অবিলম্বে প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি করছি।
আবরারের বাবা কুষ্টিয়াবাসী অবসরপ্রাপ্ত ব্র্যাককর্মী বরকতুল্লাহ মোট ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় ১৩ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে অতি সত্বর মামলার নিষ্পত্তি করতে অপরাধীদের সাজা কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন আন্দোলনকারীরা।
আবরারকে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় বুয়েট ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে সংগঠনটি।
১০ আসামি রিমান্ডে : আবরার হত্যা মামলার গ্রেপ্তার ১০ আসামিকে পাঁচদিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ। যাদেরকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে তারা হলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, দ্বিতীয় বর্ষ), সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, দ্বিতীয় বর্ষ), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, চতুর্থ বর্ষ), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, চতুর্থ বর্ষ), ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, চতুর্থ বর্ষ), উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল (বায়ো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, তৃতীয় বর্ষ), সদস্য মুনতাসির আল জেমি (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ), মো. মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, তৃতীয় বর্ষ) এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির ও একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে সাতজনের নাম ছাত্রলীগের বহিষ্কৃতদের তালিকাতেও আছে। এরা হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশাররফ সকাল ও মুনতাসির আল জেমি।
গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আরাফাত লেলিন বলেন, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করতে আমাদের অভিযান চলছে।
পেটানোর কথা ‘স্বীকার’ : হত্যামামলার পরপরই গ্রেপ্তার ১০ জন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবরার ফাহাদকে পেটানোর হত্যা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। হেফাজতে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরো তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন।
তিনি বলেন, মামলার প্রথম দিন থেকেই গোয়েন্দা তদন্ত শুরু করেছে। কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে, কারা কারা জড়িত, কার কী ভূমিকা ছিল, এর আগে নির্যাতনের কোনো ঘটনা তারা ঘটিয়েছে কিনা, তা তদন্ত করে বের করা হবে। মামলায় যে ১৯ জনের নাম দেওয়া হয়েছে, এর বাইরে আর কেউ জড়িত আছে কিনা, সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আবরারকে নির্যাতনের ঘটনায় বুয়েট ছাত্রলীগের আরেক নেতা অমিত সাহার জড়িত থাকার অভিযোগ শিক্ষার্থীরা করে আসছেন, যার নাম মামলায় নেই। তিনি বলেন, অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা সে ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এখানে কেউ ছাড় পাবে না। তদন্তে যারই নাম আসবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
গোয়েন্দা পুলিশের অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, অমিত সাহা নামে যে শিক্ষার্থীর নাম বলা হচ্ছে, সে গত ২ অক্টোবর দেশের বাড়ি গেছে বলে জানা গেছে। তারপরেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, তদন্তের প্রথম দিনই বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। শেরে বাংলা হল ছাড়াও আরো কিছু হলে প্রায়ই নির্যাতন হত। কিছু ভুক্তভোগী পাওয়া গেছে। তারা কিছু তথ্য দিলেও নাম প্রকাশ করার অনুরোধ করেছেন।
এদিকে আবরার হত্যা মামলায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমার দেওয়ার জন্য আগামী ১৩ নভেম্বর দিন ঠিক করেছেন ঢাকার মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী। তিনি গতকাল মামলার এজাহার গ্রহণ করে প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ধার্য করে দেন।
তোপের মুখে উপাচার্য : আবরার ফাহাদ হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে এসে তোপের মুখে পড়তে হয়েছে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে তিনি ‘নীতিগতভাবে’ একমত জানালেও আট দফা মেনে নেওয়ার সুস্পষ্ট ঘোষণা না পেয়ে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা বন্ধসহ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনরতরা।
আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নানা কর্মসূচির মধ্যে গতকাল বেলা সাড়ে ১০টার দিকে বিভিন্ন হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বুয়েট শিক্ষার্থীরা জড়ো হন তাদের ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে। সেখানে আট দফা দাবিনামা তুলে ধরেন তারা।
উপাচার্য কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, তা তাকে ক্যাম্পাসে এসে মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে ব্যাখ্যা করতে দাবি তোলা হয়। উপাচার্য বিকাল সোয়া ৪টার পর ক্যাম্পাসে এলেও শহীদ মিনারে বিক্ষোভস্থলে না গিয়ে নিজের কার্যালয়ে চলে যান।
দিনভর শহীদ মিনার চত্বরে বিক্ষোভের পর শিক্ষার্থীরা বিকাল ৫টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে উপাচার্য কার্যালয়ের নিচে অবস্থান নেন।
কয়েকশ শিক্ষার্থীর ওই অবস্থান থেকে স্লোগান ওঠে, ‘ভিসি স্যার নীরব কেন, জবাব চাই দিতে হবে’, ‘আমার ভাই কবরে, ভিসি কেন ভেতরে’, ‘প্রশাসন নীরব কেন, জবাব চাই দিতে হবে’। সেই সঙ্গে চলতে তাদের মূল স্লোগান, ‘আবরারের খুনিদের, ফাঁসি চাই দিতে হবে’।
সাড়ে ৫টার দিকে উপাচার্য কার্যালয়ের ফটকেও তালা দেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য যখন তাদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন, তখন তালা খুলে দেওয়া হয়। সন্ধ্যা ৬টার পর উপাচার্য দোতলা থেকে নেমে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সামনে এলে শুরু হয় হট্টগোল।
এ সময় তিনি বলেন, আমাদের ইউনিভার্সিটির যে নিয়ম, যে অনুযায়ী আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করবে। তদন্ত কমিটি কাজ করবে, তোমরা যেভাবে চাইছো, আমরা সেভাবে বহিষ্কার করব। তিনি আরো বলেন, তোমাদের সবগুলো দাবি আমরা নীতিগতভাবে মেনে নিচ্ছি। সেগুলো অবশ্যই মানা হবে।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্ট ঘোষণার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। উপাচার্যের অনুপস্থিতি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন তারা। এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করেন, আবরার হত্যার ঘটনার পর কেন আপনি ক্যাম্পাসে আসেননি? জবাবে উপাচার্য বলেন, আমি ক্যাম্পাসে ছিলাম। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন।
আবরারের জানাজায় না আসার কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক সাইফুল বলেন, আমি সারাদিন মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, মিটিং করেছি। এগুলো না করলে দাবিগুলোর সমাধান হবে কীভাবে? সব তো আমার হাতে নেই। তোমাদের দাবির সঙ্গে আমি একমত। উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের উপায় বের করা হচ্ছে। আমি কাজ করে যাচ্ছি।
তখন আরেক শিক্ষার্থী জানতে চান, স্যার আপনি কী কাজ করছেন? উপাচার্য বলেন, তোমাদের এই ব্যাপারটি নিয়ে কাজ করছি। আমি রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করেছি।
শিক্ষার্থীদের ৮ দফা : ১. খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করে তাদের আজীবন বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ৩. দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। ৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, তা তাকে ক্যাম্পাসে এসে মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে। ছাত্রকল্যাণ শিক্ষককেও (ডিএসডব্লিউ) বিকাল ৫ টার মধ্যে সবার সামনে জবাবদিহি করতে হবে। ৫. আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। আহসানউল্লা হল ও সোহরাওয়ার্দী হলে ঘটা আগের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে বাতিল করতে হবে। ৬. রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে। ৭. মামলার খরচ এবং আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। ৮. বুয়েটে সব রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে।
এদিকে আবরার ফাহাদের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ। তিনি বলেন, আমরা অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ হয়েছি। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবরারের জন্য গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল হয়।
কুষ্টিয়ায় দাফন : আবরারের মরদেহ কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে দাফন হয়েছে। গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে লাশবাহী গাড়ি কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোড এলাকায় তাদের বাড়িতে আসে। সেখানে ভোর থেকেই আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী ভিড় জমায়। এখানে প্রথম জানাজা শেষে গ্রামের বাড়ি কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গায় নেওয়া হয় মরদেহ।
লাশবাহী গাড়ি গ্রামে পৌঁছালে প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী ছাড়াও আশপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ আসে মৃত ফাহাদকে শেষবারের মতো দেখার জন্য। সেখানে হৃদয়-বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শোকবিহ্বল পরিবেশে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি কেউ। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ।
আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ ফাহাদের জন্য সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। জানাজায় অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষ সমস্বরে প্রতিবাদের কণ্ঠ মেলান ফাহাদের বাবার সঙ্গে।
দাফন শেষে কবর জিয়ারত করার পর ফাহাদের বাবার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়। তিনি অসুস্থ বোধ করেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার দরকার হয়নি। এদিকে ফাহাদের মা রোকেয়া বেগম দুদিন ধরে না খেয়ে আহাজারি করতে করতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
ফাহাদের ফুফু আকলিমা খাতুন বলেন, এই দেশে কি কোনো বিচার ব্যবস্থা আছে? এমন সুনার টুকরা ছেলেটা যেদিন বাড়ি থেকে গেল সেদিনই ঘতকরা মায়ের বুক খালি করল। বুয়েটের মতো জায়গায় যদি এমন ঘটনা হয় তাহলে কিভাবে আর কোন মা-বাপ সন্তানদের পড়তি পাঠাবি। এই ঘটনা তো সব বাপ-মার মধ্যি আতংক সৃষ্টি কইরি দিল।
চাচাত বোন রেহেনা খাতুন কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ফাহাদের গুণাগুণ বইলি শেষ করা যাবি না। ও কারও সাথে কোনো দিন মুখ তুলি কথা কয়নি। ভদ্র, নম্র, নামাজ-কালাম আর বই ছিল ওর একমাত্র সঙ্গী। এই বই-ই ওর জীবনের কাল হলি।
প্রতিবাদ সমাবেশে রূপ নেয় জানাজা স্থল : দাফন চলার সময় হঠাৎ করে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শোকার্ত মানুষেরা। প্রতিবাদের স্লোগান দেন তারা। সড়ক অবরোধ করে শুরু করেন প্রতিবাদ। স্লোগানে প্রকম্পিত হয় গোটা এলাকা। তারা ‘শেখ হাসিনার বাংলায় খুনিদের ঠাঁই নাই’, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় খুনিদের ঠাঁই নাই’, ‘ফাহাদ ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘ফাহাদের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই’ স্লোগান দেন।
নির্যাতনকারীরা মদ্যপ! : আবরারকে পিটিয়ে মারার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে, ছাত্রলীগের সেই নেতাকর্মীরা তখন ‘মাতাল’ ছিলেন বলে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে। বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারের ওপর নির্যাতন কয়েক ঘণ্টা ধরে চললেও তখন হল প্রশাসন ‘নির্লিপ্ত’ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনটি।
হলের শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সদ্য স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির সমালোচনা করে ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর গত রোববার রাত ৮টার দিকে হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নেওয়া হয় তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (সপ্তদশ ব্যাচ) শিক্ষার্থী আবরারকে। তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়ি থেকে হলে ফিরেছিলেন। এরপর রাত ২টার দিকে হলের সিঁড়িতে আবরারের লাশ পাওয়া যায়।
ছাত্রলীগের তদন্তে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ইয়াজ আল রিয়াদ বলছেন, দোষীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তারাও ওই ভিডিও ফুটেজ বিবেচনায় নিয়েছেন। এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সাধারণ শিক্ষার্থী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই সোমবার এ ঘটনায় বুয়েটের ১১ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে ছাত্রলীগ।
ইয়াজ আল রিয়াদ বলেন, সেদিন রাতে (রোববার) যারা এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছে তারা পূজায় গিয়েছিলেন। সেখানে তারা মদ পান করেছিলেন। তারা সবাই মারাত্মক রকমের ড্রাংক ছিলেন। তাদের মধ্যে মানবিকতা বলে কিছুই ছিল না। সেখান থেকে এসে তারা একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে আবরারকে তার ১০১১ নম্বর রুম থেকে ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে গিয়ে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। যার প্রেক্ষিতে আবরারের মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটে। তার ভাষ্যমতে, আবরারকে নির্যাতনের ওই কক্ষে তিন থেকে চারজন শিক্ষার্থী থাকেন। অন্যান্য রুমের কিছু লোক এই নির্যাতনে অংশ নিয়েছিলেন।
নির্যাতনের সময় বাইরে থেকে কেউ চিৎকার-আর্তনাদ শোনার খবর জানা গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যখন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তখন এগুলো বাইরে যায় না। তখন দরজা-জানালা বন্ধ থাকে বলে আমরা জানতে পেরেছি।
নির্যাতনের এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে আবরার মোবাইলে তার বন্ধু ও সহপাঠীদের সাহায্য চেয়ে সাড়া পাননি বলে এই ছাত্রলীগ নেতার দাবি। তিনি বলেন, তদন্তে আরো পেয়েছি, ওই রাতে বার্সালোনার খেলা ছিল। পূজা থেকে এসে আবরারকে শারীরিক নির্যাতনের পর তারা বার্সেলোনার খেলা দেখতে চলে গিয়েছিলেন। আবরার এই ফাঁকে তার এক বন্ধুকে ফোন করে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার বন্ধু তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেননি। সে আসলে এমন একটি অপমৃত্যুর মতো ঘটনা নাও ঘটতে পারত।
আবরার হত্যাকাণ্ডের পর দেশব্যাপী প্রতিবাদ-সমালোচনার মুখে ইয়াজ আল রিয়াদের সঙ্গে সংগঠনের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসিফ তালুকদারকে দিয়ে এই তদন্ত কমিটি করে ছাত্রলীগ।
দায় প্রশাসনের : হলের মধ্যে অন্য ছাত্রদের হাতে নির্যাতিত হয়ে আবরারের মৃত্যুর জন্য প্রশাসনের ‘দায়িত্বহীনতা ও নির্লিপ্ততাকেও’ দায়ী করেছেন ছাত্রলীগ নেতা রিয়াদ। তিনি বলেন, হলের মধ্যে রাতভর কয়েক ঘণ্টা ধরে একটা ছাত্রকে নির্যাতন করা হলেও প্রশাসন কেন বিষয়টি জানতে পারল না? হলের প্রভোস্ট, আবাসিক শিক্ষকরা তাহলে কী দায়িত্ব পালন করলেন? এই ঘটনায় প্রশাসন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা কোনোভাবেই এর দায়ভার এড়াতে পারে না। তাছাড়া ফেইসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারো মত প্রকাশে ছাত্রলীগ বাধা হতে পারে না বলেও মত দেন তিনি।

x