ক্ষমা প্রার্থনা

সুজন সাজু

বুধবার , ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
22

দুজনেই একই ক্লাসে পড়ে। সৈকত আর ছোটন দুজনেই মেধাবী ছাত্র। সৈকতের রোল এক, ছোটনের দুই। বলতে গেলে এই দুজনের মধ্যেই চলে ক্লাসে মেধার প্রতিযোগিতা। সেই ষষ্ঠ থেকে নবম পর্যন্ত এক আর দুয়ের মধ্যে আছে এই দুজনই। ওদের মেধা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই কারো। কিন্তু সৈকত আর ছোটন আলাদা একটি পরিচয় বহন করে চলে। ছোটনের পরিচয়টি খুবই সম্মানীয় হলেও সৈকতের পরিচয়টি এলাকার লোকে ঘৃণার চোখে দেখে। যদিও এই পরিচয়ের জন্য সৈকত কোন ভাবেই দায়ী নয়। সৈকতের জন্মও হয়নি তখন। এমনকি তার বাবারও কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। যা করেছে পুরো দায়টার জন্য একমাত্র দায়ী সৈকতের দাদু। সৈকতের দাদু ছিল এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। তখনকার সময়ে বেশ কয়েকবার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করে কখনো জয়লাভ করতে পারেনি সৈকতের দাদু মতলব সাহেব। কারণ মতলব সাহেবের বিভিন্ন কর্মকান্ড ছিল বিতর্কিত। এমন লোক যদি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয় তাহলে কী অবস্থা বিরাজ করবে তা সহজেই অনুমেয়। তাই মতলব সাহেবকে এলাকার লোকেরা পছন্দ করতো না। এই পরিস্থিতিতে দেশে শুরু হলো স্বাধীনতার যুদ্ধ। সবাই যখন শেখ মুজিবের ভাষণ শুনে যে যার মতো করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, অই সময় মতলব সাহেব যোগ দিল রাজাকারের দলে। মতলব সাহেবের মতলব ছিল, এই সুযোগে জায়গা সম্পত্তি পুরোটা দখল করা। সারাদেশে যখন যুদ্ধ শুরু হলো, এলাকার অনেকে যোগ দিল মুক্তির সংগ্রামে। তার মধ্যে ছিল ছোটনের দাদুও একজন। ছোটনের দাদু ছিল তখন পরিপূর্ণ যুবক। ছোটনের দাদু নৃপতি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ভীষণ সাহসিকতার সাথে। ওরা এলাকায় ছিল না তখন। পুরুষরা যখন যুদ্ধের মাঠে লড়াইয়ে অবতীর্ণ , তখন এই মতলব রাজাকার পাক বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে ধ্বংসলীলায় মেতে উঠল। জীবন রক্ষায় পালিয়ে বেড়াল নারী, শিশু বৃদ্ধারা। যারা পালিয়ে যেতে পারেনি, তাদের অনেককে জীবন দিতে হয়েছে রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় পাক হায়েনার হাতে। অনেক মা বোনেরা হয়েছে অত্যাচারের শিকার। সারা দেশে এই মুক্তির সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করলো লক্ষ লক্ষ বীর সেনানী। দীর্ঘ নয় মাস লড়াই শেষে যখন পরিপূর্ণ বিজয়ের হাওয়া বেশে বেড়াচ্ছে, ধীরে ধীরে বেঁচে যাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধারা ফিরতে শুরু করলো নিজ নিজ গ্রামে। অনেকেই এসে দেখে কারো বাড়িঘর কিছুই নেই। সব ধ্বংস করে দিয়েছে রাজাকারদের সহায়তায় পাক বাহিনীরা। যুদ্ধ শেষে অনেক রাজাকার এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। যেসব রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধারা বাগে পেয়েছে, তাদের দিয়েছে কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি। রাজাকার মতলবের প্রতি ছিল আরো বেশি ঘৃণা ও ক্ষোভ। পুরো গ্রামে ঘুরালো গলায় জুতার মালা পরিয়ে। তবুও এই ঘৃণিত মতলব রাজাকারের কিছু হয়নি। পুরো এলাকায় মতলব রাজাকার হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও মতলব রাজাকার এখন বেঁচে নেই। বেঁচে নেই ছোটনের দাদু মুক্তিযোদ্ধাও। কিন্তু মতলব রাজাকারের ঘৃণিত কর্মকান্ড আজো তার পরবর্তি প্রজন্ম বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তারই ফলশ্রুতিতে এই সৈকতকে সবাই মতলব রাজাকারের নাতি বলেই চেনে। অন্যদিকে ছোটনকে চেনে মুক্তিযোদ্ধার নাতি হিসেবে। যেন দাদুর সম্মানে নাতিও সম্মানীত। সৈকত ও ছোটনের এই দুই পরিচিতি তাদের স্কুলেও ভিন্নভাবে দেখে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাতি, অন্যজন ঘৃণিত রাজাকারের নাতি। স্কুলে বিভিন্ন জাতীয় দিবস অনুষ্ঠানের সময় ছোটনের ডাক পড়ে প্রথমেই। স্কুলের স্যারেরাও মুক্তিযোদ্ধার নাতি ছোটনকে এগিয়ে রাখে আগে। বিষয়টা নিয়ে সৈকতের মনটা থাকে বিষণ্ন। অথচ সৈকত গান,কবিতা আবৃত্তি,তবলা সবই তার জানা। ক্লাসের রোলও এক। তবুও তাকে অংশগ্রহণের জন্য তেমন আগ্রহ দেখাই না কোন স্যারেরা। এবারো বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান হবে স্কুলে। ছোটনকে ডেকে হেড স্যার সব কিছু বুঝিয়ে দিল। সৈকতকে কোন ভূমিকা রাখতে সুযোগ দেয়নি। যথা সময়ে বিজয় দিবসের অনুষ্টান শুরু হলো। সৈকতও এলো অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানের সকল অতিথিরা মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করলো, স্মৃতিচারণে ছোটনের দাদুর বীরত্ব গাঁথাও উঠে এলো এবং সম্মান জানালো। ঘৃণা প্রকাশ করলো রাজাকারদের প্রতি। সভাপতির ভাষণের আগে কারো কোন অনুভূতি জানার আগ্রহ থাকলে জানানোর অনুরোধ করলো। যে কজন হাত তুলল, তাদের মধ্যে সৈকতও হাত উঠালো। সৈকতের আগ্রহ দেখে সবাই চমকে গেল। মনে মনে ভাবল রাজাকারের নাতি আবার কী অনুভূতি প্রকাশ করবে? সভাপতি ইশারা দিল সুযোগ দেওয়ার জন্য। মুক্তিযোদ্ধার নাতি হিসেবে ছোটন তার দাদুর গৌরবময় ইতিহাসের স্মৃতিকথা বর্ণনা করলো। তার দুজনের পরেই সৈকতের ডাক পড়ল। ধীর পায়ে মঞ্চে এগিয়ে এলো সৈকত। এতকিছুর পরও সৈকতের মনোবল একটুও টলেনি। শুরুতেই উপস্থিত সকলের প্রতি বিজয়ের শুভেচ্ছা জানাল। পরে নিজের পরিচয় বলতে গিয়ে বলে উঠে, আপনারা সবাই আমাকে একজন রাজাকারের নাতি হিসেবে চিনেন। কিন্তু এই পরিচয়টা আমার হৃদয়ে কি যে রক্তকরণ ঘটায় তা একমাত্র আমিই জানি। আপনারা কি একটুও ভেবে দেখেছেন? আমি এর জন্য কোন ভাবেই দায়ী হতে পারি না। তখন আমার জন্মও হয়নি। এমনকি আমার বাবারও কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল না। জানি আমার দাদু যা করেছে, তা কোন দেশপ্রেমিকের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভবপর নয়। এমনকি আমিও মেনে নিতে রাজি নয়। তাই আজকের এই বিজয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন রাজাকারের নাতি হিসেবে করজোড়ে ক্ষমা চাচ্ছি। এবং আমার দাদু মতলব সাহেবের এই দেশ বিরোধী কর্মকান্ডের প্রতি জানাচ্ছি প্রচন্ড ঘৃণা। এদেশ আমার জন্মভূমি, এই দেশ আমার ভালোবাসা। উপস্থিত সকলে সৈকতের কথায় আবেগ প্রবণ হয়ে গেল। স্যারেরা সৈকতের মাথায় হাত বুলিয়ে সোহাগের আলিঙ্গনে ভরিয়ে দিল। সভাপতির ভাষণে সৈকতের কথা যুক্তিগ্রাহ্য বলে সকলের উদ্দেশ্যে তুলে ধরল। আজকের প্রজন্মরা তাদের পূর্বসূরির ভুল বুঝতে পারল ,এটাই আমাদের জন্য গৌরবের এবং সান্ত্বনার বলে মনে করি।

x