ক্ষতিকর শিশু খাদ্য পরিহার করতে হবে

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:০৩ পূর্বাহ্ণ
54

মেয়াদোত্তীর্ণ শিশু খাদ্য বিক্রিসহ নানা অপরাধে ১০ প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি জরিমানা করা হয়েছে। দৈনিক আজাদীতে গতকাল প্রকাশিত খবরে বলা হয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের বাজার তদারকিমূলক অভিযানে এ সব প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে।

আমরা জানি, শিশু খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধের বিকল্প নেই। মায়ের দুধে শিশুর জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং উপকারী ১১০টি উপাদান আছে। শিশুর রোগ প্রতিরোধ, মেধা বিকাশ এবং বেড়ে উঠতে মায়ের দুধের বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বাজারে মায়ের দুধের বিকল্প যেসব খাদ্য বিক্রি হচ্ছে, তা শিশুর জন্য কতটা নিরাপদ, তা ভেবে দেখা দরকার। তার ক্ষতিকর দিকটি চিন্তা করে সেসব খাদ্য পরিহার করতে হবে৷ কিন্তু শিশুকে বিকল্প খাদ্য খাওয়ানোর বিষয়টি অনেক পরিবারের মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাই মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশু খাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইনটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সবার মধ্যে মায়ের দুধের পক্ষে সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি।

উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশ রহিত করে কয়েক বছর আগে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) নামের আইনটি পাস হয়েছে। আইনেই রয়েছে যে, স্বাস্থ্যকর্মীকে মায়েদের বিকল্প শিশুখাদ্যের অপকারিতা সম্পর্কে জানাতে হবে। অনেক মা ভাবেন, মায়ের দুধ বেশি ভালো, কোটার দুধ একটু কম ভালো। তাই শিশু বিশেষজ্ঞসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশাল ভূমিকা আছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন ও নজরদারি করা সম্ভব না। জেলা পর্যায় পর্যন্ত আইনের বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব, তা সরকারকে ভাবতে হবে। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ যাঁরা শিশুদের চিকিৎসা করেন, তাঁরাই অনেক সময় আইনটির প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ান। তাঁদের বুঝতে হবে যে আইনটি বাস্তবায়নে শিশুবিশেষজ্ঞদের অনেক ভূমিকা আছে।

নিরাপদ খাদ্যের অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা সম্পর্কে ১৯৮৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলেছিল, ‘খাদ্যনিরাপত্তা সব মানুষের সারা জীবনের জন্য মৌলিক খাদ্য প্রাপ্তির ভৌত এবং অর্থনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তাকে বোঝায়।’ ১৯৯৬ সালে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনের সুপারিশে বলা হয়েছিল, ‘খাদ্যনিরাপত্তা এমন একটি বিষয়, যেখানে জনগণ সব সময় ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যে প্রবেশের অধিকার লাভ করে, তাদের সুস্বাস্থ্য ও কর্মতৎপর জীবনের জন্য স্বাস্থ্য বিধিসম্মত প্রয়োজন মেটায়।’

খুব ভালো পুষ্টিকর খাদ্য খেলেও মানুষের রোগবালাই হবেই। রোগে হোক বা জরা ও বার্ধক্যজনিত কারণে হোক মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু বাসিপচা, দূষিত, ভেজাল বা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থমিশ্রিত খাদ্য খেয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করা অন্য ব্যাপার। তা রোধ করা সম্ভব। উন্নত দেশগুলো তা অনেক আগেই করেছে।

লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, বাংলাদেশের মতো প্রায়োন্নয়নশীল দেশে দুই রকমের সমস্যা: অপুষ্টিকর মানহীন খাদ্য এবং ভেজাল দূষিত খাদ্য। অনিরাপদ খাদ্য রোগের জন্ম দেয়, অপুষ্টিকর খাদ্য কোনো রোগ ছাড়াই স্বাস্থ্যহানি ঘটায়, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে, যৌবনেই নরনারীর যৌন দুর্বলতার কারণ ঘটায়, যার ফলে শুধু দাম্পত্য জীবন অসুখী হয় না, অসুস্থ ও দুর্বল সন্তানের জন্ম হয়, যারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বলই থাকে। দুর্বল স্বাস্থ্যের জনগোষ্ঠী দিয়ে সুস্থ, সবল, কর্মঠ জাতি গঠন সম্ভব নয়। সেই উন্নয়নশীলতা টেকসই হবে না। উন্নত দেশের সূচকের প্রধান মানদণ্ড নিরাপদ খাদ্য ও মানসম্মত ওষুধ। বাংলাদেশে প্রস্তুত ওষুধ মানসম্মত ও বিশ্বে প্রশংসিত। কিন্তু এই দেশেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে বাজার সয়লাব। তা ছাড়া, ভেজাল ওষুধ বেচাকেনা একটি নির্মম বাস্তবতা। কাগজে দেখেছি মিটফোর্ড জিঞ্জিরায় কি পাওয়া যায় না? বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জাতীয় মান প্রণয়ন ও মানের সনদ প্রদানকারী সংস্থা। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধে এর ভূমিকা খুব বেশি। যদিও এটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে।

অনিরাপদ খাদ্যের পরিস্থিতি আজ বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এই বিপদ থেকে রেহাই পেতে প্রশাসন ও নাগরিকদের কী করণীয়, তা নিয়ে আলোচনা দরকার। এ ব্যাপারে সচেতন নাগরিকদের স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করতে হবে।

x