ক্রাচের কর্নেল : ভগ্ন বেদনায় ক্রন্দন

শারমীন মজুমদার

শনিবার , ২৭ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ
111

স্বাধীন বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাসে বীরউত্তম কর্ণেল আবু তাহের এক বিস্ময়কর নাম। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এক বাংলাদেশকে নিয়ে যেখানে মানুষের মাঝে কোন শ্রেণি বৈষম্য থাকবে না, পুঁজিবাদী সমাজ থাকবে না, থাকবে না কোন ধর্মকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা। এই কর্নেল এক সাম্যবাদী কর্নেল, যিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে সমাজতন্ত্রমুখী করতে, কোন ধোঁয়াচ্ছন্ন বাংলাদেশকে সমাজতন্ত্র নয় বরং চেয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। কর্নেল তাহেরের জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘ক্রাচের কর্নেল’, রচয়িতা কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান। ঔপন্যাসিক শাহাদুজ্জামান তাঁর মননধর্মী সৃষ্টিতে তুলে এনেছেন কর্নেল আবু তাহেরের সংগ্রামমুখর দিনগুলোকে। পাশাপাশি এতে উঠে এসেছে ১৯৪৭ সাল পরবর্তী পূর্ব পাকিস্থানের সামরিক বাহিনীর বিপ্লবী সদস্য। তিনি সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিলেন ছাত্রাবস্থায়। অনুধাবন করেছিলেন এই সমাজতন্ত্রই দিতে পারে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি। কর্নেল তাহেরের সংগ্রামমুখর দিনগুলোকে ঔপন্যাসিক ছবির দিনলিপির আদলে রূপ দান করেছেন।
কর্নেল আবু তাহের, যাঁকে ঔপন্যাসিক বলেছেন ‘আউট অব দি বঙ’ বা ‘বৃত্তের বাহিরের ভাবুক’; তিনি বীরদর্পে মুক্িতযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। কর্নেল তাহের ছিলেন ১১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার। এ সেক্টরটির অবস্থান ছিল ভারতের মেঘালয় সংলগ্ন এবং এর হেডকোয়ার্টার ছিল মহেন্দ্রগঞ্জ। সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে সীমান্তের অপর পারে ছিল পাকসেনাদের দুর্ধর্ষ ঘাঁটি কামালপুর। অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে যুদ্ধে পাকবাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিলো কর্নেল তাহেরের ব্যক্তিগত মতাদর্শ, যুদ্ধ-সংগ্রাম এবং জীবন চরিত্রের একটি খন্ড বলা যেতে পারে ‘ক্রাচের কর্নেল’ উপন্যাসটিকে।
উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায় কর্নেল আবু তাহেরের স্ত্রী লুৎফা তাহের এবং তাঁর ছেলে মিশুকে। তাদের যান্ত্রিক জীবনের এক ছিন্ন্‌ পাতার খন্ড চিত্র প্রথমে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু উপন্যাসটির সমাপ্তি হয় কর্নেল তাহেরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। কর্নেল আবু তাহেরের জীবনাদর্শ তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের মাঝে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছিলো তা অন্য একটি বইয়ের দাবি করে। লুৎফা এবং মিশুর প্রতিদিনকার চিত্রকে একপাশে রেখে ঔপন্যাসিক পাঠককে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে চলেন সেই ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময়কালে কিংবা ১৯৬৮ সালের উত্তাল সময়ে যখন কর্নেল তাহেরের সাথে লুৎফার বিয়ে হয়। পাঠককে সময়ের স্রোতে এগিয়ে নিয়ে গুছিয়ে গল্প বলেন লুৎফা ও তাহেরের পরিবার জীবনের চুম্বকাংশ। তাহেরের ব্যক্তিজীবনের সমগ্র ইতিহাস এতো সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন লেখক, তাতে তাহেরের রাজনীতির প্রতি কিরূপ সমীহ ছিল তা বুঝে নিতে কোন অসুবিধা হয় না। মা আশরাফুন্নেসা ও বাবা মহীউদ্দীন আহমেদের তৃতীয় সন্তান আবু তাহের নান্টু। বৃহৎ পরিবারের ছেলেমেয়েদের কঠোর শৃঙ্খলায় বড় করেছেন মা আশরাফুন্নেসা। তাই হয়তো জীবনের চরম বির্পযয়ের মুর্হূতে এবং ধ্বংস বিধ্বস্ত পরিবেশেও তাঁরা স্থিতধীর থাকতে পেরেছিলেন। বাবার বার বার বদলির চাকরি ছেলে-মেয়েদের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ শেখার ক্ষেত্রে কোন বাধা হতে পারেনি। মা শ্রম বিভাজনের শিক্ষা দিয়েছিলেন বলেই কঠোর নিয়মানুবর্তিতার প্রশিক্ষণ তাঁদের শৈশব ও কৈশোরেই হয়ে যায়। ঔপন্যাসিকের ভাষায় ‘কৈশোরের এই প্রস্তুতি তাদের সবাইকে দিয়েছে বৃত্ত ভাঙার সাহস।’
আবু তাহেরের সহোদর-সহোদরার পরিচয় দেওয়ার সময় ঔপন্যাসিক তাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং বিপ্লবী হয়ে ওঠার চুম্বকাংশ তুলে ধরেছেন। এতে সহজেই অনুমান করে পরবর্তী পদক্ষেপ কি হতে পারে তা বলে নেওয়া যায়। দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতে এই পরিবারের সকল সদস্যই একত্রিত ছিল, ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ শত্রুমুক্ত করার কাজ বন্টন করে নিয়ে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছিল। কর্নেল তাহেরের ছোটবেলার রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলো যে তাঁর জীবনের বৃহত্তর ঘটনার উৎসমূল তা বর্ণনা করেন। তাহেরের ভাবনা চিন্তার বড় পরিবর্তন ঘটে চট্টগ্রামের প্রবর্তক স্কুলে পড়ার সময়। এই স্কুলে এসে তাহের মাস্টারদা সূর্যসেনের এক সহযোগীকে পান তাঁর শিক্ষক হিসেবে, যিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনে সূর্যসেনের সাথে ছিলেন। এই পরিচয়ের মাধ্যমেই তাহেরের মন ও মননে যুক্ত হয় রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা। হাতে তুলে নেন মার্ঙবাদী, রুশ বিপ্লবী ও চীনা বিপ্লবী বই। নতুন এক জগৎ ক্রমশ উন্মোচন হতে থাকে তাঁর সামনে। ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’, ‘এন্টিডুরিং’ এবং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্ব ইত্যাদি আবু তাহেরের আকর্ষণকে নিয়ে যায় সমাজতন্ত্রের দিকে। লেলিন, রোজা লুক্সেমর্বাগ, বুখারিন, ট্রটস্কি, মাও সে তুং প্রমুখের মিলিটারী রচনাগুলো সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে ন্যায়যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে তাঁকে সহায়তা করে। এরই সূত্র ধরে তাহের হয়ে উঠেন হো চি মিন, ফিডেল ক্যাস্ট্রো আর চে গুয়েভারার ভক্ত। সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে কল্পনা করে তাহের একটি স্বর্গ সুখের উদ্যান নির্মাণে মনোসংযোগ করেন।
‘ক্রাচের কর্নেল’ উপন্যাসে ক্রমে উঠে আসে আবু তাহেরের সামরিক জীবনের প্রতিলিপি। সামরিক সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাহের তাঁর সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী চিন্তা ছড়িয়ে দিতে থাকেন ভাই আনোয়ার, সাঈদ, বাহার, বেলালের মাঝে। বড় ভাই আরেফ তখন পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তা এবং আবু ইউসুফ বিমান বাহিনীর সদস্য, পোস্টিং সৌদি আরবে। তাহের ও লুৎফা তখন সবে মাত্র তাঁদের মধু চন্দ্রিমা সেরে আসেন লন্ডন থেকে। দেশে যুদ্ধ শুরু হলেও পোস্টিং এর কারণে আবু তাহের পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাস শুরু করেন। এই পর্যায়ে সমগ্র যুদ্ধ পরিস্থিতির কথাগুলো অত্যন্ত মার্ধুযমন্ডিত এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। ঔপন্যাসিক শাহাদুজ্জামান। দেশের এই চরম দূর্যোগপূর্ণ অবস্থায় তাহের কোনভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানে বসে থাকার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি বাঙালি অফিসারদের একত্রিত করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বহু কষ্টে পালিয়ে এসে যোগ দেন এদেশের মুক্তি সংগ্রামে। দেশে আসার পর কর্নেল তাহের ১১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার পদে নিয়োজিত হন। বীরদর্পে যুদ্ধ করে শত্রুমুক্ত করার মন্ত্রে যখন উজ্জীবিত তিনি, তখনই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শত্রুর ছোড়া শেলের আঘাতে তাঁর বাম পা টি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তী জীবনে ক্রাচ হয় তাঁর জীবনের সঙ্গী। ভারতে অস্ত্রোপচার শেষে একটি নকল পা জুড়ে দেওয়া হয়। র্দীঘ নয় মাসের যুদ্ধ যাত্রা ঔপন্যাসিক শিল্প সিদ্ধ রীতিতে সুনিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন।
ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক অবস্থান ও চরিত্র নিয়ে যখন কোন উপন্যাস রচনা করা হয়, তখন ঔপন্যাসিককে সর্তক অবস্থায় হতে হয় কৌশলী। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান স্থান কাল পাত্র বিশেষে সর্তক অবস্থানে থেকে একে একে বর্ণনা করেন দেশের ঐতিহাসিক নেতাদের কর্মপন্থা, যুদ্ধকালীন দেশের শত্রু ও মিত্র দেশের ভাবভঙ্গি এবং সাধারণ বাঙালি শ্রেণি চরিত্র। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরু ও শেষের চিত্র, ষড়যন্ত্র, হত্যাযজ্ঞ, শোষণ ইত্যাদি উঠি এসেছে ক্রমান্বয়ে। উপন্যাসের বুকে উঠে এসেছে যুদ্ধের প্রকরণ কৌশল, বাঙালির প্রতিরোধ এবং বিজয়। এই বিজয় বাঙালির জন্য মুক্তি ও স্বাধীনতা এনে দিলেও কর্নেল তাহের এ বিজয় এভাবে অর্জন করতে চাননি। তাহের ভেবেছিলেন যুদ্ধ যদি নয় মাসের চেয়ে আরো র্দীঘ হতো তবুও তা বাঙালির পক্ষে মঙ্গলজনক হতো, কেননা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় বাঙালির স্বাধীনতা তাঁর কাছে অনেকটা ফোরসেপ ডেলিভারির মতো, অন্যের সাহায্য নিয়ে মুক্তি। সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় তাহের ভেবেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তি ভিয়েতনামের মতো কমিউনিস্ট ওয়ারের দিকে যাবে। তাহেরের সে স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে যায় তখন। স্বাধীন দেশ নতুন উদ্যমে পুর্নগঠনের কাজে নেমে পড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন দেশে তাহেরকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়, কর্নেল পদে উন্নীত করে আর্মির অ্যাডজুটেস্ট জেনারেল করা হয়। কিন্তু কর্নেল তাহেরের স্বপ্ন ভঙ্গের মাত্রা যেন বাড়তেই থাকে। স্বাধীন দেশে তিনি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বারবার হয়েছেন উপেক্ষিত, বাধাগ্রস্ত। এর পরের প্রেক্ষাপট স্বাধীন দেশকে চূড়ান্ত দোদুল্যমান অবস্থানে নিয়ে যায়।
উপন্যাসে ১৯৭৫ সালের আগস্টের পূর্ব ও পরর্বতী চিত্র অত্যন্ত সুন্দরভাবে এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রর্দশিত হয়েছে। ঔপন্যাসিক শাহাদুজ্জামান কর্নেল তাহেরের জীবনার্দশ এবং সংগ্রামমুখর দিনগুলোকে অঙ্কিত করার জন্যই এই সময়কালের ঘটনাবহুল দিনকে সামনে নিয়ে আসার প্রয়োজন বোধ করেছেন। ধীরে ধীরে পাঠক এগিয়ে যেতে থাকেন পরের ঘটনার দিকে, উপন্যাসের পটে সাক্ষী হন ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞের। এক কালো অধ্যায় রচনা করে খুনি খোন্দকার মোশতাক, মেজর ফারুক, মেজর রশীদ, ডালিম। দৃশ্যপটে দেখা যায় জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক দলের প্রতিষ্ঠা, সর্বহারা পার্টির উত্থান। এই ঘটনা বহুল দিনে কর্নেল তাহের মানুষের মাঝে পৌছে দিতে চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্রের ধারণা, চেয়েছিলেন মানবতার মুক্তির চেতনা জাগ্রত করতে। তাই তাঁর বিপ্লবী চিন্তা ছড়িয়ে দিতে থাকেন সিপাহী জনতার মাঝে। তাহেরের কাছে তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হওয়া এবং সিপাহী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ক্রমান্বয়ে উপন্যাস পৌঁছে যায় ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের বিপ্লবী দিনগুলোতে। নাটকীয় ঘটনার উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান পৌছে যান ক্ষমতার কেন্দ্রে এবং অন্যদিকে বীর উত্তম কর্নেল আবু তাহের নিক্ষিপ্ত হন কারাগারের অন্ধকার ঘরে। প্রহসনের বিচার হয় তাঁর মৃত্যূদণ্ড। কি অপরাধ, কোন অন্যায়ের সাজা পেয়েছেন তিনি? বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব যাই বলি না কেন, কর্নেল তাহের ছিলেন এর সবগুলোর নায়ক। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা নিপীড়কের কাছে তিনি ছিলেন দুর্নিবার, তাই তাঁকে দমন করতে পারলে লাভের পাল্লাই ভারী হয়। ইতিহাস সাক্ষী, কর্নেল তাহের কখনো অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি, মাথা নত করেননি। তাই তিনি প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে তাঁর বিপ্লবী চেতনাকে ম্লান হতে দেননি। সমাজতন্ত্রের দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন, সংগ্রামী জনতার মুক্তি চেয়ে মৃত্যুর সাথে সন্ধি করেছেন কিন্তু অন্যায়ের কাছে হেরে যাননি। কর্নেল তাহেরের জীবন সংগ্রামের এক বিস্তারিত দলিল ‘ক্রাচের কনের্ল’ উপন্যাসটি। সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন কর্নেল তাহের, আর সে সমাজের স্বপ্নকে পাঠকের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন, ব্রপিত করেছেন ঔপন্যাসিক শাহাদুজ্জামান। এ যেন অপূর্ব স্বপ্নকে ঘুম না পাড়িয়ে জাগিয়ে রাখা, নতুন করে প্রেরণা দেওয়া।
ইতিহাসের আশ্রয়ে রচিত এ উপন্যাসে ঔপন্যাসিক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শব্দের ব্যবহার করেছেন, সচেতন থেকেছেন স্থান-কাল ও চরিত্রের নিপুণ ব্যবহারে। কর্নেল তাহেরের সমর যুদ্ধের আরেকটি পরিচয় আমরা পাই কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন রচিত ‘যুদ্ধ’ (১৯৯৮) উপন্যাসটিতে। ‘যুদ্ধ’ উপন্যাসের কেবল দু-একটি পরিচ্ছেদে কর্নেল তাহেরের সমর যুদ্ধ, পরিবার এবং আহত হওয়ার চিত্র আছে। ‘ক্রাচের কর্নেল’ উপন্যাস কর্নেল তাহেরের জীবনী, তাঁর আদর্শের বিচ্ছুরণের দৃশ্যপটের উপন্যাস। এর মাধ্যমে কর্নেল তাহের আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন; বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে শত শত তরুণের চোখে আলোক নিশানের মশাল জ্বালিয়ে ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে রবেন। লেখকের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম কর্নেল তাহেরের মৃত্যুর পরই কেন এ উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে, কর্নেল তাহেরের জীবনার্দশ তাঁর সন্তানদের মধ্যে কিরূপ প্রভাব ফেলেছে তা কি এ উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ নয়? উত্তর পেলাম হয়তো অদূর কোন ভবিষ্যতে শাহাদুজ্জামান কর্নেল তাহেরের আদর্শ তাঁর সন্তানদের ও পরিবারের মাঝে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছে তা নিয়ে অন্য একটি উপন্যাস রচনা করলেও করতে পারেন। সে অপেক্ষায় থাকবে পাঠক। শাহাদুজ্জামানের ‘ক্রাচের কর্নেল’ উপন্যাসটি সহজ সুখপাঠ্য, অনবদ্য লেখকের গল্প গাঁথুনি। এটি পাঠকের জানার আগ্রহকে বাড়িয়ে দেবে। নিঃসন্দেহে এটি কালের নিরীখে অনন্য অসাধারণ সৃষ্টি।

লেখক : প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৬ বিজয়ী শিক্ষার্থী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

x