ক্যাম্পাসে উদীচীর বসন্তবরণ

ধর্মরাজ তঞ্চংগ্যা

বৃহস্পতিবার , ৮ মার্চ, ২০১৮ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
76

শীতের রিক্ততা মুছে ফাগুনের প্রথম দিনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে প্রকৃতি যেন হয়ে উঠেছিলো আরও নির্মল ও সুন্দর। এই সুন্দর প্রকৃতিতে শাটল ট্রেনে কিংবা বাসে চেপে বসন্তদূত হয়ে শিক্ষার্থীরা হাজির হন প্রিয় প্রাঙ্গণে। নারীরা কাচের চুড়ি, বাসন্তী শাড়ি ও খোপায় গাঁদা ফুল দিয়ে আর পুরুষেরা কমলা ও হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরে ক্যাম্পাসে উদীচীর বসন্ত উৎসবে ছড়িয়েছে আবির। যাঁরা বসন্তের কথা ভুলে গিয়েছিলো তাঁরা বসন্তের দূতদের দেখে বুঝে গিয়েছেন বসন্ত এসে গেছে।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি উদীচী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে মুক্তমঞ্চে দিনব্যাপী বসন্ত উৎসবের আয়োজনে ছিল গান, নাচ, মূকাভিনয়, আবৃত্তি, আদিবাসী গাননাচ, বাউল গান ও কথামালা। ‘কুহু কুহু শোনা যায় কোকিলের কুহুতান, বসন্ত এসে গেছে’ এই শিরোনামে এই উৎসবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লোকজ সংস্কৃতি চর্চার প্রত্যয়। উদীচী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি অধ্যাপক গণেশ চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে বসন্ত উৎসবের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। বসন্তকথনে অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক শিরীণ আখতার, বাংলা বিভাগের সভাপতি মহীবুল আজিজ, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি চন্দন দাশ ও উদীচী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ। আসরের সঞ্চালনা করেন উদীচী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ দূরদানা চৌধুরী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সকলকে বর্ণিল বসন্তের শুভেচ্ছা। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। শীতের শূন্যতা কাটিয়ে আমের মুকুলের ঘ্রাণে অভিষেক হয় বসন্তের। গাছের শাখাপ্রশাখায় সবুজ কিশলয় তারুণ্যের বুকে জাগিয়ে তুলে জীবনের নব উচ্ছ্বাস। এ উচ্ছ্বাস তারুণ্যের শক্তিকে প্রাণিত করে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। ফাগুনের পলাশশিমুলকৃষ্ণচূড়ার লাল পুষ্পরাজির আজ রঙিন হয়েছে জীবন। আর এই জীবনকে সুমধুর করতে পারে তারুণ্যের শক্তি। এই তারুণ্যেই অন্ধকার, কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং জঙ্গিসন্ত্রাসকে পদদলিত করতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের সত্য, সুন্দর, মঙ্গল, কল্যাণ ও আলোর পথে এগিয়ে যেতে হবে।

বসন্তকথনের পর অতুল প্রসাদ সেনের বসন্তের গান ‘জাগো বসন্ত, জাগো তবে মোদের প্রমোদ কানন’ দিয়ে শুরু হয় উদীচীর বসন্তবরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বৃন্দ এই গানটি শুভ্র সকালে দর্শকদের তৃপ্ত করেছে। এরপর তাঁরা গেয়ে শোনান দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘আজি নতূন রতনে ভূষণে যতনে প্রকৃতি সতীরে সাজিয়ে দাও’। শিল্পীদের কণ্ঠের সাবলীলতা ও মাধুর্য মুগ্ধ করেছে উপস্থিত শ্রোতাদের। এরপর শিল্পীরা বেশ স্বচ্ছন্দে গেয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে’ গানটি। এই গানটি শিক্ষার্থীদের মনে যেন ফাগুনের আগুন হয়ে ছুঁয়ে গেল। বৃন্দ গানে অংশগ্রহণ করেন বৃষ্টি, মুমু, চায়না, অদিতি ও মুন।

এবারে ‘মাতাল সুরে বাজলো বাঁশি, মন জুড়ে আজ মধুর হাসি’ গানের তালে তালে নাচ নিয়ে মঞ্চ আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠন রঁদেভু শিল্পীগোষ্ঠী। শিল্পীদের নাচের ব্যাকরণের সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় নান্দনিক উৎকর্ষতায়। কমলা সুন্দরীর গানের সঙ্গে নাচ পরিবেশন করেন নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী মিলা নোভা। তাঁর নাচের আঙ্গিকে ছিল নিজস্ব ভাষা। ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কিবা মৃদু বায়’ গানের সঙ্গে নাচ করেন উদীচীর শিল্পী প্রিয়তা। ‘ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান’ গানটির সঙ্গে অনবদ্য নাচ করেন অন্যতমা চাকমা।

গান ও নাচের পর আবৃত্তি করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন অঙ্গন। অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের ‘ছন্নছাড়া’ কবিতাটি মুন চাকমার কণ্ঠে আসরে মুগ্ধতা ছড়ায়। বাদ যায়নি বাউল গানও। আবেগের সঙ্গে পরিমিতি, সরলতার সঙ্গে কণ্ঠের কারুকার্যতা নিয়ে ভাবের জগতে বিচরণ করান সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হানিফ মিয়া। প্রথমে তিনি গাইলেন লালনের ‘শুদ্ধ প্রেম রাগে ডুবে থাকরে আমার মন’। তাঁর গানে শুদ্ধ প্রেমের বাণী দর্শকদের হূদয়স্পর্শী করে তোলে। এরপর তিনি একে একে গাইলেন ‘ফকির ফিকির মাখামাখি, ফকিরেতে ফের পলো’, ‘গোকুলে গোবিন্দ নাই’ ও ‘নিঠুর নিরালায় বাঁশি আর বাজাইয়ো না’। সবশেষে তিনি গাইলেন লালনের গান ‘বলো স্বরূপ কোথায় আমার সাধের পেয়ারী’।

দর্শকদের জন্য চমক আরও বাকী ছিল। ‘ডেমোক্রেসি’ ও ‘টুনটি ফ্রেন্ড’ মূকাভিনয় নিয়ে মঞ্চ মাতান উদীচীর শিল্পীরা। এছাড়াও গান শুনিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন বৃষ্টি দত্ত, চায়না পাটোয়ারি, মুমু, মুন চাকমা, অদীতি, শান, অন্তু, মাইশা মালিহা, পূর্ণিমা চাকমা, বর্ষা চাকমা, নিক্সন ও সৃজন প্রমুখ। উৎসবে সবশেষে সবাইকে উদীচী পথচলার সঙ্গী হবার আহবান সমাপ্তি ঘোষণা করেন উদীচীর সাংগঠনিক সম্পাদক ধর্মরাজ।

x