কৌশলগত অবকাঠামো রাষ্ট্রীয় খাতে থাকতে হবে

রবিবার , ২৫ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
23

বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর এবার সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে বেসরকারি খাত। ব্যক্তি খাতের কোম্পানির হাতে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন দিতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এরই অংশ হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ফলে বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে। সঞ্চালন লাইন বেসরকারি খাতে দেয়া হলে সামগ্রিক সঞ্চালন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এর চাপ পড়বে গ্রাহকের ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উন্নতি হচ্ছে না সঞ্চালন ব্যবস্থার। উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও লোকবল ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত সময়ে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন চেয়েও পাচ্ছে না। তবে বেসরকারি খাতে দেয়া হলে বিভিন্ন কোম্পানি খুব দ্রুত আগ্রহ দেখাবে বলে মনে করেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। এ সম্ভাবনা থেকেই প্রাথমিকভাবে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে মদুনাঘাট এবং চট্টগ্রামের রাউজান থেকে মিরসরাই পর্যন্ত বেসরকারি খাতে দুটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান পিজিসিবিকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে পিজিসিবি দুটি লাইনের একটি বিডার ফাইন্যান্সিং পদ্ধতি ও অন্যটি আইপিপি প্রক্রিয়ায় করার প্রস্তাব তৈরি করেছে। পত্রিকান্তরে গত ১৭ নভেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরে আরো বলা হয়, পত্রিকাটি জানতে চাইলে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ প্রসঙ্গে পত্রিকাটিকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা দুটি লাইন করার বিষয়ে ভাবছি। তবে আইপিপির কোন মডেলটি অনুসরণ করা হবে, তা নির্ধারণের জন্য সরকারের বিদ্যুৎ বিষয়ে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলকে বলা হয়েছে। তারা একটি মডেল চূড়ান্ত করলে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে পিজিসিবির মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকার পরও মাত্র ২০ হাজার মেগাওয়াটের জন্য বেসরকারি খাতে সঞ্চালন লাইন ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে বিদ্যুতের ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রেও একই উদ্যোগ নিলে ব্যয়ের মাত্রা আরো বেড়ে যাবে।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় বেসরকারি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সমর্থ হলেও সুযোগ মেলে না গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ ও সরবরাহ করার। দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও বোর্ড এককভাবে পরিচালনা করছে সঞ্চালন ও বিতরণ খাত দুটি। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোয় উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নিয়ে তা সঞ্চালন ও বিতরণ করছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো। এবার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতে লাইসেন্স দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সরকারের অনুমতি নিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রফতানি এবং একই সঙ্গে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে বেসরকারি খাত। আমদানি বা রফতানির জন্য বাংলাদেশের বিদ্যমান সঞ্চালন লাইন ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে তাদের। অনেক দিন থেকে এ বিষয়ে আলোচনা চলে এলেও সম্প্রতি তা চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে বলে উপরোক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একটি বিডার ফাইনেন্সিং ও অন্যটি আইপিপি প্রক্রিয়ায় করার প্রস্তাব তৈরি হয়েছে। এটা আশাব্যঞ্জক সন্দেহ নেই। তবে শঙ্কাও বাড়ায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে বিদ্যুতের ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রেও একই উদ্যোগ নিলে ব্যয়ের মাত্রা যে আরো বেড়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ফলে বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে। সঞ্চালন লাইন বেসরকারি খাতে দেওয়া হলে সামগ্রিক সঞ্চালন ব্যয়ও যে বাড়বে, এটা জানা কথা। আর তার চাপ পড়বে গ্রাহকের ওপর। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যত ট্রাসমিশন লাইন আছে, তার পুরোটা স্থাপন করেছে পিজিসিবি। বেসরকারি খাত এখনো কোন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করেনি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেই পিপিপি ভিত্তিতে কেবল সীমিত সংখ্যক সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। সেখানেও সিংহভাগ সঞ্চালন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে বিদ্যুৎ জ্বালানির মতো সেবা খাত সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এগুলোকে বলা হয় মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সরকারের প্রচেষ্টা। অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত বিদ্যুৎ খাতকে কখনোই পুরোপুরি বেসরকারি খাত নির্ভর করে তোলা হয় না। এর কারণ বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। ব্যয়ের প্রশ্নটিও এর সঙ্গে জড়িত। অর্থনীতির ভাষায়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারকে দক্ষ ও একচেটিয়া বাজারকে অদক্ষ ও মুনাফাতাড়িত হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যতিক্রম। অর্থনীতির সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের একচেটিয়া অধিকার এ খাতকে বেশি দক্ষ ও ব্যয় সাশ্রয়ী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। যেহেতু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচালনাসহ বিতরণ ব্যবস্থা বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেহেতু আমাদের দেশে সেটাই হওয়া উচিত। বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতিযোগিতামূলক অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যুতের মূল্য অপেক্ষাকৃত বেশি। বিদ্যুৎ সংকট দূর করতে দেশে আরো কিছু নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। তবে শুধু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, একই সাথে বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সঞ্চালন লাইনও দরকার। দেশে সঞ্চালন লাইনগুলোর অবস্থা ভালো নয়। অনেকদিনের পুরোনো সঞ্চালন লাইনগুলো বিদ্যুৎ সংকট আরো তীব্র করে তুলছে। তাই সারা দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। বস্তুত দেশে বিদ্যুৎ সংকট দূর করতে স্থায়ী ব্যবস্থা চাই। আর এজন্য নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইন দুটোই দরকার। দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও প্রতিবছর বাড়ছে। স্বভাবত বিদ্যুৎ সংকট দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। তবে এক্ষেত্রে দেশীয় শিল্প অগ্রাধিকার পাওয়া আবশ্যক। কম দামে জ্বালানি পাওয়ার অধিকার সাংবিধানিকভাবেই স্বীকৃত। আমরা চাই, সরকার দেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রেখেই বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বেসরকারি বা বিদেশি কোম্পানিকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে আরো যাচাই-বাছাই ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া হবে বলে আমরা আশা করি।

x