কোয়েল পালনে স্বাবলম্বী

আকাশ আহমেদ, রাঙ্গুনিয়া

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
71

লেখাপড়ার গন্ডি বেশি দূর পার করতে পারেননি খোরশেদ আলম। তাই কর্মজীবনের জন্য পাড়ি জমান সৌদি আরবে। প্রবাসে তেমন সুবিধা করতে না পারায় কয়েক বছর না পেরোতে চলে আসতে হয় দেশে। এক বন্ধুর পরামর্শে ইউটিউবে (ইন্টারনেট) দেখে কোয়েল পাখি পালনে আগ্রহী হন। সেই খোরশেদ এখন অন্যজনের জন্য অনুকরণীয়। বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল পালন করে স্বাবলম্বী তিনি। এলাকায় তার দেখাদেখিতে অনেকেই এখন কোয়েল পালন করছেন। কোয়েল পালনের উপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তাপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খোরশেদের বাড়ির উঠানে ব্রয়লার (ডিম পাড়া) কোয়েলের পাশাপাশি লেয়ার কোয়েল রাখা হয়েছে আলাদা ঘরে। বাড়ির ছাদে রাখা হয়েছে বাচ্চা কোয়েল। ঘরের এক কক্ষে ইনকিউবিটরে ডিম ফুটানো হচ্ছে। খামারের পাশেই তার বসত ঘর। সেখানে বসে কোয়েল পালনের নানা বিষয়ে কথা হলো খোরশেদের সাথে। তিনি বলেন, সৌদি আরব থেকে ফেরত এসে বেকারত্বে দিন কাটাতে হয়েছিল কয়েক মাস। কোয়েল পালনের বিষয়ে সৌদি আরব থাকতে ঢাকার গাজীপুরের বাপ্পী নামে এক সহকর্মীর কাছে লাভবান হওয়ার গল্প শুনেছেন। হঠাৎ মাথায় এলো কোয়েল পালন করে সংসার চালাবেন। ইউটিউব-ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোয়েল পাখি পালন সম্পর্কে ধারণা নেন। টেলিভিশনে শাইখ সিরাজের অনুষ্ঠানগুলো প্রায় দেখতেন তিনি। তিনি তখন ঢাকার গাজীপুরের একজন কোয়েল পাখির খামারির মুঠোফোন নাম্বার সংগ্রহ করে তার কাছ থেকে ১ হাজার পিস ১ মাস বয়সী ডিমপাড়া পাখি কিনে এনে শুরু করেন কোয়েল পাখির খামার। প্রথমে ৩৫ হাজার টাকা খরচ করেন তিনি। মাস খানেক পর কিনে আনেন ডিম ফুটানোর জন্য ইনকিউবেটর। পাখিগুলো যখন ১ মাস পর থেকে ডিম দিতে শুরু করল তখন থেকেই খোরশেদ ভাবতে লাগলেন এটা আসলেই একটি লাভজনক ব্যবসা হবে। পরবর্তীতে জমানো টাকায় কিনে আনেন আরো এক হাজার পিস ১ মাস বয়সী কোয়েল পাখি। বাড়ান খামারের পরিধি। ১টি স্ত্রী কোয়েল ৪৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে ডিম পাড়া শুরু করে। এরা ১৮ মাস পর্যন্ত ডিম দেয় বলে জানান খোরশেদ। খোরশেদ আরো জানান, বর্তমানে তার খামারে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোয়েল পাখি। প্রতিদিন ডিম পাচ্ছেন গড়ে ৬০০। খামারে প্রতিদিন তিনি ডিম বিক্রি করে ১৫০০ টাকা আয় করেন। পাশাপাশি কোয়েল বিক্রি করেন। প্রতি মাসে খরচ বাদ দিয়ে তিনি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় করেন। এদিকে, পাখির মল ও উচ্ছিষ্ট নিয়ে মহা সমস্যায় পড়েন খোরশেদ। উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে যোগাযোগের মাধ্যমে পাখির মল ও উচ্ছিষ্ট কাজে লাগান। তৈরি করেন বায়োগ্যাস। দুই চুলার বায়োগ্যাসে ঘরের রান্নাবান্না হচ্ছে। বেকার খোরশেদ কোয়েল পাখির খামার দিয়ে বেকারত্বকে পরাজিত করে অল্প বয়সেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। এখন তিনি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কোয়েল পাখি পালনে প্রশিক্ষণ দিয়ে বেকার যুবকদের উৎসাহ দিচ্ছেন।
উপজেলা সহকারি যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খায়রুল আলম বলেন, প্লোল্ট্রির জগতে ক্ষুদ্র পাখি কোয়েল। আগে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ালেও বর্তমানে খামারে বাণিজ্যিকভাবে এখন পালন করা হচ্ছে কোয়েল পাখি। আমাদের দেশের আবহাওয়া কোয়েল পালনের জন্য বেশ উপযুক্ত। কোয়েল পাখির খামার করে স্বাবলম্বী হওয়ার চমৎকার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খোরশেদ। কোয়েল পাখির খামার দিয়ে ডিম ও পাখি বিক্রি করে তিনি এলাকার বেকারদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছেন। নিজেও হয়েছেন স্বাবলম্বী। কোয়েলের মল-মূত্র দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি হচ্ছে। বায়োগ্যাসের চুলাতে বাড়ির রান্নাবান্না হচ্ছে। সাশ্রয় হচ্ছে প্রচুর টাকা। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর তাকে সবসময় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তফা কামাল বলেন, কোয়েল পাখি পালনে বেশ সুবিধা রয়েছে। কোয়েল দ্রুত বর্ধনশীল, মাত্র ৬-৭ সপ্তাহে ডিম পাড়া শুরু করে। ডিমে কোলেস্টরল কম, প্রোটিনের ভাগ বেশী। মাত্র ১৭/১৮ দিনে কোয়েলের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। হাঁস-মুরগীর চেয়ে কোয়েলের রোগ অনেকটা কম। তবে প্রাথমিক অবস্থায় একটু সতর্ক থাকতে হবে। কোয়েল পাখির খামার করতে অনেকেই এখন আগ্রহী হচ্ছেন। কোয়েল পাখির খামার করে খোরশেদের স্বাবলম্বী হওয়া প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, খোরশেদ তার নিরলস চেষ্টা আর পরিশ্রম দিয়ে বেকারত্ব দূর করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার এই সাফল্যকে আমি উৎসাহ প্রদান করি। প্রয়োজনে প্রশাসনের কোন সহযোগিতা লাগলে অবশ্যই তাকে দেয়া হবে।

x