কোরবানির পশু

আব্দুস সালাম

বুধবার , ৭ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
37

চরডাঙ্গা গ্রামের জিসান, মেহবুব, রনি, তাসিন, মুক্তা, রুমকি ও মুকিত এরা সমবয়সী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে পড়াশুনা করলেও একসাথেই চলাফেরা করে। খেলাধুলাও করে একসাথে। ঈদ-বকরিদের এলে তারা একসাথে খুব মজা করে। এবার ঈদের তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেখতে দেখতে কোরবানির ঈদও চলে আসে। কোরবানির ঈদ তারা কিভাবে পালন করবে তার একটা পরিকল্পনা করে ফেলে। জিসান, মেহবুব, রনি ও তাসিনের বাবা প্রতিবছর কোরবানি দেয়। কোরবানির সময় এলে তারা কোরবানির পশু নিয়ে গল্পগুজব করে। কেউ বলে আমরা বড় একটি গরু কিনেছি, কেউ বলে আমাদের ছাগলটা খুব বড়, কেউ আবার বলে আমরা সারাবছর নিজের হাতে গরু-ছাগল পুষে তারপরে কোরবানি দিই। কোরবানির ঈদ যতই ঘনিয়ে আসে তাদের গল্পের আসরটাও তেমনভাবে জমে ওঠে। ইতোমধ্যে গ্রামের অনেকেই কোরবানির পশু কেনা শুরু করেছে। তাসিনের বাবা এবার গরু কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার বাবা আগামীকাল গরু কিনতে হাটে যাবে। তাসিন বারবার তার বাবার কাছে আবদার করেছে এবার যেন কোরবানির জন্য একটা বড় মোটাতাজা গরু কেনা হয়। বাবা বলেছে ঠিক আছে তাই হবে। তোমাকে আগামীকাল গরু কিনতে হাটে নিয়ে যাব। বাবার কথা শুনে তাসিন খুব খুশি হয়। সে আগামীকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
পরেরদিন তাসিন বাবার সঙ্গে পশুর হাটে গেল। হাটে গরু-ছাগলের অভাব নেই। সে দেখল হাটে অনেকগুলো মোটা তাজা গরু বিক্রি করার জন্য আনা হয়েছে। বাবা বেশকিছু গরু পরীক্ষা-নীরিক্ষা করল। বেপারিদের সঙ্গে বলে দরকষাকষি করল কিন্তু কোন মোটাতাজা গরু কিনল না। অবশেষে বাবা দেখে-শুনে মাঝারি সাইজের একটা গুরু কিনে বাড়ি নিয়ে গেল। বাবার কেনা গরু দেখে তাসিনের পছন্দ হয়নি। তার যে মন খারাপ হয়েছে তা বাবা তার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছে। রাতের বেলায় বাবা তাসিনকে বলল, “তোমার গরু পছন্দ হয়নি?” “না। আমার পছন্দ হয়নি। হাটে তো অনেক মোটা তাজা গরু ছিল আপনি কোনটাই কিনলেন না।” তাসিন জানতে চাইল। বাবা বলল, “গরু গুলো ভালো ছিল না। ঔষুধের সাহায্যে মোটাতাজা করা হয়েছে। ওসব গরুর মাংস খাওয়া নিরাপদ নয়। খুব ক্ষতিকর। বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, ইঞ্জেকশন ও রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে এসব পশুকে মোটাতাজা করা হয়ে থাকে। যা স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। এসব গরুর মাংস বিষাক্ত হয়ে যায়। এই গরুর মাংস খেলে মানব দেহে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। মানব শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শরীরে পানি জমতে পারে। মূত্রনালী ও যকৃতের বিভিন্ন রকম সমস্যা হতে পারে। তাই কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা গরুর মাংস না খওয়ায় ভালো।”
: আপনি কীভাবে বুঝলেন যে গরুগুলো সুস্থ নয়, অসুস্থ?
: খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। বলছি শোন। রাসায়নিক বা ওষুধ দেয়া গরুর মাংসপেশি থেকে গরু শরীরের অন্য অঙ্গগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকে। শরীরে পানি জমায় বিভিন্ন অংশে চাপ দিলে সেখানে গর্ত হয়ে দেবে যাবে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সময় নেবে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে মোটা গবাদী পশুর ক্ষেত্রে দ্রুতই মাংস স্বাভাবিক হয়। অতিরিক্ত ওজনের কারণে এ সব গরু চলাফেরা বা স্বাভাবিক নড়াচড়া করতে পারে না। শান্ত থাকে। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠে। তাদের খুব ক্লান্ত দেখায়। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। স্বাভাবিকভাবে যেসব গরু বা ছাগল মোটাতাজা হয় সেগুলো খুবই চটপটে হয়। মুখের সামনে খাবার দিলে সাথে সাথে জিভ দিয়ে টেনে খাওয়ার চেষ্টা করবে। আর যদি গরুটি অসুস্থ হয় তবে খাবে না। সুস্থ গরু সবসময় নড়াচড়া করে আর মুখে জাবর কাটতে থাকে। নাকের ডগার উপর সব সময় ভেজা ভেজা ভাব থাকে। এসব গরুর মুখে কম লালা বা ফেনা থাকে। শরীরের রঙ উজ্জ্বল থাকবে। গরুর পিঠের কুজ মোটা, টানটান ও দাগমুক্ত হবে। রানের মাংস শক্ত থাকবে। যেখানে রাসায়নিক দেয়া গরুর পা হবে নরম থলথলে। গরুর শরীরে হাত দিয়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মনে হলে বুঝতে হবে গরুটি অসুস্থ। সুস্থ গরুর চামড়ার ওপর দিয়ে কয়েকটা পাঁজরের হাড় বোঝা যাবে। আর একটা কথা মনে রাখবে। তা হলো- কোরবানি দেওয়ার জন্য ত্রুটিপূর্ণ পশু যেমন শিং ভাঙ্গা, লেজ কাটা, গায়ে দাগ পড়া পশু কেনা উচিত নয়। ছাগল, পাঁঠা, খাসি, ভেড়া, দুম্বা, গাভী, ষাঁড়, বলদ, মহিষ, উট এই কয় প্রকার গৃহপালিত পশু কোরবানি করা জায়েজ আছে। এছাড়া হরিণ ইত্যাদি হালাল বন্য জন্তুর দ্বারা কোরবানি আদায় হবে না। গরু বা মহিষ কেনার সময় দাঁত দেখে কিনতে হবে যেন তার বয়স কম পক্ষে ২ বছর হয়। আর ছাগলের বেলায় কমপক্ষে ৬ মাস।
বাবার নিকট থেকে মোটাতাজা গবাদী পশুর ভালো-মন্দ দিক জানার পর তাসিনের মনটা ভালো হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে বাবার অনেক বুদ্ধি আছে। বাবা যে গরুটা কিনেছে তা দেখে শুনেই কিনেছে। ওদিকে গরুর সাইজ ও দাম নিয়ে তাসিনের বন্ধু-বান্ধবরা তার সঙ্গে ঠাট্টা করে। রনি বলে আমার আব্বা আগামীকাল গরু কিনবে। আমি আব্বাকে বলেছি সবচেয়ে বড় গরু কিনতে হবে। মবিন চাচা অনেক বড় একটা গরু কিনেছে। ঠিক সেই রকম একটা গরু। কথা প্রসঙ্গে জিসান বলে রুমকি, মুক্তা ও মুকিতের বাবা কোরবানি দেয় না। ওরা গরিব মানুষ। কোরবানি না দিলে কি ঈদের কোন মজা হয়? ওরা কোন মজা পাবে না। গরুর আকার, মূল্য ও দারিদ্র্যতা নিয়ে যখন তার বন্ধুরা গল্পে মেতে ওঠে ঠিক তখন তাসিন বাবার নিকট থেকে শোনা গল্পটি তাদের শুনিয়ে দেয়। সে আরও বলে “আমরা জানি যে, ১০ যিলহজ ফজর থেকে ১২ যিলহজ সুর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যদি কোন সুস্থমস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম নর-নারী ঋণমুক্ত থাকা অবস্থায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তবে তার কুরবানি করা ওয়াজিব। অর্থাৎ যদি কারো নিকট (১) সাড়ে সাত তোলা (ভরি) পরিমান সোনা থাকে অথবা (২) সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা থাকে অথবা (৩) সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার যেকোন একটির মূল্যের সমপরিমাণ টাকা-পয়সা বা ব্যবসার মাল অথবা প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ থাকে অথবা (৪) উল্লেখিত পাঁচটি (সোনা, রূপা, টাকা-পয়সা, ব্যবসার মাল ও প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ) সম্পদই থাকে যার সমষ্টিগত মূল্য উপরোক্ত পরিমান সোনা (সাড়ে সাত তোলা) বা রুপার (সাড়ে বায়ান্ন তোলা) যেকোন একটির মূল্যের সমপরিমাণ হয় অথবা (৫) উল্লেখিত পাঁচটি সম্পদের যেকোন চারটি বা তিনটি বা দুটি সম্পদ থাকে যার সমষ্টিগত মূল্য উপরোক্ত পরিমাণ সোনা বা রুপার (সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা) যেকোন একটির মূল্যের সমপরিমাণ হয়, তবে সে নেসাবের মালিক হিসেবে ধর্তব্য হবে এবং তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। কোরবানির মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করে। এখানে কোরবানির পশু নিয়ে গর্ব বা অহংকার করার কিছু নেই। গরিব হওয়া তো দোষের কিছু না। আল্লাহ ইচ্ছা করলে যেকোন ব্যক্তিকে যেকোন সময় গরিব অথবা বড়লোক বানাতে পারেন। তাই ধনীদের কখনও অহংকার করা উচিৎ নয়। তাই আমাদের উচিৎ কোরবানির পশুর গলায় ছুরি দেয়ার আগে নিজেদের মধ্যে লুক্কায়িত পশুত্বের গলায় ছুরি দেওয়া। মহান আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণকারী ও আত্মত্যাগী হতে হবে। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জনের মাধ্যমে যেন আমরা প্রকৃত মুমিন বা মুত্তাকি হতে পারি।” তাসিনের কথা শুনে বন্ধুরা চুপ থাকে। এরপর থেকে তারা আর কোরবানি পশু নিয়ে হাসি-তামাশা করেনি। ঈদের দিন তাসিনের বাবা নিজ হাতেই গরুটি কোরবানি দেয়। তারপর মাংসগুলো তিন ভাগ করে একভাগ নিজেদের জন্য, অপর ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিদের জন্য আর অন্য একভাগ ফকির মিসকিনদের জন্য রেখে দেয়। বিকালবেলায় রনি তার ফুফু ও বাবার সঙ্গে পাড়া-প্রতিবেশিদের জন্য মাংসগুলো বিলিয়ে দেয়। বিকালবেলা তাসিন বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়। এভাবে কোরবানির ঈদটা তাদের ভালোভাবেই কেটে যায়।

x