কোনো প্রতিদান চাই না : প্রধানমন্ত্রী

ভারতকে যা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে

বৃহস্পতিবার , ৩১ মে, ২০১৮ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ
356

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারতের স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ যা দিয়েছে তা তারা সারা জীবন মনে রাখবে, তবে এর জন্য কোনো প্রতিদান তিনি চান না। ভারত সফর নিয়ে গতকাল বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। ‘দিল্লির পাশে থাকছে ঢাকা, মোদির কাছে প্রতিদান চান হাসিনা’ শিরোনামে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি সংবাদের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এ প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রী। খবর বিডিনিউজের।

তিনি বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিদান চাই না। প্রতিদানের কী আছে এখানে? চাওয়ার অভ্যাস আমার একটু কম। দেওয়ার অভ্যাস বেশি। আমরা ভারতকে যা দিয়েছি সেটা ভারত সারা জীবন মনে রাখবে। প্রতিদিনের বোমাবাজি, গুলি…..; আমরা কিন্তু ওদের শান্তি ফেরত দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে। কাজেই আমরা ওগুলোর প্রতিদান চাই না।’

নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। সে সময় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকজন শীর্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদীকে ভারতের কাছে ফেরত দেয় বলে ওই দেশের সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তারা যে আমাদের সমর্থন দিয়েছে, শরণার্থীদের তারা সাহায্য করেছে, লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে একসাথে রক্ত দিয়েছে, আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেটা স্মরণ করি।’

দুই দেশের বর্তমান সরকারের এই মেয়াদেই তিস্তা চুক্তি হবে বলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে আশা প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওনারা যা বলেছেন, সেখানেই থাকেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে তিক্ততা থাকতেই পারে। কিন্তু আমার কোনো বক্তব্যে এই তিক্ততা যেন না হয়।’ তিস্তা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশনের আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন শেখ হাসিনা।

এ প্রসঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আপনি তিস্তা ব্যারেজ করলেন কেন? আমরা তো ডাউনস্ট্রিমে। আমরা তিস্তা ব্যারেজ করে এখন পানি পানি বলে চিৎকার করছি কেন?’ সাবেক সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের শাসনামলে লালমনিরহাটে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়।

আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারলে ঢাকার পান্থপথের এবং মতিঝিলের বক্স কালভার্ট ভেঙে নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, ‘আগামীতে আসতে পারলে সব খুলে দেব। উপরে রাস্তা যাবে, নিচে নৌকা যাবে।’ তার এবারের ভারত সফরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।

নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠকের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনসহ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।’ তিস্তার পানি নিয়ে কী আলোচনা হয়েছেএ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। যৌথ নদী কমিশন হয়েছে, সেখানে আলোচনা চলছে।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট’ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আমি যখন ধরি ভালো করেই ধরি : মানবাধিকারকর্মীদের অব্যাহত সমালোচনার মধ্যেও মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলমান অভিযানে নিহতের ঘটনাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সমর্থনের প্রকাশও ঘটিয়েছেন তিনি। মাদক নির্মূল অভিযানে নিহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাওয়ার পর তাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ প্রকাশের প্রেক্ষাপটে গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এলে সাংবাদিকরা এই অভিযান নিয়ে তাকে প্রশ্ন করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, মাদক সমাজে একটা ব্যাধির মতন। এর বিরুদ্ধে অভিযান চলবেই। তিনি বলেন, ‘আমি যখন ধরি, ভালো করেই ধরি, এটা তো ভালো করেই জানেন। কার ভাই, কার চাচা, কার কী, ওটা কিন্তু দেখি না। এটা একটু মাথায় রাখেন।’ চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের মতো জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময়ও প্রশ্ন ওঠার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

অভিযোগ উঠেছে, মাদক পাচারের হোতা যারা, তাদের অভিযানের আওতায় আনা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে কক্সবাজারে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নামও গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনের বরাতে গণমাধ্যমে আসছে। মাদকের বিস্তারে যাদের ভূমিকা রয়েছে, তাদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেএক সাংবাদিক জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কাকে গডফাদার বলছেন? কে গডফাদার, কে ডন, সেটা কিন্তু আমরা জানি না। যারাই এর সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযান চলছে।

আমি তো জেলের তালা খুলে আনতে পারব না : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবির প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো আর জেলের তালা খুলে তাকে বের করে আনতে পারব না। এসময় আদালতের রায়ে দণ্ডিত খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আদালতেই ফায়সালা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এসময় শেখ হাসিনা বলেন, ওনাদের মুক্তি চাইতে হল কেন? বিএনপির উকিলরা প্রমাণ করতে পারেন নাই যে এতিমের টাকা ওনার (খালেদা জিয়া) অ্যাকাউন্টে যায়নি।’ খালেদা জিয়ার শাস্তির বিষয়টি আদালতের বিষয় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার তো সাজা দেওয়ার এখতিয়ার নেই। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাক।’

মাহমুদুর রহমান মান্না নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, কাদের সিদ্দিকী নেতৃত্বাধীন কৃষকশ্রমিক জনতা লীগ, আ স ম আব্দুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলজেএসডি ও বি চৌধুরীর বিকল্পধারা বাংলাদেশ নিয়ে ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে একটি রাজনৈতিক জোট হয়েছে। মঙ্গলবার বিকল্পধারার ইফতার মাহফিলে এই জোটকে ‘নিউক্লিয়াস’ অভিহিত করে এর প্রধান বি চৌধুরী বলেন, তারা সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বিন্দু বিন্দু থেকেই সিন্ধু হয়। তবে জিরো প্লাস জিরো জিরোই হয়। কেউ ক্ষমতায় এসে অগ্নিসংযোগ করুক, এটা চাই না। নতুন জোট করেছে ভালো। ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন বলে মঙ্গলবার ইঙ্গিত দেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এতে করে তৃণমূলের নেতারা বঞ্চিত হবে কি নাসে প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হাসিনা বলেন, ‘পৃথিবীর সব দেশেই সেলিব্রেটিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাদেরও একটা আকাঙক্ষা থাকে; তারা দেশের জন্য সম্মান এনেছে।’

সংবাদ সম্মেলনে দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার শেখ হাসিনার শান্তিতে নোবেলের জন্য লবিংয়ের প্রস্তাব দেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি; এই ধরনের প্রবৃত্তি আমার নেই। লবিস্ট রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। আমি এর পক্ষে না।’ যে টাকা (লবিংয়ের জন্য) খরচ হবে, তা গরিব মানুষকে দেব, মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

x